গুম-খুনের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের বন্ধু ভাবার কারণ নেই: চিফ প্রসিকিউটর
গুম ও খুনের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের বন্ধু ভাবার কারণ নেই বলে উল্লেখ করেছেনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
তিনি বলেন, 'আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সারাদেশে ২৫১ জন গুম হওয়ার ঘটনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত শুরু করা হয়েছে। গুমের শিকার পরিবারের সদস্যরাও একে একে জবানবন্দি দিচ্ছেন। এ কারণে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়টি আমরা খেয়াল করছি। তবে অপরাধীদের বন্ধু মনে করার কোনো কারণ নেই। তারা যেকোনো সময় আমাদের ছোবল মারতে পারেন। এটি লক্ষ্য রেখেই আমরা কাজ করছি।'
রবিবার (৬ আগস্ট) দুপুরে নিজ কার্যালয়ের সংবাদ সম্মেলনকক্ষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। এদিন গুমের শিকার ৫৫ জনের পরিবারের সদস্যরা চিফ প্রসিকিউটরের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
এসময় চিফ প্রসিকিউটর বলেন, 'গুমের এসব ঘটনাকে আমরা ওয়াইডস্প্রেড ও সিস্টেম্যাটিক অ্যাটাক বলে আখ্যায়িত করেছি। কারণ প্রত্যেকটি ঘটনার একটির সঙ্গে আরেকটির মিল রয়েছে। এ কারণে ওয়াইডস্প্রেড ও সিস্টেম্যাটিক হিসেবে চিহ্নিত করে আমরা এসব মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছি।'
তিনি বলেন, 'গুমের শিকার ২৫১ জন বা যারা এখন পর্যন্ত ফেরত আসেননি, তাদের পেছনে একই ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা প্রায় ঘুরেফিরে পাওয়া যাচ্ছে।'
আমিনুল ইসলাম বলেন, 'এ ধরনের গুম নিয়ে যখনই তদন্ত শুরু হয়েছে, তখনই কিছু কিছু অপরাধীদের তৎপরতাও বেড়েছে। তাই ন্যায়বিচারের স্বার্থে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।'
তিনি বলেন, 'ট্রাইব্যুনালে যাদের বিরুদ্ধে এখন বিচার চলছে, তাদের বিষয়ে আমাদের প্রশাসনের লক্ষ্য রাখার প্রয়োজন। গুমের শিকার প্রত্যেক পরিবারের সদস্যদের প্রতিও লক্ষ্য রাখার বিষয় আছে। যেন তাদের নিরাপত্তা আরও বাড়ানো যায়। এ কারণে আমরা সরকারের কাছেও আবেদন জানিয়েছি।'
তিনি আরও বলেন, 'গুমের মামলায় আমাদের তদন্ত আগের তুলনায় অনেক বেশি গতিশীল হয়েছে। এছাড়া গুমের শিকার পরিবারগুলোর জবানবন্দি বা তদন্তের কার্যক্রম চলছে, সে কারণে আমরা মনে করি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়টিও সরকার লক্ষ্য রাখবে।'
গুম পরিবারের সদস্যরা কোনো টার্গেটের শিকার হতে পারেন বলে শঙ্কা রয়েছে কি না জানতে চাইলে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, 'এ বিষয়ে আমরা সতর্ক আছি। আমরা মনে করি অপরাধীদের বন্ধু মনে করার কোনো কারণ নাই। তারা তাদের মতো করেই যেকোনো সময় আমাদের ছোবল মারতে পারে। এ কারণে আমরা যেমনভাবে সচেতন আছি, সরকারকেও একইভাবে সচেতন থাকতে হবে। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদেরও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।'
তিনি বলেন, 'বিশেষ করে আমাদের তদন্ত যেন কোনোভাবে ব্যাহত না হয় কিংবা কোনো স্যাবোটাজ বা বাধা সৃষ্টি করতে না পারে, সেই বিষয়ে আমরা সতর্কতার সঙ্গে কাজ করছি।'
সরকারের কাছে নতুন করে কেন সহায়তা চাইতে হচ্ছে এ প্রশ্নের জবাবে আমিনুল ইসলাম বলেন, 'এরই মধ্যে ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। আমাদের এখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যারা কাজ করেন, তাদের সতর্ক করেছি। কিছু কিছু আসামিদের গতিবিধি ও তৎপরতা আমাদের কাছে সন্দেহজনক লেগেছে।'
তিনি আরও বলেন, 'আমাদের কাছে গোপন তথ্য আছে যে, তারা যেকোনো স্যাবোটাজ বা নাশকাতামূলক কোনো ঘটনা ঘটাতে পারে। এসব কিছু বিচার-বিশ্লেষণ করেই আমরা কাজ করছি।'
গুম প্রতিরোধ আইন নিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, 'এরই মধ্যে গুম প্রতিরোধ এবং প্রতিকার আইন নামে একটি আইন হতে যাচ্ছে। এটি অত্যন্ত যুগোপযোগী আইন। এর মাধ্যমে সারা বাংলাদেশে হওয়া গুমের বিচার হয়তো অন্য মাত্রার একটি গতি পাবে। সবকিছু মিলিয়ে যারা গুমের সঙ্গে জড়িত, তারা অত্যন্ত শক্তিশালী ও দুষ্কৃতকারী। সেটা মাথায় রেখেই আমরা যেমন নিজেরা সতর্ক আছি, গুম পরিবারের সদস্যদেরও সতর্ক থাকার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।'
তিনি বলেন, 'তবে এসব গুমের তদন্ত আমরা খুব দ্রুততার সঙ্গে শেষ করে দোষীদের বিচারের সম্মুখীন করব।'
স্যাবোটাজ নিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, 'একটি সংবাদ আমাদের নজরে এসেছে। আমরা প্রত্যেকটা কর্মকাণ্ড দেখছি। ট্রাইব্যুনালের ভেতরে ও বাইরের সব বিষয়ে নজরদারিতে রয়েছে। তাই কেউ যদি কোনো অপতৎপরতা চালাতে চান, তাহলে এটি তাদের জন্য আত্মঘাতী হবে।'
তিনি বলেন, 'অতএব আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই, এমন কোনো দুষ্ট চিন্তা কারো মনের মধ্যে যদি থাকে বা অন্য কোনো বিষয় চিন্তা করেন, এটা তাদের জন্য আত্মঘাতী বিষয় হবে।'
