রুশ তেল নিয়ে নতুন মার্কিন শুল্কে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সতর্কতা ভারতের, জ্বালানি নিরাপত্তায় অঙ্গীকার
রুশ তেল ক্রয়ের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের পদক্ষেপ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে বলে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করেছে ভারত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের ক্রেতাদের শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর বৃহস্পতিবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ কথা জানায়।
এর আগে একই দিনে, ইউক্রেনে আক্রমণের কারণে রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ একটি ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক বিল পাস করে।
বিলটি এখন আইনে পরিণত করতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরের জন্য পাঠানো হয়েছে। বিলটিতে রাশিয়ার জ্বালানির ওপর চীন, ভারত ও অন্যান্য দেশের নির্ভরতা কমাতে তাদের ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ভারী শুল্ক আরোপ করার কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে তাকে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা বিলটি পাসের বিষয়টি লক্ষ্য করেছে। একই সাথে তারা যোগ করে যে, নিউ দিল্লি সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিভিন্ন মার্কিন মধ্যস্থতাকারীদের সাথে এই বিষয়টি উত্থাপন করেছে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাবের কথা 'অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছে'।
মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে আরও জানিয়েছে, ভারতের জনগণের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিউ দিল্লি 'দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ' এবং বাজারের গতিশীলতার ওপর ভিত্তি করে তারা বিভিন্ন বিক্রেতার কাছ থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করা অব্যাহত রাখবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, 'নিজের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে দৃঢ় অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে।' মন্ত্রণালয় যোগ করে যে, এই আইনের প্রভাব মোকাবিলার জন্য সরকার বাণিজ্য ও শিল্প সংস্থাগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে।
বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ ভারত রুশ তেলের অন্যতম প্রধান ক্রেতা। ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় আক্রমণ শুরুর পর রাশিয়া পশ্চিমাদের ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়লেও ভারতের এই ক্রয় তাদের রাজস্ব জোগাতে সাহায্য করছে বলে মনে করা হয়।
নয়া দিল্লি রাশিয়ার সঙ্গে তাদের তেল বাণিজ্য কমানোর চাপ বারংবার উপেক্ষা করে আসছে। দেশটির যুক্তি—তার বিশাল জনসংখ্যা ও অর্থনীতির জন্য নিশ্চিত, সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের জন্য ভারতীয় শোধনাগারগুলো যে তেলের ব্যবস্থা করেছে, তার মধ্যে রুশ তেলও রয়েছে। দুটি শোধনাগার সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ট্রাম্প নতুন শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিলে তেলের দাম হু-হু করে বাড়বে, তাই বিষয়টি মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করতে তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
সূত্রগুলো জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে এমনিতেই তেলের সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমে গেছে। এর ওপর রুশ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে তা শোধনাগারগুলোর মুনাফায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, কারণ তারা ইতোমধ্যেই বাজারদরের চেয়ে কম দামে জ্বালানি বিক্রি করছে।
তারা আরও জানায়, ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার পরিবর্তে শোধনাগারগুলো চায় সরকার যেন কিছুটা ছাড় পাওয়ার চেষ্টা করে, যাতে তারা বিদ্যমান চুক্তি বা লেনদেনগুলো গুটিয়ে নিতে পারে এবং ভারতের জন্য নির্দিষ্ট কোটায় রুশ তেল কেনার সুযোগ তৈরি হয়।
ভারতীয় বিশ্লেষকদের মতে, ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা দুই দেশের চলমান বাণিজ্য আলোচনাকে জটিল করে তুলতে পারে এবং কোনো বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়টিকে পিছিয়ে দিতে বা আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
নয়াদিল্লি-ভিত্তিক থিঙ্ক-ট্যাংক 'গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ'-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক বাণিজ্য কর্মকর্তা অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, 'ওয়াশিংটন হয়তো এই শুল্কের হুমকিকে কাজে লাগিয়ে ভারতকে রুশ তেল কেনা কমাতে এবং একটি চরম বৈষম্যমূলক বাণিজ্য চুক্তি মেনে নিতে চাপ দিতে পারে।'
কয়েক মাস আলোচনার পরও ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে কোনো সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি; কারণ নয়াদিল্লি তুলনামূলক ভালো কোনো চুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
চলতি মাসের শেষের দিকে জি২০ বাণিজ্য মন্ত্রীদের বৈঠকে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রে যাবেন ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল। সেখানে তিনি মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন এবং প্রস্তাবিত চুক্তির ভবিষ্যৎ পথরেখা নিয়ে আলোচনা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
