যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক এড়াতে চীন ছেড়েছিল যেসব প্রতিষ্ঠান, তাদের অনেকেই আবার ফিরছে
যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্ক এড়াতে চীন থেকে উৎপাদন ও কাঁচামাল সংগ্রহ অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার এক বছর পার না হতেই বড় ধাক্কা খেয়েছে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। চীনের বিশাল ও সুসংগঠিত কারখানানির্ভর শিল্প বাস্তুতন্ত্র (ইকোসিস্টেম) অন্য দেশে পুনর্নির্মাণ করা অতটা সহজ নয়—এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে তারা আবারও চীনে উৎপাদন ফিরিয়ে আনছে।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতির কারণে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ শৃঙ্খলে বৈচিত্র্য আনার হিড়িক পড়েছিল। ওই সময় চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ডান্ডং শহরের মেটাল কাস্টিং কোম্পানি দাওয়াং মেটালস-এর ব্যবসার ওপর প্রভাব পড়েছিল, কারণ তাদের একটি বড় মার্কিন বায়ার তাদের আদেশের একটি অংশ ভারতে স্থানান্তরিত করে।
তবে ভারতে নানা ধরনের প্রশাসনিক ও উৎপাদনগত জটিলতার মুখোমুখি হয়ে—ওই মার্কিন ক্রেতা প্রতিষ্ঠানটি নতুন কার্যাদেশ নিয়ে আবারও তাদের কাছেই ফিরে এসেছে বলে জানান দাওয়াং মেটালসের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিথার কুয়াং। পারিবারিক মালিকানাধীন কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারী ওই মার্কিন ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের নাম অবশ্য তিনি প্রকাশ করেননি। কুয়াং জানান, তাঁদের কোম্পানিও উৎপাদন বিদেশে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল, কিন্তু পরে তা বাতিল করে।
কুয়াং বলেন, "চীন সরবরাহ শৃঙ্খলে যে সুবিধা দেয়, তা অনন্য। অন্য যেকোনো দেশে অভ্যন্তরীণ এই উৎপাদন ব্যবস্থা হুবহু গড়ে তোলা অত্যন্ত কঠিন।"
চীনের বিকল্প হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে বিনিয়োগ এখনো অব্যাহত রয়েছে। তবে চীনের বিকল্প হিসেবে কম শুল্কের অন্য কোনো দেশে কারখানা স্থাপন করার কৌশল—যা 'চীন প্লাস ওয়ান' কৌশল নামে পরিচিত—বাস্তবায়ন করা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন প্রমাণিত হয়েছে।
অন্য দেশ থেকে ঠিক কী পরিমাণ সোর্সিং বা পণ্য সংগ্রহ আবার চীনে ফিরে আসছে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান এখনো পাওয়া যায়নি। তবে যেসব ক্রেতা প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন অন্য দেশে স্থানান্তরিত করেছিল, তাদের অনেকেই এখন চীনা সরবরাহকারীদের ধরে রাখছেন বা তাদের সঙ্গে নতুন করে চুক্তি করছেন। কারণ অন্যান্য দেশের কারখানাগুলো চীনের মতো দক্ষ শ্রমিক, বিস্তৃত সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের সমকক্ষ হতে পারছে না।
অবশ্য অবকাঠামোগত নানা উদ্বেগ সত্ত্বেও ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী উৎপাদন কেন্দ্রগুলো ইলেকট্রনিক্স, অটোমোবাইল ও অন্যান্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের বড় বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে। চলতি মাসেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে একটি সম্ভাব্য বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সংবেদনশীল নয়—এমন কিছু পণ্যের ওপর থেকে বাণিজ্য বাধা কমানোর কোনো মেকানিজম বা প্রক্রিয়া আসছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পেতে ব্যবসায়ী সমাজ সতর্কতার সঙ্গে এই বৈঠকের দিকে নজর রাখছে।
সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটায় এবং উৎপাদনগত সীমাবদ্ধতার কারণে, মার্কিন খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান 'টার্গেট' তাদের কিছু পণ্যের আদেশ আবারও চীনা সরবরাহকারীদের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে বলে বিষয়টির সঙ্গে সম্পৃক্ত দুটি সূত্র জানিয়েছে। তবে এই রপ্তানি আদেশের আর্থিক মূল্য বা মেয়াদ সম্পর্কিত কোনো তথ্য তারা প্রকাশ করেনি। অন্যদিকে, চীনের খ্যাতনামা ফাস্ট-ফ্যাশন রিটেইলার 'শেইন'-ও ভিয়েতনামে তাদের কিছু কার্যক্রম সংকুচিত করছে বলে ভিয়েতনামের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে। এ বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে টার্গেট বা শেইনের কোনো সাড়া পায়নি বার্তাসংস্থা রয়টার্স।
চীনের পূর্বাঞ্চলীয় হাংঝৌ শহরের আউটডোর ফার্নিচার রপ্তানিকারক জিন চাওফেং জানান, ২০২৪ সালে ভিয়েতনামের হো চি মিন সিটিতে তিনি যে ওয়ার্কশপটি চালু করেছিলেন, তা বন্ধ করে দিয়ে এ বছর উৎপাদন আবারও চীনে ফিরিয়ে এনেছেন। তিনি জানান, ভিয়েতনামে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি খুঁজে পেতে তাঁকে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল। এমনকি স্ক্রু এবং কাপ হোল্ডারের ছাঁচের মতো মৌলিক জিনিসপত্রও চীন থেকে আমদানি করতে হতো।
তিনি বলেন, বিদেশে স্থানান্তরিত হওয়ার পেছনে একসময় যে অর্থনৈতিক হিসেব-নিকাশ কাজ করেছিল, তা এখন বদলে গেছে। "সব খরচ হিসাব করার পর দেখা গেল, সার্বিক পরিচালন ব্যয়ে বিশেষ কোনো পার্থক্য নেই। তাই বিদেশে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার কোনো মানে হয় না।"
মূলত চীনের তুলনায় অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে মার্কিন শুল্ক হারের বিশাল ব্যবধানের সুযোগ নিতেই অনেক প্রতিষ্ঠান চীন ছেড়েছিল। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) গত জুলাইয়ের হিসাব অনুযায়ী, যেখানে চীনের ওপর কার্যকর মার্কিন শুল্ক হার ছিল প্রায় ২০ শতাংশ, সেখানে ভিয়েতনামের জন্য ছিল ৬.১ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার জন্য ১৩.৪ শতাংশ এবং থাইল্যান্ডের জন্য ৪.৫ শতাংশ। কিন্তু ওয়াশিংটন যখন আরও কয়েকটি দেশে শুল্কের আওতা সম্প্রসারিত করে, তখন শুল্কের এই ব্যবধান অনেকটাই কমে আসে। ফলে অনেক চীনা প্রস্তুতকারক বিদেশে বিনিয়োগের বিষয়টি নতুন করে ভাবতে বাধ্য হয়েছে বলে ইআইইউ জানিয়েছে।
শুল্কের বাইরেও নানা বিবেচনা
অনেক প্রতিষ্ঠানের মতে, পণ্যের দামের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সুবিধা এখন একটি চূড়ান্ত নির্ণায়ক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে—বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংকট যখন বিভিন্ন দেশের উৎপাদন ব্যবস্থার জ্বালানি নির্ভরতা ও নির্ভরযোগ্যতাকে বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।
পোল্যান্ডভিত্তিক প্যাকেজিং প্রতিষ্ঠান ডিএসটি প্যাক-এর সিইও স্ট্যানিস্লাভ ক্রিকুন জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ায় গত এপ্রিলে যখন প্লাস্টিকের কাঁচামালের দাম ১৫ শতাংশ বেড়ে যায়, তখন চীনের দীর্ঘ ছয় বছরের পুরোনো উৎপাদন অংশীদারের সহায়তায় তাঁরা সেই কঠিন সময় পার করেছেন। ক্রিকুন বলেন, "যেকোনো সংকটময় মুহূর্তে ব্যবহারের জন্য চীনের উৎপাদন কারখানাগুলোই সবচেয়ে বেশি স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য।"
তিনি জানান, ডিএসটি প্যাকের মোট চাহিদার ৮০ শতাংশ পণ্য আসে চীনের শেনঝেনের একটি কারখানা থেকে, আর বাকি ১০ শতাংশ করে আসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দীর্ঘদিনের ব্যাকআপ কারখানাগুলো থেকে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ওই বিকল্প কারখানাগুলোতে প্রতি ইউনিট পণ্য উৎপাদনে চীন থেকে দুই থেকে তিনগুণ বেশি খরচ হয়।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কারখানা স্থানান্তরের বিষয়টি ক্রিকুন শুরুতেই নাকচ করে দিয়েছিলেন, কারণ ভিয়েতনামে এক ব্যবসায়ী সহযোগীর চরম দুর্দশা তিনি কাছ থেকে দেখেছেন। ক্রিকুন বলেন, "(ভিয়েতনামে) উৎপাদন থেকে শুরু করে পণ্য রপ্তানি পর্যন্ত তাঁকে নানা ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয়েছে। চীনের মতো মসৃণ ও সুশৃঙ্খলভাবে সেখানকার সার্বিক ব্যবস্থা কাজ করে না।"
উৎপাদকদের আইনি পরামর্শ দেওয়া চীনের কিংডাও নিবাসী আইনজীবী গুয়ান বাওখুই বলেন, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া (শিল্পে) "অস্থিতিশীল ও অনিয়মিত" বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যায় জর্জরিত, যা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে আরও তীব্র হয়েছে।
তবে চীন সব রপ্তানিকারকই যে মার্কিন রপ্তানি আদেশের প্রত্যাবর্তন দেখছেন, এমনটাও নয়। নিংবোভিত্তিক উপহার সামগ্রী ও আউটডোর স্পোর্টস পণ্যের বিক্রয় প্রতিনিধি সামার হু জানান, তাঁদের কোম্পানিতে মার্কিন আদেশের কোনো বৃদ্ধি দেখা যায়নি। হু বলেন, "আমরা খুব একটা আশাবাদী হতে পারছি না। বাজারে প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র।"
আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খল বৈচিত্র্যময় করার দৌড়ে ভিয়েতনাম এখনো অন্যতম বড় সুবিধাভোগী হিসেবে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করে চলেছে। ইলেকট্রিক লকার ও ভেন্ডিং মেশিন প্রস্তুতকারী ইউ ইয়াংশিয়ান জানান, ঝুঁকি কমানোর উপায় হিসেবে তাঁর কোম্পানি মোট উৎপাদন ক্ষমতার আটভাগের একভাগ ভিয়েতনামে বজায় রাখছে। তিনি জানান, ট্রাম্প যদি আবার অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করেন এবং শুল্ক বহুগুণ বাড়িয়ে দেন, তবে তাঁর কোম্পানি ভিয়েতনামে আবারও উৎপাদন সম্প্রসারণ করতে পারে।
এদিকে আসন্ন ট্রাম্প-শি বৈঠক থেকে নিজেদের সব সমস্যার স্থায়ী সমাধান আসবে বলে খুব একটা আশা করছেন না চীনের রপ্তানিকারকরা।
দাওয়াং মেটালসের হিথার কুয়াং বলেন, "আমরা ট্রাম্পের কাছ থেকে বড় কোনো প্রত্যাশা অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছি। নিজেদের জীবিকা বা সার্বিক ব্যবসার জন্য তাঁর ওপর ভরসা করে বসে থাকা যায় না। টিকে থাকার জন্য আমাদের নিজদেরই বিকল্প রপ্তানি বাজার খুঁজে নিতে হবে।"
