৫.২ ট্রিলিয়ন ডলারের হালাল বাজারের বড় অংশ ধরতে চান ব্যবসায়ীরা, স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষ গঠনের দাবি
প্রায় ৫.২ ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক হালাল বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা বাড়াতে হালাল খাদ্যপণ্যের সনদ প্রদান, মান পরীক্ষা ও অন্যান্য সুবিধা সহজ করার লক্ষ্যে একটি স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষ গঠনের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা।
এ খাতের সনদ প্রদানসহ অন্যান্য কার্যক্রমের সমন্বয় করতে বাংলাদেশ হালাল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই)। সেইসঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হালাল সনদ, অনুমোদনপ্রাপ্ত পরীক্ষাগার, দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও প্রধান প্রধান হালাল পণ্যের বাজারগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক স্বীকৃতি চুক্তির সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।
কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য উৎপাদক, বিভিন্ন ব্যবসায়ী সমিতি ও সরকারি-বেসরকারি স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে মতবিনিময়ের পর একটি নীতিমালা তৈরি করা হয়। গত ১৪ আগস্ট সেই নীতিমালার অংশ হিসেবে এসব সুপারিশ প্রধানমন্ত্রীর কাছে পেশ করা হয়েছে।
বিসিআইয়ের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম পারভেজ বলেন, ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী হালাল পণ্যের বাজার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫.২ ট্রিলিয়ন ডলার। বার্ষিক গড়ে ১২.৪ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হলে ২০৩৪ সাল নাগাদ এই বাজারের আকার ৯.৪৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। অথচ এই বিশাল বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব মাত্র ০.০৫ শতাংশ। বাংলাদেশ যদি এর মাত্র ৫ শতাংশ হিস্যাও ধরতে পারে, তবে হালাল পণ্য এদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত হয়ে উঠতে পারে।
পারভেজ জানান, বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে হালাল পণ্য রপ্তানির পরিমাণ মাত্র প্রায় ৯৪০ মিলিয়ন ডলার।
তিনি বলেন, 'আমরা এই পরিস্থিতির পরিবর্তন চাই।' তিনি আরও বলেন, উৎপাদক, বাণিজ্য সংগঠন ও সরকারি-বেসরকারি স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠকের পর বিসিআই একটি পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে।
বিসিআই জানায়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, সচিব ও বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রধানদের কাছেও এসব সুপারিশ পাঠানো হয়েছে।
সংগঠনটি মনে করছে, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় এ খাতের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এসব অঞ্চলে বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটি মুসলিমের পাশাপাশি অমুসলিম ভোক্তাদের মধ্যেও হালাল পণ্যের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে।
প্রাণ গ্রুপ, বেঙ্গল মিট প্রসেসিং, আকিজ, স্কয়ার, গোল্ডেন হারভেস্ট ও আহমদুল্লাহ অ্যাগ্রো ফুডসসহ বেশ কিছু বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই হালাল পণ্য রপ্তানি করছে। তবে সমন্বিত কোনো জাতীয় কৌশল না থাকায় দেশের অধিকাংশ হালাল পণ্য রপ্তানিই ব্যক্তিগত ও বেসরকারি খাতের নিজস্ব উদ্যোগে গড়ে উঠেছে।
সনদ প্রদানের বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে রপ্তানি
বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে হালাল সনদ দেওয়া শুরু হয় ২০০৭ সালে। মালয়েশিয়ার জাকিম-এর সহায়তায় ২০১১ সাল থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন হালাল সনদ দিয়ে আসছে। পাশাপাশি ওআইসি-এসএমআইআইসি-র মানদণ্ড মেনে ২০২২ সাল থেকে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনও (বিএসটিআই) হালাল সনদ দেওয়া শুরু করে।
বিসিআই বলছে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একক কোনো কর্তৃপক্ষ না থাকায় রপ্তানিকারকদের নানামুখী জটিলতায় পড়তে হচ্ছে।
মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো সম্ভাব্য বাজারগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক স্বীকৃতি চুক্তির সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।
বাংলাদেশের হালাল পণ্য উৎপাদন ও সনদ প্রদান সক্ষমতা বাড়াতে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি ওআইসি-এসএমআইআইসির কাছ থেকেও কারিগরি সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
বেঙ্গল মিটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহমদ আসিফ বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন মোড়কের গায়ে শুধু হালাল লোগো দেখেই সন্তুষ্ট হন না, বরং তারা পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও উৎস-সন্ধান (ট্রেসেবিলিটি) চান।
তিনি বলেন, 'তারা একটি প্রাণীর জন্ম ও লালনপালন থেকে শুরু করে জবাই করা এবং মোড়কজাতকরণ পর্যন্ত সব তথ্য জানতে চান।'
মাংসের ক্ষেত্রে ক্রেতারা প্রাণীর উৎস, খাবার, টিকাদান, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, জবাই ও প্রক্রিয়াজাতকরণের বিষয়ে তথ্য চাইতে পারেন। এর অর্থ হলো, হালাল নিয়মকানুন মেনে চলা এখন পণ্যের মান, খাদ্য নিরাপত্তা, উৎস-সন্ধান ও স্বচ্ছতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
শুধু 'হালাল' লোগোই এখন আর যথেষ্ট নয়
বিসিআই জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক হালাল পণ্যের ক্রেতাদের চাহিদা ও শর্ত দিন দিন বাড়ছে। উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে যে সঠিক মান বজায় রাখা হয়েছে, প্রধান বাজারগুলো এখন তার প্রমাণ চাইছে।
প্রাণ গ্রুপের পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ল্যাবরেটরি না থাকায় বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য বিদেশের বাজারে প্রয়োজনীয় সনদ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
এতে মান পরীক্ষার খরচ বেড়ে যায়, পণ্য পাঠাতে দেরি হয়। ফলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যায়।
বর্তমান সনদ প্রদান প্রক্রিয়া নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিসিআই পরিচালক ও ইজি ফুড-এর চেয়ারম্যান জিয়া হায়দার। তিনি অভিযোগ করেন, অনেক সময় আবেদনকারীদের কাছে সনদ প্রদান-সংক্রান্ত সেবার জন্য যাতায়াতের গাড়ি ও বাড়তি অর্থ চাওয়া হয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান কতটুকু পণ্য রপ্তানি করতে চায়, তার পরিমাণের ভিত্তিতে অর্থ দাবি করা হয়।
জিয়া হায়দার বলেন, 'এই বাড়তি খরচের কথা শুনে বিদেশি ক্রেতারা অনেক সময় সনদ নেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এর বদলে তারা রপ্তানিকারকদের কেবল পণ্যের মোড়কে "হালাল" শব্দটি লিখে দিতে বলেন।'
সনদ প্রদান প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও স্বচ্ছ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, হালাল সনদ বিনামূল্যে দেওয়া উচিত।
দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তা দাবি
হালাল পণ্য রপ্তানির পরিমাণ আরও নিখুঁতভাবে চিহ্নিত ও পরিমাপ করার জন্য বিদ্যমান এইচএস কোডের পাশাপাশি একটি পৃথক 'হালাল এইচএস কোড' তৈরিরও প্রস্তাব দিয়েছে বিসিআই।
দেশে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের হালাল মেলার আয়োজন এবং আন্তর্জাতিক হালাল বাণিজ্য মেলাগুলোতে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুপারিশও করেছে তারা।
এছাড়া শিল্প, বাণিজ্য, পররাষ্ট্র, ধর্ম, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোকে নিয়ে একটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণেরও আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিসিআই বলেছে, দীর্ঘমেয়াদি হালাল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার জন্য জাতীয় হালাল নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত।
২০৩৪ ও ২০৪০ সালের জন্য নির্দিষ্ট রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পাশাপাশি হালাল পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিতে বিনিয়োগকারীদের জন্য ১০ থেকে ১৫ বছরের নীতি সহায়তা ও প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বিসিআই।
