বিক্ষোভকারীদের ‘কুকুর’ বলে বিতর্কে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক; প্রশ্নফাঁস ও দুর্নীতির অভিযোগে বিহারে ফের আন্দোলন
নিয়োগ পরীক্ষা ও সরকারি চাকরির দাবিতে ভারতের বিহারের পাটনায় মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। হাজার হাজার আন্দোলনকারী ছাত্র রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীর বাসভবনের অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করেন। পরবর্তীতে আন্দোলনকারীরা পুলিশি ব্যারিকেড ভেঙে এগোনোর চেষ্টা করলে নিরাপত্তা কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষ বেধে যায়।
বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। এ সময় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে আটক করা হয় এবং সংঘর্ষে একাধিক পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ধাক্কাধাক্কির মধ্যে এক নারী শিক্ষার্থী জ্ঞান হারান বলেও জানা গেছে।
চাকরির পরীক্ষা ও সরকারি নিয়োগ সংক্রান্ত বিভিন্ন দাবিতে পাটনার গার্ডানিবাগে চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে এই পদযাত্রার আয়োজন করা হয়। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা প্রস্তাবিত চতুর্থ শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় (টিআরই-৪) পিটি ও মেইনস একযোগে একক ধাপে গ্রহণ করা, নেগেটিভ মার্কিং বাতিল করা এবং শতভাগ স্থানীয়দের জন্য অগ্রাধিকার নিশ্চিত করাসহ একাধিক পরিবর্তন দাবি করছেন।
গত ১৮ আগস্ট থেকে গার্ডানিবাগে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন শিক্ষার্থীরা। এক ডজনেরও বেশি ছাত্র সংগঠন এতে অংশ নিয়ে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ও নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে তাদের দাবি তুলে ধরছে।
আন্দোলনের কারণ কী?
এই অসন্তোষের প্রধান কারণ বিহার পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (বিপিএসসি) ঘোষিত টিআরই-৪ পরীক্ষার ধরন। কমিশন জানিয়েছে, এবার থেকে এই পরীক্ষা দুটি ধাপে নেওয়া হবে এবং বহুনির্বাচনী (এমসিকিউ) অংশে নেগেটিভ মার্কিং বহাল থাকবে।
তবে শিক্ষার্থীদের দাবি, টিআরই-৪ পরীক্ষা নেগেটিভ মার্কিং ছাড়াই এক ধাপে আয়োজন করতে হবে।
গত ১৮ আগস্ট বিপিএসসি ঘোষণা দেয়, টিআরই-৪-এর মাধ্যমে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মোট ৩২ হাজার ৩৮৮টি শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়া হবে। সেপ্টেম্বর ১ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আবেদন গ্রহণ করা হবে এবং পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে পারে ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে। পরীক্ষার চূড়ান্ত সময়সূচি অক্টোবরে প্রকাশের কথা রয়েছে।
বিপিএসসি-র তথ্যানুযায়ী, আবেদনকারীর সংখ্যা ৫ লাখের নিচে থাকলে পরীক্ষা তিনটি শিফটে নেওয়া হবে; আর ৫ লাখ ছাড়ালে মোট ছয়টি শিফটে পরীক্ষা হবে। পাশাপাশি পরীক্ষার্থীদের অতিরিক্ত ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় দেওয়ার একটি প্রস্তাবনা বিবেচনাধীন রয়েছে। পরীক্ষাগুলো হবে এমসিকিউ বা অবজেক্টিভ টাইপ।
তবে নেগেটিভ মার্কিং তুলে নেওয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে কমিশন। বিপিএসসি-র যুক্তি, এই ব্যবস্থা পরীক্ষার্থীদের আন্দাজে উত্তর দেওয়ার প্রবণতা কমায়। তাই কমিশনের সব অবজেক্টিভ পরীক্ষাতেই এটি বহাল থাকবে।
বিপিএসসি-র স্পষ্টীকরণ
শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক অনিয়ম ও প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ এনে ৭০তম বিপিএসসি প্রিলিমিনারি পরীক্ষা বাতিলেরও দাবি জানিয়েছেন। যদিও কমিশন এ অভিযোগ সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রশ্নপত্রটিকে সম্পূর্ণ ভুয়া আখ্যা দিয়ে কমিশন ৭০তম পরীক্ষায় তৃতীয় স্থান অর্জনকারী এক প্রার্থীর আসল উত্তরপত্রের কপি প্রদর্শন করে।
বিপিএসসি-র পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক রাজেশ কুমার সিং জানান, ওই প্রার্থী ৭ নম্বর প্রশ্নের মূল উত্তর দিলেও সংশ্লিষ্ট ছোট প্রশ্নগুলোর (সাব-পার্টস) উত্তর দেননি; ফলে সে অংশগুলোর জন্য কোনো নম্বর দেওয়া হয়নি। পৃষ্ঠা ভরানোর ওপর নয়, বরং উত্তরের মানের ওপর ভিত্তি করেই মূল্যায়ন করা হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন। কমিশন জানায়, প্রার্থীরা নিজ নিজ লগইন আইডি ব্যবহার করে তাদের উত্তরপত্র দেখতে পারবেন।
ডোমিসাইল প্রথার দাবি
আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি হলো সরকারি চাকরি ও শিক্ষক নিয়োগে ১০০ শতাংশ ডোমিসাইল প্রথা চালু করা, অর্থাৎ কেবল বিহারের স্থায়ী বাসিন্দাদেরই সুযোগ নিশ্চিত করা।
বিপিএসসি স্পষ্ট করেছে যে ডোমিসাইল নীতি বাস্তবায়ন করা রাজ্য সরকারের এখতিয়ার, কমিশনের নয়। কমিশন আরও জানায়, বিপিএসসি-র পরীক্ষাগুলোতে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৭২ শতাংশই বিহারের স্থানীয় বাসিন্দা।
এ ছাড়া, শিক্ষার্থীরা বয়সের উচ্চসীমা শিথিল করা এবং বিহার স্টাফ সিলেকশন কমিশনসহ (বিএসএসসি) পুলিশ ও অন্যান্য সরকারি চাকরির পরীক্ষায় পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছেন।
আন্দোলন প্রসঙ্গে ছাত্র নেতারা জানান, আন্দোলন প্রত্যাহার করা হবে কি না—সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এ প্রস্তাবগুলো নিয়ে পরীক্ষার্থীদের সাথে আলোচনা করা হবে। তারা আরও মনে করিয়ে দেন, এ প্রস্তাবগুলো এখনো বিপিএসসি-র চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয় এবং কমিশনকে এটি বিবেচনা করতে হবে।
যে বিতর্কে আবারও জ্বলে উঠল আন্দোলন
সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে বিপিএসসি-র পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের একটি মন্তব্য আন্দোলনকে আরও উস্কে দেয়। বিপিএসসির বিরুদ্ধে চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছিলেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক রাজেশ কুমার। ৭০তম বিপিএসসি পরীক্ষায় তৃতীয় স্থান অর্জনকারী প্রার্থীর উত্তরপত্র নিয়ে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করলে এই কর্মকর্তা উত্তর দেন, ''সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আপনাদের যদি মনে হয় আপনাদের অভিযোগে সত্যতা আছে, তবে আদালতে যাচ্ছেন না কেন? এটা কমিশনের কাজ নয়। আপনারা তো একটি প্রবাদ শুনে থাকবেন- 'হাতি চলে বাজার, কুত্তা ভৌকে হাজার।''
এই মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহারকারীরা অভিযোগ করছেন, উক্ত কর্মকর্তা বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের কুকুরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। বিহারের বিরোধীদলীয় নেতা তেজস্বী যাদব আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সমর্থনে গার্ডানিবাগ আন্দোলনস্থলে উপস্থিত হন এবং বিপিএসসির পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের ওই বক্তব্যের উল্লেখ করেন। তিনি এই বিপিএসসি কর্মকর্তার কাছ থেকে নিঃশর্ত ক্ষমার দাবি জানান।
বিতর্ক বাড়ার পর অবশ্য নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেন ওই কর্মকর্তা। এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, 'একটি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে আমার মুখ থেকে একটি প্রবাদ উদ্ধৃত হয়েছিল। সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিকৃত করে ও প্রেক্ষাপটের বাইরে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার কোনো উদ্দেশ্য আমার ছিল না।'
এদিকে বিভিন্ন দাবি আদায়ে গত জুলাই মাস থেকেই দেশটির একাধিক রাজ্যে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে আসছেন।
দিল্লিতে নিট প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয় ককরোচ জনতা পার্টি (সিজিপি)। পরবর্তীতে ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করলে সেই আন্দোলন প্রত্যাহার করা হয়।
অন্যদিকে, চলতি মাসের শুরুর দিকে ঝাড়খণ্ড সরকারের নিকট থেকে দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস পাওয়ার পর সেখানকার চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলনও প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
