‘নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কবর রচনা করা হয়েছে’: সংসদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী
বর্তমান সরকারের সুদৃঢ় ও স্বাবলম্বী পররাষ্ট্রনীতির কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর সক্ষমতা অর্জন করেছে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলর রহমান। তিনি জানান, গত ১৫ বছরের দুর্বল কূটনৈতিক অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে দেশের 'নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কবর রচনা' করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে বৈদেশিক মিশনগুলোর সার্বিক মূল্যায়ন নিয়ে সংসদ সদস্যদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সফল ও সুদূরপ্রসারী পররাষ্ট্রনীতির কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজস্ব মেরুদণ্ড সোজা করে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সক্ষমতা অর্জন করেছে। এই নেতৃত্বের ভিত্তিতে দেশের পররাষ্ট্রনীতিকে আরও সুসংগঠিতভাবে এগিয়ে নেওয়া হবে।'
বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর কার্যক্রম, বৈদেশিক শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে সফল মিশনগুলোকে পুরস্কৃত করার বিষয়ে এক সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান, শ্রমিক রপ্তানি বৃদ্ধি এবং সর্বোচ্চ বাণিজ্য বিনিময়ে সফল মিশনগুলোর জন্য বর্তমানে কোনো বিশেষ 'রিওয়ার্ড ব্যবস্থা' চালু আছে কি না, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।'
তিনি দাবি করেন, গত ১৫ বছর ধরে যে দুঃশাসন চলেছে, সে সময়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশন কার্যত সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। দূতাবাসগুলোর কার্যক্রম, প্রবাসীদের সেবা এবং দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষায় আগের সরকারের কার্যকর তদারকি বা আগ্রহ ছিল না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দূতাবাসগুলোর স্থবির ও অকার্যকর অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে।'
কূটনৈতিক মিশনগুলোর জবাবদিহি ও দক্ষতা বাড়াতে 'কী পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর' বা কেপিআই ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, 'প্রতিটি দূতাবাসের কাজের মান মূল্যায়নের জন্য এই কেপিআই তৈরি করা হচ্ছে। এর ভিত্তিতে ভবিষ্যতে দূতাবাসগুলোর কাজের মান ও গ্রেডিং নির্ধারণ করা হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'আগামী জাতীয় বাজেট উপস্থাপনের সময় প্রতিটি দূতাবাসের সাফল্য, ব্যর্থতা ও কাজের হালনাগাদ তথ্য সংসদ সদস্যদের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরা হবে। এসব তথ্য জানার পূর্ণ অধিকার সংসদ সদস্যদের রয়েছে।'
'সীমান্ত বিরোধে ভারতের কাছে নিয়মিত প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে'
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে নিরাপত্তা ঝুঁকি ও অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে—এমন প্রতিটি বিষয় ভারতের কাছে জোরালোভাবে তুলে ধরা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
বৃহস্পতিবার সংসদ অধিবেশনে মৌলভীবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. শওকতুল ইসলামের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান।
সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলাম বলেন, 'তার নির্বাচনী এলাকা কুলাউড়া সীমান্তবর্তী হওয়ায় প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধের প্রভাব সেখানে বেশি।' এ বিষয়ে সর্বশেষ কূটনৈতিক অগ্রগতি জানতে চান তিনি।
জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'সীমান্তে যেকোনো ধরনের উসকানি, বিরোধ ও অস্থিরতা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ এবং সীমান্তবর্তী মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান সুস্পষ্ট ও দৃঢ়।'
তিনি বলেন, 'বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে নিরাপত্তা ঝুঁকি বা অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে—এমন প্রতিটি বিষয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জোরালোভাবে ভারতের কাছে তুলে ধরছে। বিশেষ করে সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যাকাণ্ড এবং ভারত থেকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে পুশ-ইনের ঘটনাগুলোর বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে।'
ড. খলিলর রহমান জানান, বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বছরে দুইবার বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ে বৈঠক হয়। সর্বশেষ গত ৮ থেকে ১১ জুন ভারতের নয়াদিল্লিতে বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, 'সীমান্তে নিরাপত্তা ঝুঁকি বৃদ্ধি বা অস্থিরতা সৃষ্টির মতো কোনো ঘটনা ঘটলে বিভিন্ন কূটনৈতিক বৈঠকে বিষয়টি আলোচনার পাশাপাশি কূটনৈতিক পত্রের মাধ্যমেও ভারত সরকারের কাছে নিয়মিত প্রতিবাদ জানানো হয়। স্থানীয় পর্যায়েও বিজিবি ভারতের বিএসএফের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করে এবং প্রয়োজন হলে প্রতিবাদলিপি পাঠায়।'
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'সীমান্তে বাংলাদেশের স্বার্থ, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বাংলাদেশ প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক চায়। তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে।'
সংসদে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ নিয়েও কথা বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, 'দেশের আয়তন, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং বৈশ্বিক কূটনীতির গুরুত্বের তুলনায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বর্তমান বাজেট অত্যন্ত অপ্রতুল।'
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বাজেট আলোচনায় এর আগেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। আগামী দিনে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে প্রয়োজনীয় বাজেট বৃদ্ধি ও নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশের বৈদেশিক কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী ও কার্যকর হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
