খালি অ্যাপার্টমেন্ট পরিষ্কারের সময় মিলল আট বছর আগে চুরি যাওয়া পিকাসোর শিল্পকর্ম
মিলওয়াকির একটি নোংরা ও দুর্গন্ধময় অ্যাপার্টমেন্ট পরিষ্কার করতে গিয়ে আট বছর আগে চুরি হওয়া পাবলো পিকাসোর একটি বিরল শিল্পকর্মের সন্ধান মিলেছে। ভাড়াটেকে উচ্ছেদের পর ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে টিম ডার্জ নামের এক ব্যক্তি শিল্পকর্মটি খুঁজে পান। পরে অ্যান্টিক ব্যবসায়ী চ্যাড স্ট্র্যাক সেটি পিকাসোর কাজ বলে শনাক্ত করেন।
মিলওয়াকির ওই নোংরা অ্যাপার্টমেন্টে পা রাখার সময় ডার্জের মাথায় ছিল তিনটি বিষয়—অসহনীয় দুর্গন্ধ, চারপাশের ময়লা আর ভাড়াটেকে শেষ পর্যন্ত বের করে দেওয়ার পর ১৫ হাজার ডলারের লোকসান।
অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকতেই টিম ডার্জের নাকে আসে বিড়ালের প্রস্রাবের তীব্র গন্ধ। মেঝেজুড়ে স্তূপ হয়ে ছিল খালি পিৎজার বাক্স, প্রায় কোমর ছুঁইছুঁই। একটি শোবারঘরে, দরজার ঠিক পেছনে ধুলোবালিতে ঢাকা অবস্থায় ঝুলছিল কালো-বাদামি ফ্রেমের সাদামাটা একটি ছবি।
লোকসানের কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার আশায় ডার্জ অ্যান্টিক ব্যবসায়ী চ্যাড স্ট্র্যাককে ডেকে আনেন। নোংরা জঞ্জালের মধ্যে মূল্যবান কিছু পাওয়া যায় কি না, সেটিই ছিল তাদের আশা। প্রায় ২০ মিনিট ধরে খোঁজাখুঁজির পর দুজন একসময় ভেতরের শোবারঘরে পৌঁছান।
ছবিটির সামনে গিয়ে দুজনেই থেমে গেলেন। হঠাৎ স্ট্র্যাক জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি কি জানেন এটি কী? এটি কিন্তু পিকাসোর আঁকা!'
এটি কোনো সাধারণ ছবি ছিল না। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিলওয়াকির একটি আর্ট গ্যালারি থেকে নিখোঁজ হয়েছিল কালো-সাদা রঙের এই বিরল শিল্পকর্মটি। চালের কাগজে তৈরি ১৯৪৯ সালের এই অ্যাকুয়াটিন্টে স্প্যানিশ চিত্রশিল্পী পিকাসোর সবুজ পেন্সিলের স্বাক্ষর ছিল।
দীর্ঘ তদন্তেও কোনো অপরাধীর সন্ধান মেলেনি। টানা আট বছর ধরে ছবিটি কোথায় রয়েছে, তা নিয়ে রহস্যই থেকে যায়।
অবশেষে গত ৪ আগস্ট উদ্ধার হয় পিকাসোর সেই বিখ্যাত শিল্পকর্মটি। এর নাম 'তোরেরো'; স্প্যানিশ ভাষায় যার অর্থ 'ষাঁড়ের লড়াইয়ের যোদ্ধা'।
গ্যালারির মালিক উইলিয়াম ডিলিন্ডের কাছ থেকে ছবিটি চুরি হয়েছিল। তিনি বলেন, 'এটা আমার সন্তানের মতো। যখন চুরি হয়েছিল, মনে হয়েছিল ব্যক্তিগতভাবে আমাকেই অপমান করা হলো। আর আজ তা ফিরে পেয়ে আমার ঠিক ততটাই আবেগ কাজ করছে।'
নিখোঁজ শিল্পকর্মের তথ্যভান্ডার আর্ট লস রেজিস্টারের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি শিল্পকর্ম চুরি যাওয়া শিল্পী হলেন পাবলো পিকাসো। তার করা হাজারের বেশি শিল্পকর্মের এখনো কোনো সন্ধান নেই।
ডার্জের ঘরে পাওয়া শিল্পকর্মটিতে কোঁকড়া চুল ও জুলফিবিশিষ্ট একটি অবয়ব দেখা যায়। জাপানি বিশেষ কাগজে 'সুগার-লিফট' প্রক্রিয়ায় পিকাসো এর মোট ৩০টি প্রিন্ট তৈরি করেছিলেন। খুঁজে পাওয়া শিল্পকর্মটি ছিল সেই সিরিজের নবম সংস্করণ।
২০১৮ সালে ছবিটি ডিলিন্ডের একটি দোকানে বিক্রির জন্য রাখা হয়েছিল। একদিন বিকেলে ডিলিন্ড ও তাঁর এক সহকর্মী হঠাৎ খেয়াল করেন, ছবিটি তার জায়গায় নেই। লবিতে ঢুকেই নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না ডিলিন্ড। জায়গাটি কেমন খালি খালি লাগছিল।
ডিলিন্ড স্মৃতিচারণ করে বলেন, 'আমি ঘরটার চারপাশে চোখ বুলিয়ে আবার সেই ফাঁকা জায়গাটার দিকে তাকালাম। আর বুঝতে এক মুহূর্তও দেরি হলো না, হে ঈশ্বর! ছবিটা তো নেই!'
প্রতি বছর চুরির দিনটিতে ডিলিন্ড স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিতেন। তবে এই শিল্পকর্মটি আর কখনো দেখতে পাবেন—এমন আশা তিনি প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন।
বীমা প্রতিষ্ঠানও বহু বছর আগেই এর ক্ষতিপূরণ দিয়ে দিয়েছিল। এর মধ্যে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদারও মারা যান। ডিলিন্ড এখন আর শিল্পকর্ম কেনাবেচা করেন না, শুধু এগুলোর মূল্য নির্ধারণের কাজ করেন।
ডিলিন্ড বলেন, 'চুরি হয়ে যাওয়া কোনো কিছু যে কখনো এভাবে ফিরে পাওয়া যায়, তা আপনি কখনোই আশা করবেন না।' কিন্তু এরপরই, গত ৬ আগস্ট পুলিশের কাছ থেকে তাঁর কাছে ফোন আসে।
দুই দিন আগে চিত্রকর্মটি খুঁজে পাওয়ার পর সেটি নিজের কাছে রাখা নিয়ে ভীষণ দুশ্চিন্তায় ছিলেন ডার্জ। পুরো এক রাত তিনি উদ্বেগে ঘরজুড়ে হাঁটাহাঁটি করেছেন বলে জানান তাঁর বান্ধবী নাতাশা দেলগাদো। তাঁর ভাষায়, 'ও পুরো আতঙ্কে ছিল।'
ডার্জ বলেন, 'আমি ছবিটা আর নিজের কাছে রাখতেই চাইছিলাম না।' পরদিন সকালে ডার্জ ও তাঁর বান্ধবী পুলিশকে ফোন করেন এবং চিত্রকর্মটি নিয়ে থানায় যান।
পরে পুলিশ যখন প্রবীণ ডিলিন্ডের হাতে প্রিন্টটি ফিরিয়ে দেয়, ৮৪ বছর বয়সী ডিলিন্ড দেখামাত্রই বুঝতে পারেন, এটিই তাঁর সেই নিখোঁজ পিকাসোর শিল্পকর্ম।
তিনি পকেট থেকে জুয়েলার্স লুপ বের করেন—রত্ন ও শিল্পকর্মের সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য যাচাইয়ে ব্যবহৃত বিশেষ আতশকাচ, যা দিয়ে তিনি বহু কাজের সত্যতা যাচাই করেছেন। তবে এবার তিনি চিরচেনা শিল্পকর্মটি ফিরে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা। ডিলিন্ড বলেন, 'আমি কেঁদে ফেলিনি ঠিকই, তবে ছবিটা ফের দেখতে পেয়ে ভীষণ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলাম।'
তিনি জানান, বীমা কোম্পানি ক্ষতিপূরণ দেওয়ায় ছবিটির বর্তমান মালিক এখন তারাই। তা সত্ত্বেও অন্তত এক মাসের জন্য ছবিটি নিজের দোকানে ঝুলিয়ে রাখার আশা করছেন তিনি—যাতে মানুষ আবার সেটি দেয়ালে দেখে আনন্দ পায়।
মিলওয়াকি পুলিশ বিভাগ এক বিবৃতিতে ছবিটি জমা দিয়ে 'সঠিক কাজটি করার জন্য' টিম ডার্জের প্রশংসা করেছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, 'একসাথে কাজ করলেই আমরা সেরা।'
ওয়াশিংটন পোস্টকে পুলিশের এক মুখপাত্র জানান, বহু বছর আগে ডিলিন্ডকে যে ব্যক্তির পক্ষ থেকে ছবিটি বিক্রির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তদন্তকারীরা এখন সেই আসল মালিককে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন।
একসময় এই শিল্পকর্মটি উদ্ধার করে দিতে পারলে ১০ হাজার ডলার পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছিল। ডার্জ জানান, অর্থ পুরস্কারের ব্যাপারে তাঁর সঙ্গে এখনো কেউ যোগাযোগ করেনি। তবে টাকা না পেলেও তিনি আক্ষেপ করছেন না; কারণ তিনি অন্তত একটি চমৎকার গল্প পেয়েছেন।
ডার্জের ভাষায়, 'পুরো একদিনের জন্য হলেও আমি একটি পিকাসোর মালিক ছিলাম—এই গল্পটি বেঁচে থাকার জন্য দারুণ এক অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।'
