ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির লাইসেন্স দেবে যুক্তরাষ্ট্র: ট্রাম্প
ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির লাইসেন্স দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করতে ইউক্রেনকে সহায়তা করতে পারে।
বুধবার তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে ট্রাম্প বলেন, 'আমরা তোমাদের প্যাট্রিয়ট তৈরির লাইসেন্স দেব।' তিনি আরও বলেন, 'কীভাবে তৈরি করতে হবে তা বুঝিয়ে দিলে তারা খুব দ্রুতই এটি উৎপাদন করতে পারবে।'
এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে তিনি এখনো প্রতিরক্ষা পণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিন ও রেথিয়নকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাননি উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, 'তবে তা ঠিক হয়ে যাবে।'
প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বিশ্বের অন্যতম কার্যকর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত। এটি শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে আকাশেই ধ্বংস করতে পারে। ক্ষেপণাস্ত্রসহ একটি পূর্ণাঙ্গ প্যাট্রিয়ট ব্যাটারির মূল্য প্রায় ১০০ কোটি ডলার।
তবে এর উৎপাদনও সময়সাপেক্ষ। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বছরে মাত্র ৬০০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রও নিজেদের মজুত থেকে সহজে এগুলো দিতে চাইছে না। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ইরান যুদ্ধের সময় দেশটি নিজেদের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের অর্ধেকেরও বেশি ব্যবহার করেছে।
এ প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, 'আমাদের কাছে প্যাট্রিয়ট আছে, কিন্তু খুব বেশি নয়। আমাদের নিজেদের প্রয়োজনও রয়েছে।'
অন্যদিকে, ইউক্রেনের জন্য এ ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন অত্যন্ত জরুরি বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়া ইউক্রেনে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বাড়িয়েছে। শুধু গত সপ্তাহেই রাজধানী কিয়েভে একাধিক হামলায় কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
মে মাসের শেষ দিকে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি নিশ্চিত করেছিলেন, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের লাইসেন্স নিয়ে দেশে উৎপাদনের অনুমতি চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে ইউক্রেন।
সাড়ে চার বছরের যুদ্ধের পর স্থলযুদ্ধ অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। তবে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এখনও ইউক্রেনের জন্য বড় হুমকি। জেলেনস্কির ভাষায়, এটি রাশিয়ার 'শেষ বড় সুবিধা'।
ইউক্রেনের বিমান বাহিনী জানিয়েছে, ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের 'তীব্র সংকটের' কারণে গত রোববার রাতে রাশিয়ার ছোড়া ২৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের একটিও ভূপাতিত করা সম্ভব হয়নি। ওই হামলায় ২০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন।
ট্রাম্প বলেন, ইউক্রেনকে লাইসেন্স দেওয়া হলে তারা নিজেরাই প্যাট্রিয়ট তৈরি করতে পারবে। এতে 'আমরা যথেষ্ট দিচ্ছি না'—এ ধরনের অভিযোগও থাকবে না।
তবে ইউক্রেনের সামরিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, দেশটির ভেতরে এখনই প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাস্তবসম্মত নয়।
সাবেক ইউক্রেনীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও সামরিক বিশ্লেষক ইভান স্টুপাক বিবিসিকে বলেন, 'প্যাট্রিয়ট আমাদের প্রতিরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এত উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেনের পক্ষে এখন তৈরি করা সম্ভব নয়।'
তার ধারণা, প্রযুক্তিগত ও আইনি কারণে উৎপাদন ইউরোপের কোনো দেশে হতে পারে এবং পুরো প্রক্রিয়া তদারকির আওতায় থাকবে। এতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
তিনি বলেন, 'নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্রেনের কোথাও এখন পুরোপুরি নিরাপদ নয়।'
এদিকে ট্রাম্প দাবি করেন, সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন রাশিয়ার অভ্যন্তরে দূরপাল্লার হামলায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। তার মতে, এটি উত্তেজনা বাড়ালেও যুদ্ধ শেষ করার পথও তৈরি করতে পারে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা মস্কোকে দেখিয়ে দিচ্ছে যে নিজেদের আকাশসীমা রক্ষা করাও তাদের জন্য কঠিন। এতে যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়বে।
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে চান। তিনি বলেন, এ বিষয়ে পুতিনের সঙ্গে তার নিয়মিত কথা হয়।
ট্রাম্প ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে আবারও জেলেনস্কি ও পুতিনের সরাসরি বৈঠকের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন। পুতিন আগেও মস্কোতে এমন বৈঠকের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
ট্রাম্প জেলেনস্কিকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি মস্কো যেতে রাজি কি না। জবাবে জেলেনস্কি রসিকতা করে বলেন, 'বিষয়টি কঠিন। সেখানে এখন অনেক ইউক্রেনীয় ড্রোন উড়ছে।'
