ইউক্রেনকে ‘স্টর্ম শ্যাডো’ ক্ষেপণাস্ত্রের ব্লুপ্রিন্ট দিল ফ্রান্স
রাশিয়ার হামলা মোকাবিলায় নিজেদের সামরিক শক্তি আরও বৃদ্ধি করতে একটি বড় ধরনের প্রতিরক্ষা চুক্তির অংশ হিসেবে ইউক্রেনকে 'স্কাল্প-ইজি' ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের ব্লুপ্রিন্ট বা নকশা দিয়েছে ফ্রান্স। এই চুক্তির ফলে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের নিজস্ব কারখানাতেই এই অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রটি তৈরি করার লাইসেন্স পেল কিয়েভ।
মূলত 'স্টর্ম শ্যাডো' এবং 'স্কাল্প-ইজি'—এই দুটি সম্পূর্ণ একই এবং অভিন্ন আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। যুক্তরাজ্য বা ব্রিটেন এই ক্ষেপণাস্ত্রটিকে 'স্টর্ম শ্যাডো' নামে ব্যবহার করে, অন্যদিকে ফ্রান্স এটিকে 'স্কাল্প-ইজি' নামে ডাকে। এটি একটি দূরপাল্লার ও রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম (লো-অবজারভেবল) ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র।
এই চুক্তিটি ইউক্রেনীয় অস্ত্র নির্মাতাদের জন্য ফরাসি প্রযুক্তির 'এস্টার' আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র এবং 'এএএসএম' সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম (প্রিসিশন-গাইডেড) আকাশ থেকে মাটিতে নিক্ষেপযোগ্য বোমা তৈরির পথও সুগম করবে।
চুক্তিটিতে ফরাসি প্রযুক্তির ১৬টি নতুন 'রাফাল' ফাইটার জেট এবং চারটি 'স্যাম্প/টি' সারফেস-টু-এয়ার (ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য) ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারির অর্ডারও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর ফলে ইউক্রেনই হবে বিশ্বের প্রথম দেশ, যারা যুদ্ধক্ষেত্রে এই ফরাসি-ইতালীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি মোতায়েন করতে যাচ্ছে। এছাড়া ফ্রান্স এবং ইতালি যৌথভাবে ইউক্রেনকে 'এস্টার ৩০' ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের লাইসেন্সপ্রাপ্ত উৎপাদনের অনুমতি দিয়েছে।
এই ঐতিহাসিক চুক্তিতে সই করতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি প্যারিস সফর করেন। চুক্তি সইয়ের পর তিনি বলেন, এটি 'ইউক্রেনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে ফ্রান্সের প্রকৃত নেতৃত্বের প্রতিফলন, যা সমগ্র ইউরোপের স্বার্থ রক্ষা করবে।'
ইউক্রেনের এই নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিটি অবশ্য এই প্রশ্নটি সামনে নিয়ে আসবে যে, যুক্তরাজ্য তাদের নিজস্ব 'স্টর্ম শ্যাডো' প্রযুক্তির এমন যৌথ উৎপাদনে সম্মতি দিয়েছে কি না। তবে এটি ইউক্রেনের বিকাশমান দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য আরেকটি বড় সাফল্য।
কয়েক দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনকে আমেরিকার তৈরি প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য 'পিএসি-৩' ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের অনুমতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এর ঠিক পরপরই ফ্রান্সের সঙ্গে এই চুক্তি সম্পন্ন করলেন জেলেনস্কি।
ক্রয়কৃত রাফাল ফাইটার জেটগুলো ২০২৮ সালের মধ্যে ইউক্রেনের আকাশে উড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এগুলো পরিচালনার জন্য ইউক্রেনীয় পাইলটদের দীর্ঘমেয়াদি ও নিবিড় প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হবে।
ইউক্রেনীয় কারখানায় তৈরি প্রথম ফরাসি অস্ত্র কবে নাগাদ উৎপাদিত হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখের উল্লেখ করা হয়নি। তবে চুক্তিতে বলা হয়েছে: 'ফ্রান্স ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ এবং যত দ্রুত সম্ভব ইউক্রেনে এএএসএম বোমা এবং স্কাল্প ক্ষেপণাস্ত্রের লাইসেন্সপ্রাপ্ত উৎপাদনকে অনুমোদন দিচ্ছে।'
একটি নতুন অস্ত্র কারখানা স্থাপনের জটিলতা বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমাগুলো সম্ভবত কোনো ভবিষ্যৎ শান্তি চুক্তির পরেই উৎপাদিত হবে। পরবর্তীতে সেগুলো ইউক্রেন নিজেদের নিরাপত্তা গ্যারান্টি হিসেবে রেখে দিতে পারে অথবা ইউরোপের সামরিক মজুদে পুনরায় বিক্রি করতে পারে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ওপর চাপ বাড়াতে রাশিয়ার অভ্যন্তরে গভীরতম স্থানে হামলা চালানোর ক্ষেত্রে স্টর্ম শ্যাডো বা স্কাল্প-এর মতো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইউক্রেনের যুদ্ধকালীন কৌশলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। যেমন চলতি বছরের শুরুতে ইউক্রেন ব্রিটিশ স্টর্ম শ্যাডো ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে রাশিয়ার অন্যতম শীর্ষ সামরিক উৎপাদন কারখানা ধ্বংস করে দিয়েছিল। একই সময়ে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আঘাতে রাশিয়ার ডজনখানেক তেল শোধনাগার ধ্বংস হয়েছিল।
তবে শীতের আগে ইউক্রেনের শহর ও জ্বালানি অবকাঠামোতে রাশিয়ার ধ্বংসাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকাতে কিয়েভের জরুরি ভিত্তিতে প্রচুর আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজন। রাশিয়ার ফ্রন্ট লাইনের সামরিক অগ্রগতি প্রায় স্থবির হয়ে পড়ায় শান্তি আলোচনায় কিয়েভের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পুতিনের শেষ বড় অস্ত্র এখন ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোতে এই দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইউক্রেন নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ড্রোন দিয়ে রাশিয়ার তেল উৎপাদনের ওপর পাল্টা দূরপাল্লার হামলা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে ফ্রন্ট লাইনের পেছনে অবস্থিত রাশিয়ার সামরিক উৎপাদন কেন্দ্র ও সুরক্ষিত বাঙ্কারগুলোতে আঘাত হানতে তারা পশ্চিমা বিশ্বের দেওয়া ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমাগুলো ব্যবহার করছে।
