রাশিয়ার অনলাইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের গুদামে ইউক্রেনের ভয়াবহ ড্রোন হামলা, নিহত ৮
রাশিয়ার বৃহত্তম অনলাইন খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওয়াইল্ডবেরিজ-এর দুটি গুদামে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। এই হামলায় ৮ জন নিহত ও ৬২ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন রুশ কর্মকর্তারা। খবর বিবিসির
একটি হামলায় মস্কো থেকে প্রায় ৪৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত তাম্বোভ শহরের একটি গুদামে ৭ জন নিহত ও ২৫ জন আহত হয়েছেন। আর মস্কো অঞ্চলের ইলেকট্রোস্টাল এলাকায় ওয়াইল্ডবেরিজের অন্য একটি গুদামে চালানো হামলায় একজন নিহত ও ৩৭ জন আহত হন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, এই হামলাগুলো এমন কিছু "প্রধান রসদ সরবরাহকারী স্থাপনায়" চালানো হয়েছে, যেগুলো "ড্রোন উৎপাদন ও নেভিগেশন সরঞ্জামের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপিত যন্ত্রাংশ সরবরাহ" করতে ব্যবহৃত হচ্ছিল। জেলেনস্কি আরও বলেছেন, ইউক্রেন আজভ সাগর, কৃষ্ণসাগর ও রাশিয়ার দখলে থাকা ক্রিমিয়ায় অবস্থিত বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতেও আঘাত হেনেছে।
গুদামে হামলার একটি ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া যাচাই না করা কিছু ছবিতে দেখা গেছে, বিশাল লজিস্টিকস ভবনটি থেকে আগুনের শিখা ও কালো ধোঁয়ার তীব্র কুণ্ডলী উঠছে। এসময় অনেক কর্মীকে দৌড়ে গাড়ি পার্কিং এরিয়ার দিকে যেতে দেখা যায়।
এই হামলাগুলো রাতের বেলায় শুরু হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিছু ভিডিওতে দেখা গেছে, বিস্ফোরণ চলতে থাকায় আতঙ্কিত ও আহত কর্মীরা ভবন থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। অন্য একটি ভিডিও ক্লিপে দেখা যায়, আগুনের লেলিহান শিখায় গ্রাস করায় একটি গুদামের দেয়াল ধসে পড়ছে।
জেলেনস্কি বলেন, "আমাদের বেসামরিক অবকাঠামো এবং আমাদের শহর ও জনপদগুলোর ওপর রুশ হামলার" জবাবে ইউক্রেন এই পাল্টা অভিযান চালিয়েছে। উল্লেখ্য, বুধবার রাতভর ইউক্রেনজুড়ে চালানো রুশ হামলায় ১৪ জন নিহত হন।
ওয়াইল্ডবেরিজকে মার্কিন ই-কমার্স জায়ান্ট আমাজনের রুশ সংস্করণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। ফোর্বস রাশিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিজ্ঞাপন সংস্থা 'রাস'-এর সঙ্গে একীভূত হওয়া এই আরডব্লিউবি গ্রুপের বাজারমূল্য ছিল প্রায় ১,২৬০ কোটি মার্কিন ডলার।
ইউক্রেনের সিকিউরিটি অ্যান্ড কো-অপারেশন সেন্টারের চেয়ারম্যান সের্হি কুজান বিবিসিকে বলেছেন, ওয়াইল্ডবেরিজ ছিল রাশিয়ার লজিস্টিকস ব্যবস্থার একটি "অপরিহার্য অংশ"। রাশিয়ার ভলান্টিয়ার টিমগুলো এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ওয়াকিটকি, বডি আর্মার এবং ড্রোনের যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম কেনাকাটা করত।
তিনি বলেন, "ওয়াইল্ডবেরিজের গুদামে আঘাত হানার মূল কারণ হলো— রাশিয়ার লজিস্টিকস ব্যবস্থা এবং রুশ সেনাবাহিনী ও অস্ত্র নির্মাতাদের কাছে দ্বৈত-ব্যবহার উপযোগী পণ্য, গুরুত্বপূর্ণ ইলেকট্রনিক্স ও নিষেধাজ্ঞা থাকা পণ্য সরবরাহ ব্যাহত করা"
"এই ধরনের হামলার আনুষঙ্গিক ক্ষতি রাশিয়ার অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। সেই সঙ্গে এটি রুশ সমাজে একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলবে ও যুদ্ধের প্রতি তাদের অব্যাহত সমর্থনে ফাটল ধরাবে," বলেন তিনি।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়াও ইউক্রেনের ডাক পরিষেবা এবং কিছু ইলেকট্রনিক্স পরিবেশকসহ এই ধরনের সমজাতীয় বেসামরিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে আসছে।
ওয়াইল্ডবেরিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তাতিয়ানা কিম—যিনি রাশিয়ার প্রথম নারী বিলিয়নিয়ারদের একজন—বলেছেন, এটি রাশিয়া এবং এই কোম্পানির জন্য একটি "ভয়াবহ রাত" ছিল।
তাম্বোভ অঞ্চলের গভর্নর ইয়েভগেনি পারভিশভ টেলিগ্রামে লিখেছেন, "নাইট শিফটে কাজ করা ৭ জন ঘটনাস্থলেই নিহত হন।" তিনি আরও জানান, হামলার জন্য ধেয়ে আসার সময় ওই এলাকায় ২৮টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।
তিনি জানান, হামলায় ২৫ জন আহত হয়েছেন, যার মধ্যে ৭ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আহতদের বেশিরভাগই বোমার স্প্লিন্টারের আঘাতে জখম হয়েছেন।
ব্যবহৃত ড্রোনের সংখ্যা এবং হতাহতের দিক থেকে এটি তাম্বোভ অঞ্চলে চালানো "সবচেয়ে বড় ও অমানবিক" হামলা ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এদিকে, মস্কো অঞ্চলের গভর্নর আন্দ্রেই ভোরোবিওভ জানিয়েছেন, ইলেকট্রোস্টালে ওয়াইল্ডবেরিজের গুদামে হামলায় আহতদের মধ্যে ৮ জনের অবস্থা গুরুতর।
তিনি আরও জানান, রাতভর মস্কো অঞ্চলে মোট ৪৮টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। এই করিডোরে ভূপাতিত একটি ড্রোনের আঘাতে রাশিয়ার একটি তেল ডিপো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি টেলিগ্রামে লেখেন, "দমকলকর্মী, জরুরি সেবা বিভাগ ও জরুরি পরিস্থিতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মীরা ঘটনাস্থলে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।" তবে ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত বিবরণ তিনি দেননি। আলাদাভাবে জেলেনস্কিও নিশ্চিত করেছেন যে ইউক্রেন "একটি তেল স্থাপনায়" আঘাত হেনেছে।
ইউক্রেন সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোগুলোকে লক্ষ্য করে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা জোরদার করেছে, যার ফলে দেশটিতে ব্যাপক জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে কিয়েভ দাবি করেছিল, এর ফলে রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৪৩ শতাংশ "অচল" হয়ে পড়েছে।
তবে বিবিসি জানিয়েছে, তারা স্বাধীনভাবে এই পরিসংখ্যানের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।
ইউক্রেনের দাবি, রাশিয়ার তেল ও গ্যাস স্থাপনাগুলো বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু, কারণ ইউক্রেনে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে জ্বালানি রপ্তানি আয়ের ওপর অনেকটাই নির্ভর করে মস্কো।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গত মাসে বিরল এক স্বীকারোক্তিতে জানান যে, ইউক্রেনীয় হামলার কারণেই জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। পরে চলতি মাসের শুরুর দিকে তিনি দেশের বাজারে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে একটি বিল পাস করে তা আইনে পরিণত করেন।
