নাগরিকত্ব বিক্রি বন্ধ না করলে শেনজেনে ভিসা-মুক্ত সুবিধা বাতিল: ক্যারেবিয়ান ৫ দেশকে ইইউ-র আলটিমেটাম
অর্থের বিনিময়ে সরাসরি নাগরিকত্ব বা 'গোল্ডেন পাসপোর্ট' বিক্রির লাভজনক কর্মসূচি বন্ধ করতে পূর্ব ক্যারেবিয়ান অঞ্চলের পাঁচটি দেশকে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ইউরোপের এই শক্তিশালী অর্থনৈতিক জোটটি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই কর্মসূচি বন্ধ না করলে শেনজেনভুক্ত দেশগুলোতে এসব দেশের নাগরিকদের ভিসা-মুক্ত যাতায়াতের সুবিধা সম্পূর্ণ বাতিল করা হবে।
যে পাঁচটি দেশকে এই আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো—অ্যান্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডা, ডমিনিকা, গ্রেনাডা, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস এবং সেন্ট লুসিয়া। এই দেশগুলো তাদের 'সিটিজেনশিপ-বাই-ইনভেস্টমেন্ট' (সিবিআই) কর্মসূচির মাধ্যমে বিপুল রাজস্ব আয় করে থাকে। ন্যূনতম ২ লাখ ডলার (প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা) দিয়ে যেকোনো বিদেশি এসব দেশের পাসপোর্ট কিনতে পারেন। এই পাসপোর্টের সুবাদে ইউরোপের অধিকাংশ দেশসহ বিশ্বের ১৪০টিরও বেশি দেশে ভিসা ছাড়াই সফর করা যায়।
'অর্গানাইজেশন অব ইস্টার্ন ক্যারিবিয়ান স্টেটস'-এর তথ্য অনুযায়ী, ইইউর নতুন বিধিমালার আলোকে গত মাসে ব্রাসেলস থেকে ওই পাঁচ দেশকে চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, এমন পদ্ধতি চালু রাখা ভিসা-মুক্ত সুবিধা স্থগিত করার অন্যতম আইনি ভিত্তি। তাই আগামী ২০২৮ সালের ১ জুনের মধ্যে এই কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করার আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছে।
ইইউর এই কড়া চিঠির জবাবে দেশগুলোর পক্ষ থেকে যৌথ প্রতিক্রিয়া জানানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি ডমিনিকায় এক বৈঠকে মিলিত হয়ে ওই পাঁচ দেশের প্রধানমন্ত্রীরা জানিয়েছেন, তারা যৌথভাবে ব্রাসেলসে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল পাঠাবেন। যেখানে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেইন, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা এবং অন্যান্য শীর্ষ ইইউ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করা হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরেই এই 'বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব' দেওয়ার নীতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। সমালোচকদের মতে, আবেদনকারীদের সঠিক তথ্য যাচাই-বাছাই (ভেটিং) না করায় এর মাধ্যমে অর্থ পাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়ন, পরিচয় জালিয়াতি এবং অবৈধ অভিবাসনের ঝুঁকি ব্যাপক বৃদ্ধি পায়।
অবশ্য 'অর্গানাইজেশন অব ইস্টার্ন ক্যারিবিয়ান স্টেটস'-এর মহাপরিচালক ডিডাকাস জুলস বলেন, এই অর্থনৈতিক নীতি স্রেফ ক্যারেবিয়ান অঞ্চলের কোনো একক বিষয় নয়, বিশ্বজুড়ে অর্ধেকেরও বেশি দেশ ভিন্ন ভিন্ন নামে বিনিয়োগের বিনিময়ে আবাসন বা নাগরিকত্ব দিয়ে থাকে। এমনকি গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও 'ট্রাম্প গোল্ড কার্ড' নামে ১০ লাখ ডলারের একটি প্রস্তাব চালু করেছিলেন, যার মাধ্যমে যোগ্য ব্যক্তিদের সরাসরি মার্কিন নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় (গত মে মাস পর্যন্ত এতে ১ জন অনুমোদিত হয়েছেন)।
ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এই পাঁচ দেশ মিলে এ পর্যন্ত ১ লাখেরও বেশি বিদেশি নাগরিককে পাসপোর্ট প্রদান করেছে। আবেদন করার জন্য আবেদনকারীকে সাধারণত ওই দেশে সশরীরে উপস্থিতও হতে হয় না; কেবল অ্যান্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডা ভ্রমণের শর্ত রাখে। সাধারণত এক বছরের মধ্যে এসব পাসপোর্ট দেওয়া হয় এবং আবেদন বাতিলের হার ১ শতাংশের কাছাকাছি।
২০২৪ সালে এই দেশগুলোতে আবেদনকারীদের সিংহভাগই ছিলেন চীন, সিরিয়া, ইরাক ও নাইজেরিয়ার নাগরিক—যেসব দেশের নাগরিকদের ইউরোপে প্রবেশের জন্য ইইউর কঠোর ভিসার প্রয়োজন হয়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল-এর প্রতিনিধি হিউ জর্গেনসেন বলেন, এই ধরনের কর্মসূচির প্রধান ঝুঁকি হলো—'এখানে মূলত নির্দিষ্ট দেশের নাগরিকত্ব বিক্রি করা হচ্ছে না, বরং অন্য দেশগুলোতে প্রবেশের অধিকার বিক্রি করা হচ্ছে।' তিনি যোগ করেন, এর মাধ্যমে অপরাধীরা অর্থ পাচার করতে পারে অথবা নিজ দেশে অপরাধ করে আন্তর্জাতিক বিচার এড়াতে অন্য দেশে আশ্রয় নিতে পারে।
আইনজীবী প্রতিষ্ঠান হার্ভে ল গ্রুপের প্রধান জঁ-ফ্রাঁসোয়া হার্ভে জানান, তাদের কাছে আসা অধিকাংশ মক্কেলই মূলত কর ফাঁকি দেওয়া ও সম্পদে ছাড় পাওয়ার উদ্দেশে দ্বিতীয় নাগরিকত্ব চান। তবে তারা সন্দেহভাজন বা অপরাধীদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এই পাঁচ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) গড়ে প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এসেছে এই পাসপোর্ট বিক্রির অর্থ থেকে। ২০২২ সালে ডমিনিকার জিডিপির ৩০ শতাংশেরও বেশি এসেছে এই খাত থেকে। আর অ্যান্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডার সরকারের মোট অ-কর রাজস্বের প্রায় ৬০ শতাংশই আসে এই কর্মসূচি থেকে।
দেশগুলোর প্রধানমন্ত্রীরা জানিয়েছেন, এই অর্থ দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, দুর্যোগ উদ্ধার, অবকাঠামো উন্নয়ন, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো মৌলিক খাতে ব্যয় করা হয়। ফলে বিকল্প কোনো আয়ের উৎস নিশ্চিত না করে এই কর্মসূচি হুট করে বন্ধ করে দেওয়া হলে ছোট এসব দ্বীপ রাষ্ট্রের অর্থনীতি মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
উল্লেখ্য, বিশ্বজুড়ে এই পাঁচ দেশের পাসপোর্টের ওপর প্রতিনিয়ত কড়াকড়ি বাড়ছে। গত বছর ইইউ আদালত নাগরিকত্ব বিক্রিকে 'বাণিজ্যিকীকরণ' হিসেবে আখ্যা দিয়ে রায় দেয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে ইইউ তাদের নিয়মে পরিবর্তন আনে। (ইইউ সদস্যভুক্ত একমাত্র দেশ হিসেবে মাল্টাতেও এমন নিয়ম ছিল, যা পরবর্তীতে বন্ধ করা হয়)।
এছাড়াও ২০১৭ সালে কানাডা এবং ২০২৩ সালে যুক্তরাজ্য ডমিনিকা ও সেন্ট লুসিয়ার নাগরিকদের ওপর থেকে ভিসা-মুক্ত সুবিধা তুলে নেয়। যুক্তরাজ্য ২০২২ সালেই তাদের 'গোল্ডেন ভিসা' বন্ধ করে দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রও চলতি বছরের জানুয়ারিতে এই দেশগুলোর নাগরিকদের ওপর নির্দিষ্ট ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত করেছে এবং নিরাপত্তা বাড়াতে এ মাসের শুরুতে নতুন বায়োমেট্রিক তথ্য আদান-প্রদান চুক্তি সই করেছে।
