ইইউ-র নতুন বর্ডার সিস্টেমের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছেন অভিন্ন যমজরা
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নতুন ডিজিটাল সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এন্ট্রি/এক্সিট সিস্টেম (ইইএস) অভিন্ন যমজদের জন্য বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের অভিযোগ, মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি অনেক ক্ষেত্রে অভিন্ন যমজদের আলাদা ব্যক্তি হিসেবে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হচ্ছে, ফলে বিমানবন্দর ও সীমান্তে ভুল শনাক্তকরণ ও হয়রানির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
চলতি বছরের এপ্রিলে চালু হওয়া ইইএস-এর মাধ্যমে ইইউ শেনজেন অঞ্চলে প্রবেশকারীদের ছবি, আঙুলের ছাপ ও পাসপোর্টের তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। ভবিষ্যতে এই তথ্য ব্যবহার করে ভ্রমণকারীদের পরিচয় যাচাই করা হবে, যাতে কাগজের পাসপোর্টের ওপর নির্ভরতা কমে।
তবে যমজ সন্তানের পরিবারগুলো বলছে, মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি প্রায়ই অভিন্ন যমজদের একই ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে।
যমজদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থা 'টুইনস ট্রাস্ট'-এর ক্যাম্পেইন প্রধান ভিক্টোরিয়া মোরেল নিজেই দুই জোড়া যমজ ছেলের মা। তিনি জানান, ফেসিয়াল রিকগনিশন (মুখাবয়ব চেনার) সফটওয়্যারটি প্রায়ই তার যমজ দুই সন্তানকে একই ব্যক্তি হিসেবে শনাক্ত করে।
মোরেল বলেন, 'সব জায়গায় যদি আমাদের ফেসিয়াল রিকগনিশন ব্যবহার করতে হয়, তবে কী অবস্থা হবে তা ভেবেই আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। আমি জানি এই সমস্যায় আমরা একাই ভুগছি না, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অন্য অনেক বাবা-মাও একই অভিজ্ঞতার কথা আমাকে জানিয়েছেন।'
তিনি আরও বলেন, 'আমরা প্রচুর ভ্রমণ করি এবং যেসব বিমানবন্দরে উড়োজাহাজে ওঠার জন্য ফেসিয়াল আইডেন্টিফিকেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, সেখানে আমাদের অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। প্রযুক্তিটি স্ক্যান করার পর বলে ওঠে যে এই ব্যক্তি ইতিমধ্যে স্ক্যান সম্পূর্ণ করেছেন। মানুষের চোখে তারা যে আলাদা দুই শিশু, তা পরিষ্কার বোঝা গেলেও ক্যামেরার চোখে তা ধরা পড়ে না।'
মোরেলের দুই জোড়া যমজ ছেলের এক জোড়ার বয়স ১৩ বছর (সেভ ও অরেলিও) এবং অন্য জোড়ার বয়স ৮ বছর (নিকো ও রাফায়েল)। মোরেল বলেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের চেহারার সাদৃশ্য হয়তো কিছুটা কমবে, তবে বর্তমানে তারা তাদের মুখাবয়ব ব্যবহার করে একে অপরের ফোন আনলক করে ফেলতে পারছে! এমনকি স্কুলের দুপুরের খাবারের বিল পরিশোধের জন্য ব্যবহৃত ফেসিয়াল রিকগনিশন সফটওয়্যারও তাদের গুলিয়ে ফেলছে।
তিনি বলেন, 'এই সমস্যাটি বারবার ঘটছে এবং প্রযুক্তিটি দিন দিন সাধারণ হয়ে ওঠায় এই ভোগান্তি আরও বাড়ছে। মানুষ যে এই বিষয়গুলো নিয়ে আগেই ভাবেনি, তা সত্যিই আশ্চর্যজনক। যেমন চিকিৎসকের চেম্বারে ডিজিটালি সাইন-ইন করার সময় জন্মতারিখ ও পদবি চাওয়া হয়। ছেলেদের ক্ষেত্রে এই দুটি তথ্যই তো এক।'
গত এপ্রিলে রোমানিয়ার সীমান্ত পুলিশ একজন ব্রিটিশ নারীকে আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করে, কারণ বায়োমেট্রিক স্ক্যান করার সময় ভুলবশত তাকে তার যমজ বোন হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছিল।
পলিটিকো-র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোমানিয়ার কর্তৃপক্ষ ওই নারীর বিরুদ্ধে অবৈধভাবে শেনজেন জোনে অবস্থান করার অভিযোগ তুলেছিল। কারণ আমস্টারডাম থেকে তার প্রস্থানের বিষয়টি সঠিকভাবে নথিবদ্ধ করা হয়নি। কিন্তু মজার বিষয় হলো, ওই নারী কখনোই আমস্টারডামে যাননি; গিয়েছিলেন তার হুবহু একই রকম দেখতে যমজ বোন!
যদিও ইইএস সিস্টেমে আঙুলের ছাপ, পুরো নাম এবং পাসপোর্ট ডেটার পাশাপাশি ফেসিয়াল রিকগনিশনও ব্যবহার করা হয়, তবে রোমানিয়ার এই ঘটনা প্রমাণ করে যে যমজদের একই ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য ফেসিয়াল রিকগনিশন ডেটাই যথেষ্ট।
টুইনস ট্রাস্টের মুখপাত্র রফি কুপার বলেন, 'ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহার করা সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং যমজ সন্তানদের পরিবার—উভয়ের জন্যই জটিলতা তৈরি করছে। প্রায় সময়ই যমজদের আলাদা দুজন স্বতন্ত্র মানুষের পরিবর্তে একই ব্যক্তি হিসেবে ধরে নেয়। প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আমরা নীতিনির্ধারকদের যমজদের স্বতন্ত্র সত্তার বিষয়টি বিবেচনা করার অনুরোধ জানাই।'
এ বিষয়ে ইউরোপীয় কমিশনের একজন মুখপাত্র পলিটিকোকে বলেন, 'শেনজেন এলাকায় প্রবেশের সময় ভ্রমণকারীদের প্রথমবারের মতো বাহ্যিক সীমানা অতিক্রম করার সময় পাসপোর্টের তথ্যের পাশাপাশি তাদের বায়োমেট্রিক ডেটাও দিতে হয়। এর মাধ্যমেই প্রতিটি ভ্রমণকারীকে আলাদাভাবে শনাক্ত করা সম্ভব।'
তবে ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইএটিএ) সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছে যে, চলতি গ্রীষ্মে ইইএস-এর কারণে সীমান্ত পার হতে লাইনে দাঁড়ানোর সময় ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। অন্যদিকে দ্য টেলিগ্রাফ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে কীভাবে গত এপ্রিলে ইইএস পুরোপুরি চালুর পর বিমানের ফ্লাইট বিলম্বের হার নজিরবিহীন স্তরে পৌঁছেছে। স্পেন, পর্তুগাল, ফ্রান্স এবং ইতালির বিমানবন্দরগুলো এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
ইউরোপের প্রায় ১,৭০০টি সীমান্ত পারাপার পয়েন্টে ইইএস ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক। ইইউ-এর নিয়মানুযায়ী ব্যস্ত সময়ে ভিড় এড়াতে সাময়িকভাবে বায়োমেট্রিক পরীক্ষা স্থগিত করার সুযোগ থাকলেও সব জায়গায় তা মানা হচ্ছে না।
গত জুনে লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টারে ট্রাভেল ইন্ডাস্ট্রির এক সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় ইইউ সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্স-এর ডেপুটি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর উকু সারেকানো সতর্ক করে বলেন, বিমানবন্দরের এই ধীরগতি ও জট আরও দুই বছর পর্যন্ত বজায় থাকতে পারে।
তিনি বলেন, 'আমরা আশা করছি এক বা দুই বছরের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রথমবারের মতো নিবন্ধন করা, কারণ ওই সময় আঙুলের ছাপ এবং মুখের ছবি নেওয়া হয়। কোনো ব্যক্তি যদি (তিন বছরের মধ্যে) আবার ইইউ ভ্রমণ করেন, তবে তাকে একই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে না, তাই তিনি দ্রুত সীমান্ত পার হতে পারবেন।'
