গাজায় ধ্বংসযজ্ঞের ১৭টি গোপন রিপোর্ট সরাল ইইউ; ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের গণহত্যার অভিযোগ
গাজায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে নির্মিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংসের তথ্য সম্বলিত ১৭টি গোপন প্রতিবেদন প্রকাশ করতে অস্বীকার করেছে ইউরোপীয় কমিশন। ধারণা করা হচ্ছে, এই প্রতিবেদনগুলো প্রকাশ পেলে গাজায় বেসামরিক প্রকল্পে ইসরায়েলি ধ্বংসযজ্ঞের অকাট্য প্রমাণ সামনে আসত। এর ফলে ইসরায়েলের সঙ্গে বিদ্যমান অংশীদারিত্ব বজায় রাখা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল কি না—সেই প্রশ্নে ব্রাসেলসের ওপর প্রবল আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, ইইউ ঠিক সেদিনই এই তথ্য গোপনের সিদ্ধান্ত নিলো, যেদিন জাতিসংঘের একটি তদন্ত দল তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে ইসরায়েল গাজায় পরিকল্পিতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করে 'গণহত্যা' চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাকতালীয় ঘটনাটি প্রশ্ন তুলছে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চুক্তি স্থগিত করার জোরালো দাবি ঠেকাতেই কি ইইউ এসব তথ্য লুকিয়ে রাখছে?
ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যম 'ইইউ-অবজারভার'-এর সাংবাদিক নিকোলাজ নিলসেন তথ্য অধিকার আইনের আওতায় গত ফেব্রুয়ারি মাসে ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের শেষ পর্যন্ত গাজায় ইইউ-তহবিলের অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর ওপর প্রতিবেদন চেয়ে আবেদন করেছিলেন। গত ২৩ জুন মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিভাগীয় প্রধান মাইকেল কারনিটশনিগ স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়।
ইইউ-অবজারভার জানায়, চিঠিতে কারনিটশনিগ লিখেছেন, 'আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি যে এই তথ্যগুলো প্রকাশের পেছনে বৃহত্তর কোনো জনস্বার্থ আছে কি না, কিন্তু আমরা তেমন কোনো কারণ খুঁজে পাইনি।'
এই দাবিটি ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। প্রতিবেদনগুলোতে গাজার সোলার প্যানেল, পানি বিশুদ্ধকরণ প্রকল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং হাসপাতাল ও স্কুলের মতো বেসামরিক স্থাপনার তথ্য ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, এর মধ্যে অনেকগুলোই ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এই তথ্যগুলো প্রকাশিত হলে ইউরোপীয় করদাতাদের টাকার ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি এটিও স্পষ্ট হতো যে ইসরায়েল কতটা পরিকল্পিতভাবে বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এর ফলে 'ইইউ-ইসরায়েল অ্যাসোসিয়েশন এগ্রিমেন্ট'-এর মানবাধিকার রক্ষা সংক্রান্ত শর্ত ভঙ্গের দায়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ব্রাসেলসের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ত।
তথ্য না দেওয়ার পেছনে কমিশন 'আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সুরক্ষা'র অজুহাত দিয়েছে। ইইউ-অবজারভার-এর মতে, ক্ষতিগ্রস্ত প্রকল্পগুলোর অংশীদার ছিল জার্মানির কেএফডব্লিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, অক্সফাম নোবিব এবং উই ওয়ার্ল্ড-এর মতো সংস্থা। এর মধ্যে দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস শহরের একটি পানি শোধন প্রকল্পও রয়েছে, যা ইসরায়েলি স্থল অভিযানে বিধ্বস্ত হয়েছে।
ইইউ-অবজারভার-এর একটি পৃথক প্রাক্কলন অনুযায়ী, ক্ষতিপূরণ ছাড়াই গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে নির্মিত প্রায় ১৫ কোটি ইউরো মূল্যের ভবন ও স্থাপনা বোমা মেরে বা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েল। চলতি মাসের শুরুতে ইইউ কমিশনার দুব্রাভকা সুইকা জানিয়েছিলেন যে, এসব সম্পদের বিনিময়ে ইসরায়েলের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে ইইউ। কিন্তু এখন সেই তদন্ত রিপোর্টগুলোই জনসমক্ষে আনতে চাইছে না কমিশন।
জাতিসংঘের রিপোর্ট একই সময়ে ফিলিস্তিনের অধিকৃত ভূখণ্ডে জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন এক ভয়াবহ উপসংহারে পৌঁছেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এবং নিরাপত্তা বাহিনী পরিকল্পিতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের হত্যা করছে, যা গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধের নামান্তর।
তদন্ত কমিশনের মতে, 'শিশুদের ওপর সুপরিকল্পিত হামলা' মূলত গাজায় ফিলিস্তিনিদের আংশিক বা সম্পূর্ণ ধ্বংস করার ইসরায়েলি অভিপ্রায়ের অন্যতম বড় প্রমাণ। তদন্ত কমিশনের প্রধান শ্রীনিবাসন মুরলিধর বলেন, 'ফিলিস্তিনি শিশুরা ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে নিয়মিত প্রাণ হারাচ্ছে। এমনকি ২০২৫ সালের অক্টোবরে ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পরেও শিশুদের হত্যা ও পঙ্গু করে দেওয়ার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।'
জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, ফিলিস্তিনি শিশুদের গ্রেপ্তার করে বিভিন্ন কারাগারে ও ডিটেনশন সেন্টারে অবর্ণনীয় নির্যাতন ও যৌন সহিংসতা চালানো হচ্ছে। দখলদারিত্বের অধীনে থাকা একটি জাতিকে সামষ্টিকভাবে দমনের কৌশল হিসেবে শিশুদের ওপর এই নিষ্ঠুরতা চালানো হচ্ছে বলে জাতিসংঘ মনে করে।
