বাংলাদেশ থেকে প্রতিবেশী দেশগুলোতে আনফিল্টারড ইন্টারনেট রপ্তানির অনুমতি পেল স্টারলিংক
মার্কিন স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান স্টারলিংককে প্রতিবেশী দেশগুলোতে আনফিল্টারড আইপি ট্রানজিট সেবা রপ্তানি করার অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ রপ্তানি এবং নিজেদের সম্ভাব্য আঞ্চলিক ইন্টারনেট ট্রানজিট হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পথ খুলল।
গত এপ্রিলে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের পর সম্প্রতি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) স্টারলিংককে এই অনুমোদন দিয়েছে।
এই অনুমোদনের আওতায় স্টারলিংক শুধু প্রতিবেশী দেশগুলোর গ্রাহকদের আনফিল্টারড আইপি ট্রানজিট সেবা দিতে পারবে। এই আনফিল্টারড ব্যান্ডউইথ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ব্যবহার করা যাবে না এবং দেশীয় ব্যবহারকারীদের জন্য দেশের বিদ্যমান ইন্টারনেট ফিল্টারিং ব্যবস্থা বহাল থাকবে।
বিটিআরসির ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশনস বিভাগের কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ইকবাল আহমেদ টিবিএসকে বলেন, স্টারলিংকের আবেদন পাওয়ার অনেক আগে থেকেই কমিশন এই নীতিমালা নিয়ে কাজ করছিল। বিশদ মূল্যায়নের পর, চূড়ান্ত সরকারি অনুমোদন পাওয়ার আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রস্তাবটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল।
তিনি বলেন, স্টারলিংক যদি বাংলাদেশ থেকে আনফিল্টারড ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ রপ্তানি করে, তবে তারা সরকারকে একটি নির্দিষ্ট কমিশন দেবে, যা রাষ্ট্রীয় রাজস্বের একটি নতুন উৎস তৈরি করবে।
ইকবাল আহমেদ আরও বলেন, এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ইন্টারনেট ও ডাটা ট্রানজিট হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করতে পারে। পাশাপাশি এটি স্থানীয় ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তঃসীমান্ত ডাটা স্থানান্তরে অংশ নেওয়ার এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ করে দেবে।
ব্যান্ডউইথের উৎস
মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনপত্র অনুযায়ী, স্টারলিংক প্রাথমিকভাবে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস পিএলসি-র সাথে তাদের বিদ্যমান চুক্তির আওতায় ব্যান্ডউইথ সংগ্রহ করবে।
তবে বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস যদি প্রয়োজনীয় ব্রান্ডউইথ সরবরাহ করতে না পারে, সেক্ষেত্রে সামিট কমিউনিকেশন লিমিটেড ও ফাইবারঅ্যাটহোম লিমিটেড থেকে ব্রান্ডউইথ গ্রহণ বিবেচনা করা যেতে পারে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই অনুমোদন কার্যত দেশের বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের জন্য ইন্টারনেট সেবা রপ্তানির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল।
ব্যান্ডউইথ ক্রয় হ্রাস
এদিকে ইন্টারনেট রপ্তানির অনুমোদন পেলেও বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস থেকে ব্যান্ডউইথ কেনার পরিমাণ কমাচ্ছে স্টারলিংক।
বর্তমানে রাষ্ট্রায়াত্ত এই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ২০০ জিবিপিএস ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ কিনলেও ক্রয়ের পরিমাণ অর্ধেক কমাচ্ছে স্টারলিংক। আগামী ৩১ জুলাই থেকে ১০০ জিবিপিএসে সার্কিট বিচ্ছিন্ন করার চিঠি দিয়েছে বলে সাবমেরিন ক্যাবলস কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে।
কর্মকর্তারা বলেন, বিদ্যমান সরকারি সক্ষমতা ব্যবহার করে ইন্টারনেট সেবা রপ্তানি করলে আনফিল্টারড ব্যান্ডউইডথ প্রদানের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভবনা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে কার্যক্রম
বাংলাদেশে নন-জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট অরবিট সেবা প্রদানের জন্য স্টারলিংক ২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল বিটিআরসি থেকে লাইসেন্স পায়। ওই বছরের ৮ আগস্ট বাংলাদেশে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে কোম্পানিটি।
প্রতিষ্ঠানটি কালিয়াকৈর, যশোর ও রাজশাহীতে আর্থ স্টেশন স্থাপন করেছে। পাশাপাশি কালিয়াকৈরে একটি পয়েন্ট অভ প্রেজেন্স (পিওপি) স্থাপন করেছে। এই পিওপি বর্তমানে দুটি ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) অপারেটরের কাছ থেকে মোট ৮০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ পাচ্ছে।
স্টারলিংকের ২০২৬ সালের জানুয়ারির তথ্যমতে, কোম্পানিটি বর্তমানে বাংলাদেশে ৩ হাজার ৯৩১ জন গ্রাহককে সেবা দিচ্ছে।
আবেদন প্রক্রিয়া
কার্যক্রম শুরু করার পর আনফিল্টারড আইপি ট্রানজিট সেবা প্রদানের অনুমতির জন্য স্টারলিংক গত ১৩ আগস্ট বিটিআরসিতে আবেদন জানায়। এরপর নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি এই প্রস্তাবের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চায়।
২৭ আগস্ট দেওয়া জবাবে স্টারলিংক জানায়, এই সেবা শুধু পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর গ্রাহকদের সংযোগ দেওয়ার জন্যই ব্যবহৃত হবে। বাংলাদেশি কোনো ব্যবহারকারীকে এই সেবা দেওয়া হবে না।
বিটিআরসি উল্লেখ করেছে, এ ধরনের ব্যবস্থার পূর্বনজির রয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার এক চিঠির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস ২০২০ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ভারত সঞ্চার নিগম লিমিটেডকে (বিএসএনএল) ১০ থেকে ২০ জিবিপিএস আনফিল্টারড আইপিs ট্রানজিট ব্যান্ডউইথ সরবরাহ করেছিল।
তবে সংবাদধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের অক্টোবরে বিএসএনএল বাংলাদেশের মাধ্যমে তাদের অবশিষ্ট ব্যান্ডউইথ সংযোগগুলো বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
