পলকের চাপেই বন্ধ করা হয় ইন্টারনেট: ট্রাইব্যুনালে সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানির সাবেক এমডি
২০২৪ সালের জুলাই মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়লে সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক সরাসরি চাপ প্রয়োগ করে ইন্টারনেট বন্ধ করতে বাধ্য করেন বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানির তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মির্জা কামাল আহমেদ।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীর জবানবন্দি প্রদানের সময় তিনি এ তথ্য জানান। জুলাই আন্দোলন চলাকালে ইন্টারনেট বন্ধ করে গণহারে হত্যার উসকানি দেওয়ার ঘটনায় সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মির্জা কামাল আহমেদ পাঁচ নম্বর সাক্ষী।
মির্জা কামাল আহমেদ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানির এমডি হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্বে ছিলেন। বর্তমানে তিনি বিটিসিএলের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কর্মরত।
জবানবন্দিতে মির্জা কামাল আহমেদ জানান, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রাত আটটার দিকে আব্দুল ওয়াহাব (সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানির কর্মকর্তা) তাকে মোবাইলে কল করে জানান যে বিটিআরসি সাবমেরিন কেবল লেভেলে কক্সবাজার এবং কুয়াকাটায় সাবমেরিন ব্যান্ডউইডথ শাটডাউনের (বন্ধ) জন্য নির্দেশনা দিয়েছে। এর আগে তার জানামতে সাবমেরিন লেভেলে কখনো ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়নি বিধায় নির্দেশনাটি শুনে তিনি হকচকিত হন। একই দিন রাত ৮টা ৪৫ মিনিটের দিকে বিটিআরসির তৎকালীন মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী মুস্তাফিজুর রহমান তাকে মোবাইলে ফোন করেন এবং সাবমেরিন লেভেল ইন্টারনেট বন্ধ করার নির্দেশনা প্রদান করেন।
তিনি বলেন, '২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রাত ৯টার দিকে তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী আমাকে ফোন করেন এবং বিটিআরসির নির্দেশনা কেন প্রতিপালন করছি না, তা জানতে চান। তিনি সাবমেরিন লেভেলে ইন্টারনেট বন্ধ করতে কত সময় লাগতে পারে তা জিজ্ঞেস করেন। আমি তখন বলি আনুমানিক ১৫ মিনিট লাগবে।'
মির্জা কামাল আহমেদ যোগ করেন, 'তিনি (পলক) আমাকে ইন্টারনেট বন্ধ করে কনফার্ম করতে বলেন। তারপর আমি আমার অধীন জেনারেল ম্যানেজার অপারেশনসের মাধ্যমে কক্সবাজার এবং কুয়াকাটায় সাবমেরিন কেবল দুটি শাটডাউন করতে সরকারের সিদ্ধান্ত জানাই এবং ১৫ মিনিটের মধ্যেই সাবমেরিন দুটি শাটডাউন করা হয়।'
সাক্ষী আরও উল্লেখ করেন, গত ২৩ জুলাই বিটিআরসিতে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় বিভিন্ন অপারেটর, বিটিসিএল, সাবমেরিন ক্যাবল, বিটিআরসি এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগসহ আইসিটি বিভাগের স্টেকহোল্ডাররা অংশ নেন। সভা শেষে তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী এক সংবাদ সম্মেলনে রাতের মধ্যেই ইন্টারনেট চালু করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে আশ্বস্ত করেন। এরপর ওই রাতেই বিটিআরসি পুনরায় ইন্টারনেট চালুর নির্দেশনা দিলে রাত পৌনে ৯টায় সাবমেরিনের ব্যান্ডউইথ সচল করা হয়।
জবানবন্দিতে এই কর্মকর্তা আরও জানান, ৫ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে বিটিআরসির তৎকালীন ডিজি মোস্তাফিজুর রহমান পুনরায় সাবমেরিন ব্যান্ডউইথ বন্ধের নির্দেশ দেন। বেলা ১১টায় তা বন্ধ করা হয় এবং পরবর্তীতে দুপুর সোয়া ১টার দিকে পুনরায় চালুর নির্দেশনা এলে সঙ্গে সঙ্গে তা কার্যকর করা হয়।
বর্তমানে এই মামলায় অভিযুক্ত দুই আসামির মধ্যে জুনাইদ আহমেদ পলক গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। পলাতক সজীব ওয়াজেদ জয়ের পক্ষে আইনি লড়াই করছেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মনজুর আলম।
তাদের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা প্রধান তিনটি অভিযোগ হলো— জয়ের নির্দেশে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই রাতে ফেসবুকে উসকানি দেন পলক, যার জেরে ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ ও আওয়ামী লীগের সশস্ত্র বাহিনী হামলা চালায়। এছাড়া ইন্টারনেট বন্ধ করে মারণাস্ত্র ব্যবহারে উসকানি ও প্ররোচনা দিয়ে হত্যায় সহায়তা করার অভিযোগও আনা হয়েছে।
প্রসিকিউশনের দাবি, এসব হামলায় রাসেল ও মোসলেহ উদ্দিনসহ ২৮ জন এবং উত্তরার ঘটনায় আরও ৩৪ জন শহিদ হন।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি জয় ও পলকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১। এর আগে গত বছরের ৪ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের জমা দেওয়া ফরমাল চার্জ আমলে নিয়েছিলেন আদালত।
