আইল্যান্ড চেকপোস্ট, কূটনৈতিক চুক্তি এবং ‘ফি’: যেভাবে হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করছে ইরান
ট্যাঙ্কারের নাবিকরা সাহস সঞ্চয় করে ইরানের নির্দেশিত পথ ধরে সাবধানে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। উপকূলরেখা ঘেঁষে এবং হরমুজ প্রণালির আইল্যান্ড চেকপোস্টগুলোর মাঝখান দিয়ে বিশাল এই জাহাজটিকে অত্যন্ত নিপুণভাবে চালনা করতে হচ্ছিল।
৩৩০ মিটার লম্বা 'অ্যাগিওস ফানুরিয়াস ১' জাহাজটি ইরাকি অপরিশোধিত তেল নিয়ে ভিয়েতনামের দিকে যাচ্ছিল। গত এপ্রিলের শেষ দিক থেকে দুবাই উপকূলে এটি অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। তবে ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে ইরানের সঙ্গে সরাসরি চুক্তির পর গত ১০ মে এটি প্রণালির দিকে যাত্রা শুরু করে।
এই ট্যাঙ্কারটিকে দেওয়া ইরানের নির্দেশগুলো ছিল একটি জটিল ও বহু-স্তরীয় মেকানিজমের অংশ, যা দেশটি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য মোতায়েন করেছে। বর্তমানে হরমুজ প্রণালি ইরানের কার্যত নিয়ন্ত্রণে থাকায় এই ব্যবস্থায় সরকার-টু-সরকার চুক্তি, ইরান সরকারের নিবিড় যাচাই-বাছাই এবং কখনও কখনও নিরাপদ যাতায়াতের বিনিময়ে 'ফি' প্রদানের বিষয়গুলো জড়িয়ে আছে বলে অনুসন্ধানে পেয়েছে রয়টার্স।
ভিয়েতনাম, ইরাক, গ্রিস এবং অন্যান্য দেশে জাহাজটির গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল। রয়টার্সের সাথে কথা বলা দুজন ব্যক্তিও এই পর্যবেক্ষণে যুক্ত ছিলেন। মাঝে মাঝেই জাহাজটির ট্রান্সপন্ডার বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু 'অ্যাগিওস ফানুরিয়াস ১' তার যাত্রা অব্যাহত রাখে। একটি ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থার মতে, একই দিনে খুব দূরে অন্য একটি জাহাজ প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সেখানে ছোটখাটো অগ্নিকাণ্ড ঘটে।
১০ মে গভীর রাতে স্ক্রিনে 'অ্যাগিওস ফানুরিয়াস ১'-এর আইকন জ্বলে ওঠে। কিন্তু একটি ইরানি কর্মকর্তার মতে, ট্যাঙ্কারটি যখন হরমুজ দ্বীপ অতিক্রম করছিল, তখন ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) স্পিডবোটগুলো সেটিকে থামিয়ে দেয়।
প্যাট্রোলিংয়ে থাকা আইআরজিসি যোদ্ধারা, যারা প্রাথমিকভাবে জাহাজটিকে যেতে দিয়েছিল, তারা এখন জাহাজটিকে থামার নির্দেশ দেয়। ওই ইরানি কর্মকর্তা বলেন, জাহাজটিতে চোরাই কার্গো থাকার সন্দেহ ছিল এবং তারা সেটি পরিদর্শন করতে চেয়েছিলেন।
কয়েক ঘণ্টা পর জাহাজটি যাত্রা করার জন্য ইরানি কর্তৃপক্ষের অনুমতি পায়। এর ফলে হরমুজ প্রণালিতে সাধারণত পাঁচ ঘণ্টার যে পথ, তা পাড়ি দিতে দুই দিনের অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। যাত্রা পর্যবেক্ষণকারী এক ব্যক্তি বলেন, "যখন আমাদের জানানো হলো যে অ্যাগিওস হরমুজ পার হয়েছে, তখন আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।"
জাহাজটির ব্যবস্থাপক 'ইস্টার্ন মেডিটেরেনিয়ান শিপিং' এবং এই যাতায়াত সম্পর্কে অবগত আরও ছয়জন জানিয়েছেন যে এর জন্য কোনো অর্থ প্রদান করা হয়নি। ইস্টার্ন মেডিটেরেনিয়ান শিপিং-এর অপারেশন ম্যানেজার কনস্টান্টিনোস সাকোলারিডিস রয়টার্সকে দেওয়া এক জবাবে লিখেছেন, "আমাদের বিশ্বাস করার কারণ আছে যে, ইরাক ও ভিয়েতনামের চাপের কারণে ইরান 'অ্যাগিওস ফানুরিয়াস ১'-এর যাতায়াতের বিষয়ে ছাড় দিয়েছে।"
ইরান সরকার এই নতুন মেকানিজম বা 'অ্যাগিওস ফানুরিয়াস ১'-এর যাত্রা নিয়ে মন্তব্যের অনুরোধে কোনো সাড়া দেয়নি।
বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের পথ এই হরমুজ প্রণালি। এর ওপর ইরানের শক্ত নিয়ন্ত্রণ বিশ্ব অর্থনীতিকে টালমাটাল করে দিয়েছে। ইরান কীভাবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এই কৌশলগত চোকপয়েন্টের ওপর নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করছে তা উদঘাটন করতে রয়টার্স এশীয় ও ইউরোপীয় শিপিং সূত্র এবং ইরানি ও ইরাকি কর্মকর্তাদের সহ ২০ জনের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। এছাড়া যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া সম্পর্কিত ইরানি নথি পর্যালোচনা এবং জাহাজের গতিবিধি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এই তথ্যগুলো ইরানের এই নতুন স্কিম কীভাবে কাজ করে এবং তাতে শক্তিশালী আইআরজিসি-র কেন্দ্রীয় ভূমিকা কী তা নিয়ে এক বিরল ধারণা দেয়।
বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে সব সূত্রই নাম প্রকাশ না করার শর্ত দিয়েছেন। 'অ্যাগিওস ফানুরিয়াস ১'-এর যাত্রার কিছু বিবরণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবে সেগুলো কার্গো জাহাজ এবং ট্যাঙ্কার পরিচালনার সাথে যুক্ত অন্যান্য সামুদ্রিক কর্মকর্তাদের বর্ণনার সাথে হুবহু মিলে যায়।
প্রণালি অতিক্রমের কঠিন পথ
'অ্যাগিওস ফানুরিয়াস ১' ইরাকি তেল নিয়ে এপ্রিল ও মে মাসে পারস্য উপসাগর থেকে বের হওয়ার সময় অত্যন্ত জটিল একটি পথ অনুসরণ করে। জাহাজটি গন্তব্য ভিয়েতনামের দিকে যাওয়ার আগে ১১ থেকে ১৬ মে পর্যন্ত ওমান উপসাগরে মার্কিন বাহিনীর হাতে আটকে ছিল।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর মতে, মে মাসের শুরুতে প্রায় ১৫০০ জাহাজ এবং ২২,৫০০ নাবিক পারস্য উপসাগরে আটকা পড়েছিলেন। উপকূলে ইরানের হামলার সক্ষমতার কারণেই এই সামুদ্রিক স্থবিরতার সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধানের মতে, ইরানের এই নিয়ন্ত্রণ বর্তমান সংঘাতকে বিশ্বের এযাবৎকালের ভয়াবহতম জ্বালানি সংকটে রূপান্তর করেছে। এর জবাবে মার্কিন নৌবাহিনী প্রণালির বাইরে একটি কর্ডন বা ঘেরাও তৈরি করে ইরানি জাহাজ ও কার্গোর ওপর নিজস্ব অবরোধ আরোপ করেছে।
বর্তমানে এই নৌপথ দিয়ে খুব সামান্য সংখ্যক জাহাজ চলাচল করছে। মার্কিন প্রতিষ্ঠান 'সিনম্যাক্স ইন্টেলিজেন্স'-এর অপ্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৮ এপ্রিল থেকে ৬ মে'র মধ্যে ৬০টিরও কম জাহাজ পারস্য উপসাগর থেকে বের হতে পেরেছে। যুদ্ধের আগে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৪০টি জাহাজ এই প্রণালি অতিক্রম করত, যার অর্ধেকই ছিল তেলের ট্যাঙ্কার।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আইনের অধীনে মার্কিন নাগরিকদের ইরানি সরকারের সাথে কোনো লেনদেনে জড়িত হওয়া নিষিদ্ধ। অ-মার্কিন নাগরিক বা প্রতিষ্ঠানগুলোও ইরানি সত্তার সাথে লেনদেনের জন্য 'সেকেন্ডারি স্যাংশন'-এর সম্মুখীন হতে পারে। এছাড়া অনেক পশ্চিমা সরকারের নিজস্ব নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। ১ মে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ এক বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছে, "নিরাপদ যাতায়াতের জন্য ইরানি সরকারকে অর্থ প্রদান বা তাদের কাছ থেকে গ্যারান্টি চাওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি রয়েছে।"
রয়টার্স জানতে পেরেছে, ইরানের নতুন ব্যবস্থায় একটি স্তরভিত্তিক পদ্ধতি রয়েছে। এতে অগ্রাধিকার পায় মিত্র দেশ রাশিয়া ও চীনের জাহাজগুলো। এরপর রয়েছে ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশ যারা তেহরানের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে। সবশেষে রয়েছে সরকার-টু-সরকার চুক্তি, যার মাধ্যমে 'অ্যাগিওস ফানুরিয়াস ১'-এর মতো জাহাজগুলোকে যেতে দেওয়া হয়।
এই সিস্টেম সম্পর্কে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ বলেছে, "বিভাগটি অবৈধ ইরানি বাণিজ্যকে সমর্থনকারী যে কোনো বিদেশি কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত।" রয়টার্স স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হতে পারেনি যে কতগুলো জাহাজ এখন পর্যন্ত এই স্কিম ব্যবহার করেছে। ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সাথে সংশ্লিষ্ট কোনো জাহাজ এই প্রণালি অতিক্রম করতে পারবে না।
ইউরোপীয় দুটি শিপিং সূত্র জানিয়েছে, যে জাহাজগুলো সরকার-টু-সরকার চুক্তির আওতাভুক্ত নয়, তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ যাতায়াতের জন্য ইরানি কর্তৃপক্ষকে দেড় লাখ ডলার বেশি অর্থ প্রদান করছে। দুজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, জাহাজগুলোর কাছ থেকে মাঝে মাঝে 'নিরাপত্তা এবং নেভিগেশন ফি' নেওয়া হচ্ছে, যা কার্গোর ধরণ অনুযায়ী ভিন্ন হয়। কোনো কর্মকর্তাই সুনির্দিষ্ট অংক জানাননি, তবে একজন বলেছেন, "সব দেশ এই চার্জের আওতায় পড়ে না।" রয়টার্স এই অর্থের পরিমাণ বা ইরানি কোষাগারে ঠিক কত টাকা ঢুকেছে তা নিশ্চিত করতে পারেনি।
'নতুন বাস্তবতা'
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী, কোনো দেশ আন্তর্জাতিক প্রণালি দিয়ে নিরাপদ যাতায়াতের জন্য ফি নিতে পারে না। তবে নিরাপত্তা বা সেবার জন্য চার্জ নেওয়া যেতে পারে যদি সব দেশের জাহাজের ক্ষেত্রে তা সমানভাবে প্রযোজ্য হয়।
এই অর্থপ্রদান এবং যে জাহাজের মালিকরা তাদের জাহাজ ছাড়ানোর জন্য ইরানি কর্তৃপক্ষকে টাকা দিয়েছেন তাদের নামগুলো অত্যন্ত গোপনীয় রাখা হয়েছে। কারণ এই ধরনের অর্থপ্রদান ইরান সরকারের ওপর মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার লঙ্ঘন। এই টাকা কীভাবে স্থানান্তর করা হয়েছে বা ইরানের কোন সংস্থাকে দেওয়া হয়েছে তা রয়টার্স নিশ্চিত করতে পারেনি। এছাড়া চার্জ ছাড়াও, যারা আইআরজিসি-কে সুবিধা দিতে অর্থ প্রদান করবে তারা তাদের সামুদ্রিক বীমা হারাবে। কারণ আইআরজিসি একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সন্ত্রাসী সংগঠন।
ইসরায়েলের 'ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ'-এর গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিজ বলেন, ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও জাহাজ মালিকদের ইরানের সাথে সরাসরি লেনদেনের আগ্রহই প্রমাণ করে যে প্রণালিটি এখন কতটা ইসলামিক রিপাবলিকের নিয়ন্ত্রণে। তিনি বলেন, "প্রণালি বন্ধ হবে নাকি খুলবে তা কেবল ইরানি শাসনের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করছে। কেউ রাজনৈতিক জোটের কারণে পার পাবে, কাউকে টাকা দিতে হবে, আর অন্যদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এটিই এখন নতুন বাস্তবতা।"
ইরানের এই নতুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে রয়টার্সের অনুসন্ধানের প্রতিক্রিয়ায় চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এবং প্রণালির 'ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা' নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, "এই ধরনের ব্যবস্থাপনা আন্তর্জাতিক আইন ও প্রথা অনুযায়ী হওয়া উচিত এবং উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং আঞ্চলিক দেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বৈধ চাহিদাকে বিবেচনায় নেওয়া উচিত।"
সংশ্লিষ্টতা যাচাই
সরকারি চুক্তির বাইরে, যাতায়াতের অনুমতি পাওয়ার প্রক্রিয়াটি আইআরজিসি দ্বারা পরিচালিত একটি বিস্তারিত যাচাই-বাছাই পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে। তিনটি ইরানি সূত্র এবং একটি ইউরোপীয় শিপিং সূত্র জানিয়েছে, আইআরজিসি জাহাজ মালিক বা অপারেটরের দেওয়া 'অ্যাফিলিয়েশন ডকুমেন্ট' পর্যালোচনা করে যা একজন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে জমা দেওয়া হয়।
ইউরোপীয় শিপিং সূত্রটি বলেন, "এই অ্যাফিলিয়েশন চেকের উদ্দেশ্য হলো জাহাজটির সাথে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের কোনো সংযোগ আছে কি না তা শনাক্ত করা।" নথি পর্যালোচনার জন্য গার্ডদের প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগে এবং এই প্রক্রিয়া চলাকালে তারা সশরীরে জাহাজটি পরিদর্শন করতে চাইতে পারে।
রয়টার্সের পর্যালোচনা করা নথি অনুযায়ী—যা ইরানের 'পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি' শিপিং ইন্ডাস্ট্রির কাছে পাঠিয়েছে—আইআরজিসি জাহাজ মালিকদের কাছ থেকে কার্গোর মূল্য, পতাকাবাহী দেশ, যাত্রা শুরুর স্থান ও গন্তব্য, নিবন্ধিত মালিক ও ব্যবস্থাপক এবং ক্রুদের জাতীয়তার মতো বিস্তারিত তথ্য দাবি করে। এই কর্তৃপক্ষটি মূলত জাহাজ চলাচলের অনুমোদন এবং কর আদায়ের জন্য সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে গঠন করা হয়েছে।
তিনজন ইরানি কর্মকর্তার মতে, এই যাচাই-বাছাইয়ের কাজ করে ইরানের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যেমন পোর্টস অ্যান্ড মেরিটাইম অর্গানাইজেশন, শিল্প ও খনি মন্ত্রণালয় এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নিরাপত্তা তদারকি শাখা। কর্মকর্তারা জানান, ইরানের সামগ্রিক নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আইআরজিসি-ও জাহাজ মূল্যায়নের সাথে সরাসরি যুক্ত।
দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ক্ষেত্রে একটি অতিরিক্ত ধাপ রয়েছে: সংশ্লিষ্ট দেশগুলো অনুমতি চেয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে যোগাযোগ করে। এরপর মন্ত্রী সেই অনুরোধ সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলে পাঠান, যেখানে আইআরজিসি এবং সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির প্রতিনিধিরা রয়েছেন। একজন কর্মকর্তা বলেন, "এরপর একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং আইআরজিসি সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে জানিয়ে দেওয়া হয়।" তিনি আরও জানান, আইআরজিসি নিরাপদ যাতায়াতের জন্য প্রয়োজনীয় স্থানাঙ্ক এবং নির্দেশনা প্রদান করে।
'অ্যাগিওস ফানুরিয়াস ১'-এর ক্ষেত্রে ইরাক সরকার তাদের রাষ্ট্রীয় তেল বিপণন সংস্থা 'সোমো'-এর সাথে মিলে তৎকালীন ইরাকি প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানী-র তত্ত্বাবধানে ইরানের সাথে চুক্তিটি সম্পন্ন করে। এই ব্যবস্থার সাথে যুক্ত দুটি সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। ইরাকের তেল মন্ত্রণালয়ের তিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যাতায়াতের আগেই তারা জাহাজটির মেনিফেস্ট এবং ক্রুদের তথ্য ইরানকে দিয়েছিলেন। ইরাক সরকার তাদের এই ব্যবস্থা বা জাহাজটি নিয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
অন্যান্য দেশ ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভারত, যারা তাদের তেলের ৯০ শতাংশ এবং গ্যাসের ৫০ শতাংশ আমদানি করে, যার বড় অংশ হরমুজ দিয়ে আসে। ভারতীয় শিপিং মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার মতে, নয়াদিল্লি তেহরানে তাদের দূতাবাসের মাধ্যমে ইরানি কর্তৃপক্ষ এবং আইআরজিসি-র সাথে যোগাযোগ রাখে। ভারত যে জাহাজগুলো বের করতে চায়, সেগুলো যাচাই করে ইরানি নৌবাহিনী।
কর্মকর্তাটি বলেন, "সবকিছু যাচাই হওয়ার পর জাহাজের ক্যাপ্টেনকে একটি রুট বা পথ দেওয়া হয় এবং ইরানি নৌবাহিনীর নির্দেশনায় জাহাজটি এলাকা ত্যাগ করে। ক্যাপ্টেনদের কঠোরভাবে সেই পথ অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়।" তিনি আরও জানান, জাহাজগুলোকে তাদের লোকেশন ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখতে এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবহার না করতে বলা হয়।
ভারতের শিপিং ইন্ডাস্ট্রির একটি সূত্র জানায়, ইরান অনুমতি দেওয়ার পর ভারতীয় নৌবাহিনী সরাসরি ক্যাপ্টেনের সাথে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় পয়েন্টগুলো জানিয়ে দেয়। সূত্রটি বলেন, "ভারতীয় নৌবাহিনী আমাদের বলেছে যে যদি ইরানিরা আপনাদের থামতে বলে, তবে থামবেন। যদি চলতে বলে, তবে চলবেন। আমরা সেই নির্দেশই মেনে চলছি।" ভারতের শিপিং মন্ত্রণালয় ১৪ মে জানিয়েছে যে, এ পর্যন্ত ভারতের পতাকাবাহী ১৩টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে এবং ১৩টি জাহাজ এখনও প্রণালির পশ্চিমে আটকা পড়ে আছে। ভারত, রাশিয়া, পাকিস্তান ও ভিয়েতনাম এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
বিপজ্জনক যাত্রা
শিপিং ইন্ডাস্ট্রির দুটি সূত্র এবং তিনজন ইরানি নাগরিকের মতে, অনেক জাহাজের জন্য পারস্য উপসাগর থেকে বের হওয়া মানে ইরানের একাধিক পয়েন্ট পার হওয়া, যেখানে সশস্ত্র সদস্যরা মোতায়েন থাকে।
'অ্যাগিওস ফানুরিয়াস ১' আবু মুসা, গ্রেটার টুনব এবং লারাক-এর ইরানি সামরিক চেকপোস্টগুলো পার হয়ে এগিয়ে যায়। রয়টার্স জাহাজটির পাবলিক লোকেশন ডেটা এবং অনুরূপ যাত্রার বিষয়ে অবগত একাধিক সূত্রের মাধ্যমে এই স্থানাঙ্কগুলো যাচাই করেছে।
ঘটনার দিন উপস্থিত এক ইরানি কর্মকর্তার মতে, জাহাজটি যখন প্রণালির মুখে হরমুজ দ্বীপের কাছে পৌঁছায়, তখন আইআরজিসি স্পিডবোটগুলো সেটিকে সাময়িকভাবে থামায়। তিনি জানান, জাহাজটিতে চোরাই পণ্য থাকার তথ্য ছিল তাদের কাছে। পরে সেই তথ্য ভুল প্রমাণিত হয় এবং সামান্য বিভ্রান্তি ও তল্লাশির পর 'অ্যাগিওস ফানুরিয়াস ১' তার যাত্রা অব্যাহত রাখে।
একই ধরনের বিশৃঙ্খল যোগাযোগের কারণেই গত মাসে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টাকালে ভারতীয় পতাকাবাহী দুটি জাহাজের ওপর হামলা চালানো হয়েছিল বলে ভারতীয় শিপিং সূত্রটি জানিয়েছে। এই ঘটনাগুলো পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা ভারতীয় নাবিকদের আতঙ্কিত করে তুলেছে। ভারতীয় সূত্রটি বলেন, "এই জাহাজগুলোতে কোনো আর্মার বা সুরক্ষা কবচ নেই। বুলেট এগুলো ভেদ করে ভেতরে চলে আসে।" তিনি আরও জানান, বন্দুকধারীদের একমাত্র লক্ষ্য থাকে ক্রু কোয়ার্টারগুলো। তারা তেলের ট্যাঙ্কে গুলি চালায় না কারণ সেখানে দাহ্য পদার্থ থাকে।
একটি বাল্ক ক্যারিয়ারে করে হরমুজ প্রণালি পার হওয়া এক ভারতীয় নাবিক বলেন, তার শিপিং কোম্পানি আইআরজিসি-র অনুমতি পাওয়ার আগে তাদের জাহাজটি উপসাগরে অপেক্ষা করছিল। এরপর তাদের লারাক দ্বীপের কাছে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং ইরানি নৌবাহিনী যোগাযোগ স্থাপন করে। নৌ-কর্মকর্তারা ক্যাপ্টেনকে জাহাজের পতাকা প্রদর্শন এবং বিস্তারিত তথ্য দিতে বলেন। এরপর শিপিং কোম্পানির সাথে আলোচনা শুরু হয়। ইরানিরা বারবার ক্রুদের জাতীয়তা সম্পর্কে জানতে চাইছিল বলে ওই নাবিক জানান।
তিনি বলেন, "কয়েক ঘণ্টা পর ক্যাপ্টেন আইআরজিসি-র কাছ থেকে একটি রুট পান।" ইরানি নৌবাহিনীর ছোট ছোট বোটের পাহারায় জাহাজটিকে সমুদ্রের মাইনের ভয়ে খুব সাবধানে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। নাবিকটি বলেন, "এটি ছিল এক ভয়াবহ দৃশ্য। আমার দুঃস্বপ্নেও আমি কল্পনা করতে পারি না যে যুদ্ধের সময় আবারও সমুদ্রে আসব।"
তবে হরমুজ প্রণালি পার হলেই যে বিপদ কাটে, তা নয়। ইরানি জলসীমা ত্যাগের একদিন পরেই 'অ্যাগিওস ফানুরিয়াস ১' মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধের মুখে পড়ে। মার্কিন সামরিক বাহিনী যখন তাদের কাগজপত্র পরীক্ষা করছিল, তখন ছয় দিন ধরে ট্যাঙ্কারটি একটি নির্দিষ্ট ছোট এলাকায় ঘুরপাক খাচ্ছিল।
ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বলেন, "চলমান অবরোধ কার্যকরের অংশ হিসেবে মার্কিন বাহিনী মাল্টার পতাকাবাহী ওই জাহাজটিকে ঘুরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল।" 'ইস্টার্ন মেডিটেরেনিয়ান শিপিং'-এর অপারেশন ম্যানেজার সাকোলারিডিস বলেন, ভিয়েতনাম ওই জাহাজটিকে যেতে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। তিনি দাবি করেন, জাহাজটিকে আটকানোর কোনো কারণ ছিল না কারণ এটি বা এর কার্গোর সাথে ইরানের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না।
১৩ এপ্রিল অবরোধ শুরু হওয়ার পর থেকে কতগুলো জাহাজ মার্কিনীদের হাতে আটক হয়েছে তা রয়টার্স নিশ্চিত করতে পারেনি। ১৬ মে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই 'অ্যাগিওস ফানুরিয়াস ১'-কে ছেড়ে দেওয়া হয়। ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিয়ে এটি এখন ভিয়েতনামের পথে।
