হজ নিয়ে সতর্কবার্তার পর ইরানে হামলা স্থগিত করেন ট্রাম্প
হজের সময় যুদ্ধ পুনরায় শুরু না করার বিষয়ে উপসাগরীয় মিত্রদেশ ও নিজ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সতর্কবার্তার পর এই সপ্তাহে ইরানে পরিকল্পিত হামলা স্থগিত করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার (২০ মে) মিডল ইস্ট আইয়ের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
দুই জ্যেষ্ঠ উপসাগরীয় কর্মকর্তার বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পকে জানানো হয়েছিল যে হজের সময় ইরানে হামলা চালালে উপসাগরীয় দেশগুলোতে সংকট তৈরি হবে। কারণ এতে লাখো হাজি যাত্রাপথে আটকে পড়বেন।
সূত্রগুলো আরও জানায়, ইসলাম ধর্মের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহার আগে পবিত্র এই সময়ে হামলা চালানো হলে মুসলিম বিশ্বে ওয়াশিংটনের ভাবমূর্তি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেও ট্রাম্পকে সতর্ক করা হয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ আলোচনা সম্পর্কে অবগত এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, এ ধরনের আলোচনা হয়েছিল।
তিনি বলেন, ট্রাম্পকে তার নিজের কর্মকর্তারাও সতর্ক করেছিলেন যে, এখন আবার যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করলে তার 'ভাবমূর্তির বড় ধরনের ক্ষতি' হবে।
এর আগে, যুক্তরাষ্ট্র রমজান মাসে ইরানে হামলা চালিয়েছিল। তবে হজের সময় হামলা চালালে সৌদি আরবের জন্য বড় ধরনের লজিস্টিক সংকট তৈরি হতো। কারণ প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ বিদেশি হাজি সেখানে সমবেত হন।
এই সংকট কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উপসাগরীয় বিমান যোগাযোগ কেন্দ্র এবং দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতেও প্রভাব ফেলতে পারত, যেখান থেকে বিপুলসংখ্যক হাজি হজে অংশ নিতে যান।
চলতি বছরের হজ শুরু হওয়ার কথা ২৪ মে এবং ছয় দিনব্যাপী এটি চলবে। ইতোমধ্যে বিপুলসংখ্যক হাজি সৌদি আরবে পৌঁছেছেন।
মিডল ইস্ট আয়ের সঙ্গে কথা বলা কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, হজ শেষ হওয়ার পর আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ আবার শুরু হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অতীতে ইরানকে বিভ্রান্ত করতে যুক্তরাষ্ট্র ভুয়া সংকেত ও বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে হামলার আগে জেনেভায় ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। এরপরই হামলা চালানো হয়।
এর আগে সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প নিজেই জানান, উপসাগরীয় নেতাদের অনুরোধে তিনি মঙ্গলবার রাতে পরিকল্পিত হামলা স্থগিত করেছেন।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, 'কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি, সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান আমাকে ইরানে পরিকল্পিত সামরিক হামলা স্থগিত রাখতে অনুরোধ করেছেন।'
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর যুদ্ধ শুরু হলে ইরান তাৎক্ষণিকভাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা চালায়।
তেহরান আবারও হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি আবারও তাদের জ্বালানি ও বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালায়, তবে উপসাগরীয় অবকাঠামোতে পাল্টা হামলা চালানো হবে এবং সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়বে।
সৌদি আরব, কাতার ও ওমান এই সংঘাতের বিস্তার ঠেকাতে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধের কারণে ইতোমধ্যে এসব দেশের তেল ও এলএনজি রপ্তানিতে প্রভাব পড়েছে।
মার্কিন নেতৃত্বাধীন প্রথম দফার হামলাকে ব্যাপকভাবে ব্যর্থ বলে মনে করা হয়। কারণ এতে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হলেও, ইরানের সরকারকে উৎখাত করা যায়নি।
তার ছেলে ও উত্তরসূরি মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে ইরান কয়েক সপ্তাহের বোমাবর্ষণের মধ্যেও টিকে রয়েছে এবং তাদের বড় ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারও বজায় রেখেছে।
ইরানকে নিজেদের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করা ইসরায়েল সরকার ট্রাম্পের ওপর প্রভাব খাটিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চেয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে মার্কিন সেনা ও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য ঝুঁকির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, পেন্টাগনের কর্মকর্তারা গোলাবারুদের ঘাটতি এবং ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা কৌশলের বাড়তি সক্ষমতাকে ভবিষ্যৎ হামলার অগ্রগতির বড় বাধা হিসেবে দেখছেন।
