কাতারে যৌথ মহড়ায় ইউরোফাইটারের বিরুদ্ধে বড় ব্যবধানে জেতে চীনের জে-১০সি
২০২৪ সালে কাতারে আয়োজিত যিলজাল-২ যৌথ বিমান মহড়ায় পাকিস্তান বিমান বাহিনীর চীনের তৈরি জে-১০সি যুদ্ধবিমানগুলো কাতার আমিরি বিমান বাহিনীর ইউরোফাইটার যুদ্ধবিমানগুলোর বিরুদ্ধে ৯-০ ব্যবধানে 'কিল রেশিও' অর্জন করে বলে পাকিস্তান ও আরব উপসাগরীয় বিভিন্ন সূত্রের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই ফলাফলটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি চীনের উন্নত '৪+ জেনারেশন' যুদ্ধবিমানের সক্ষমতার একটি বিরল বহিঃপ্রকাশ। উল্লেখ্য, জে-১০সি যুদ্ধবিমানটি ২০২৫ সালের মে মাসে ভারতীয় বিমান বাহিনীর বিরুদ্ধেও দুর্দান্ত সাফল্য দেখিয়েছে।
ইউরোফাইটার প্রকল্পের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান সমালোচনা এবং এই যুদ্ধবিমান ব্যবহারকারী দেশগুলোর (এমনকি যারা এটি উদ্ভাবন করেছে) এর ওপর নির্ভরতা দ্রুত কমিয়ে আনার চেষ্টার প্রেক্ষাপটে, কাতারের এই ফলাফল বেশ আলোচিত হচ্ছে।
ইউরোফাইটার কর্মসূচির দুর্বলতা
ইউরোফাইটারের অন্যতম প্রধান নির্মাতা দেশ যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন করে এই বিমান কেনার পরিকল্পনা স্থায়ীভাবে বাতিল করেছে। তারা তাদের বিদ্যমান ইউরোফাইটারগুলো পর্যায়ক্রমে অবসরে পাঠিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত এফ-৩৫এ যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া, ব্রিটিশ বিমানবহরের সামান্য কিছু ইউরোফাইটারে আধুনিক রাডার স্থাপনের জন্য যেটুকু অর্থায়ন করা হয়েছে, তাও ইউরোফাইটার কর্মসূচির প্রতি তাদের অগ্রাধিকার কমে যাওয়ারই ইঙ্গিত দেয়। যদিও জার্মানি ও যুক্তরাজ্য তাদের স্থানীয় শিল্পের চাপে এই কর্মসূচি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিল, তবুও জার্মানি ২০২২ সালে প্রথমবারের মতো এফ-৩৫ কেনার আদেশ দিয়ে এই ইউরোপীয় কর্মসূচি থেকে সরে আসার পথ প্রশস্ত করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে শুরু করে বেলজিয়াম পর্যন্ত—যেখানেই এফ-৩৫ বা এফ-১৫ এর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে, সেখানেই ইউরোফাইটার হেরেছে। মধ্যপ্রাচ্যে এই বিমানগুলোর যেটুকু বিক্রি হয়েছে, তার পেছনে মূলত রাজনৈতিক কারণই প্রধান ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে করা হয়।
২০২২ সালে ইউরোফাইটার পাওয়ার মাত্র তিন বছরের মাথায় ২০২৫ সালের শেষের দিকে কাতার তাদের ২৪টি ইউরোফাইটার বিমান অবসরে পাঠানোর চিন্তা করছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য, কারণ কাতার তাদের বহরে যে 'ট্রাঞ্চ ৩এ' ভেরিয়েন্টগুলো যুক্ত করেছিল, সেগুলো ইউরোফাইটারের ইউরোপীয় অংশীদারদের চেয়েও উন্নত এবং তাতে নতুন 'ক্যাপ্টর-ই' অ্যাক্টিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে রাডার যুক্ত করা ছিল।
কাতার এই বিমানগুলো তুরস্কের কাছে বিক্রি করার বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ, আঙ্কারা এফ-৩৫ কর্মসূচি থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর তাদের বিমানবহর আধুনিকায়ন করতে হিমশিম খাচ্ছে। ২০১৭ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন অবরোধের সময় ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করার প্রয়োজনেই মূলত কাতার এই বিমানগুলো কিনেছিল বলে ধারণা করা হয়।
যদিও সিমুলেটেড বা মহড়ায় আকাশযুদ্ধের ফলাফল পাইলটদের প্রশিক্ষণ এবং সহায়তাকারী বিমানের ওপর নির্ভর করে, তবুও মোটামুটি সমান শর্তে জে-১০সি-র এই অভাবনীয় সাফল্য অবাক করার মতো নয়। বরং এটি বর্তমান বৈশ্বিক ধারারই প্রতিফলন। ইউরোফাইটার হলো স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় যৌথ উদ্যোগে তৈরি করা একমাত্র যুদ্ধবিমান, অন্যদিকে জে-১০সি হলো চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মির সংগ্রহ করা বিভিন্ন '৪+ জেনারেশন' ও পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের মধ্যে সবচেয়ে হালকা এবং অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী সংস্করণ। তবুও চীন ও ইউরোপের প্রতিরক্ষা খাতের সক্ষমতার মধ্যে বিশাল ব্যবধান রয়েছে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে চীন দুটি নতুন ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের প্রোটোটাইপ উন্মোচন করেছে, যা প্রমাণ করে যে তাদের যুদ্ধবিমান শিল্প বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। যেখানে চীনের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান কর্মসূচির সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫-এর সঙ্গে তুলনীয়, সেখানে ইউরোপীয় দেশগুলো এই দৌড়ে অনেক পিছিয়ে পড়েছে। বিভিন্ন দেশের যুদ্ধবিমান কেনার দরপত্রে এফ-৩৫-এর কাছে ইউরোফাইটারের ক্রমাগত পরাজয় এবং চতুর্থ প্রজন্মের পরবর্তী কোনো যুদ্ধবিমান তৈরি করতে না পারাই প্রমাণ করে যে, ইউরোপ প্রযুক্তিগতভাবে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
