ইরান চুক্তি নিয়ে ট্রাম্প-ভ্যান্সের ইতিবাচক বার্তা, হরমুজ পার হলো চীনের তেলবাহী ট্যাংকার
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের চলমান সংঘাত নিরসনের লক্ষ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ইতিবাচক মন্তব্যের পরপরই বুধবার (২০ মে) দুটি তেলবাহী চীনা ট্যাংকার সফলভাবে হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে। জাহাজ চলাচলের তথ্য (শিপিং ডেটা) বিশ্লেষণে এই চিত্র দেখা গেছে।
মঙ্গলবার (১৯ মে) ট্রাম্প বলেছিলেন, এই যুদ্ধ 'খুব দ্রুতই' শেষ হয়ে যাবে। একই সাথে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও তেহরানের সাথে চলমান আলোচনার অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে শান্তি চুক্তির জোরালো সম্ভাবনা ব্যক্ত করেছেন।
হোয়াইট হাউসের এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, 'আমরা বর্তমানে বেশ ভালো অবস্থানে আছি।'
সংঘাত নিরসনে তেহরান নতুন একটি প্রস্তাব দেওয়ার পর ট্রাম্প মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেন, 'আজই (হামলার) সিদ্ধান্ত নেওয়ার খুব কাছাকাছি ছিলাম আমি, বড়জোর এক ঘণ্টা বাকি ছিল।'
তিনি দাবি করেন, ইরানের নেতারা একটি চুক্তির জন্য অনুনয়-বিনয় করছেন। তবে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন্, কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব না হলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন করে হামলা চালানো হবে।
প্রায় তিন মাস আগে ইসরায়েলের সাথে মিলে শুরু করা এই যুদ্ধ শেষ করতে হিমশিম খাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এই পুরো সময়জুড়ে ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, তেহরানের সাথে চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গেছে। আবার চুক্তিতে রাজি না হলে বড় ধরনের হামলার হুমকিও দিয়ে গেছেন।
নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচনের আগে তেলের উচ্চমূল্য এবং জনপ্রিয়তায় ধস নামায় ট্রাম্পের ওপর দ্রুত এই সংকটের সমাধান করার জন্য প্রচণ্ড ঘরোয়া রাজনৈতিক চাপ রয়েছে। এই সংঘাতের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
শিপিং ডেটা অনুযায়ী, ইরাকি অপরিশোধিত তেল বহনকারী সুপার ট্যাংকারগুলোর মধ্যে চীনের এই দুটি জাহাজ বুধবার সংকীর্ণ ওই প্রণালি পার হয়েছে। এতে প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল রয়েছে। হোয়াইট হাউস থেকে আসা এসব ইতিবাচক সংকেতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কিছুটা কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের (অপরিশোধিত তেল) দাম এক পর্যায়ে ব্যারেল প্রতি ১১০.১৬ ডলারে নেমে আসে।
আলোচনার জটিলতা
জেডি ভ্যান্স অবশ্য ইরানের বিভক্ত নেতৃত্বের সঙ্গে দরকষাকষির ক্ষেত্রে কিছু সমস্যার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, 'তেহরানের আলোচক দলের অবস্থান সবসময় পুরোপুরি পরিষ্কার থাকে না।' তাই যুক্তরাষ্ট্র এখন তাদের নিজস্ব অবস্থান বা শর্তগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। ট্রাম্পের এই নীতির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো ওই অঞ্চলে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতা বন্ধ করা।
অন্যদিকে, ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির প্রধান ইব্রাহিম আজিজি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, ট্রাম্প হামলা স্থগিত করেছেন কারণ তিনি বুঝতে পেরেছেন যে ইরানের ওপর আক্রমণ করলে তার 'কড়া সামরিক জবাব' দেওয়া হবে।
ইরানি গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, তেহরানের নতুন শান্তি প্রস্তাবে লেবাননসহ সব রণাঙ্গনে যুদ্ধ বন্ধ করা, ইরান সীমান্ত থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার ফলে হওয়া ধ্বংসযজ্ঞের ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়েছে।
এছাড়া নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ করা অর্থ ফেরত দেওয়া এবং মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়ার দাবিও জানানো হয়েছে। তবে এই শর্তগুলো ইরানের আগের প্রস্তাবের চেয়ে খুব একটা আলাদা নয়, যা ট্রাম্প গত সপ্তাহে 'আবর্জনা' বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
যুদ্ধবিরতির বর্তমান অবস্থা
এপ্রিলের শুরুতে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর থেকে মার্কিন-ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। তবে লেবাননে ইসরায়েলের অভিযান অব্যাহত আছে, যার ফলে লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন।
ইরানের যুদ্ধবিরতি মোটামুটিভাবে বজায় থাকলেও সম্প্রতি ইরাক থেকে সৌদি আরব ও কুয়েতের দিকে কিছু ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার পেছনে ইরান ও তার মিত্রদের হাত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছিলেন, তারা এই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা এবং দেশটির সরকার পরিবর্তনের পরিবেশ তৈরি করার জন্য।
তবে যুদ্ধের তিন মাস হতে চললেও ইরান এখনও তাদের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মাধ্যমে প্রতিবেশীদের ওপর আধিপত্য বজায় রাখার সক্ষমতা ধরে রেখেছে। এমনকি দেশটির ধর্মীয় নেতৃত্বও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে এবং সেখানে বড় ধরনের কোনো গণ-অভ্যুত্থানের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
