যুক্তরাষ্ট্র কি বিশ্বের যেকোনো জায়গায় ইরান-সংশ্লিষ্ট জাহাজ আটকাতে পারবে?
গত সপ্তাহে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানগামী এবং ইরান থেকে আসা জাহাজগুলোর ওপর তাদের অবরোধের সীমা পুরো বিশ্বজুড়ে সম্প্রসারিত করেছে।
তারা বলেছে, আন্তর্জাতিক জলসীমা বা জাহাজের পতাকা যা-ই হোক না কেন, ইরানকে সাহায্যকারী যেকোনো জাহাজের পিছু নেবে তারা।
জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন গত বৃহস্পতিবার স্পষ্ট করেই বলেছেন, 'যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পতাকাবাহী বা ইরানকে সাহায্য করার চেষ্টা করছে এমন যেকোনো জাহাজের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে।'
তিনি আরও জানান, মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে থাকা মার্কিন সেনাদলগুলোও ইরানের জাহাজ চলাচল ঠেকাতে বিভিন্ন অভিযানে অংশ নেবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি যখন শেষ হতে চলেছে এবং বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি যখন প্রায় বন্ধ, ঠিক তখনই এই অবরোধ সম্প্রসারণের ঘোষণা এলো।
সামুদ্রিক ও সামরিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদক্ষেপটি মূলত ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে বর্তমান সামরিক অভিযানের একটি মেলবন্ধন।
তবে এই পদক্ষেপ বেশ কিছু আইনি ও বাস্তবসম্মত প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
নেভাল ওয়ার কলেজের সামুদ্রিক কৌশল বিভাগের প্রধান জেমস আর. হোমস বলেন, 'যুদ্ধ কেবল লড়াইয়ের ময়দানেই নয়, বরং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত জটিল একটি বিষয়। আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, একটি অবরোধ মূলত যুদ্ধেরই একটি রূপ। তাই "অপারেশন এপিক ফিউরি" (ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানের নাম) যতটুকু আইনি বৈধতা রাখে, এই অবরোধও সম্ভবত ততটুকুই বৈধ।'
যেহেতু মার্কিন কংগ্রেস ইরানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করেনি, তাই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটির মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো যুদ্ধাবস্থা নেই।
তবে হোমস উল্লেখ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অঘোষিত যুদ্ধগুলোই বরং নিয়মে পরিণত হয়েছে।
এই লড়াইকে বৈধতা দিতে কংগ্রেসের যৌথ প্রস্তাব, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব এবং ন্যাটোর বিভিন্ন সিদ্ধান্তকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, 'এই অভিযানটি হয়তো অন্যগুলোর তুলনায় অনেক বেশি একতরফা, তবে এমন উদাহরণ আগে যে ছিল না, তা কিন্তু নয়।'
ওয়াশিংটনের থিংক ট্যাংক 'ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ'-এর সামরিক বিশ্লেষণ বিভাগের পরিচালক জেনিফার কাভানাঘ বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে এই অবরোধের বৈধতা 'বেশ অস্পষ্ট'।
তার মতে, আইনি স্বীকৃতি পেতে হলে কোনো অবরোধকে 'কার্যকর' হতে হয়। অর্থাৎ, এটি প্রয়োগযোগ্য হতে হবে এবং বাস্তবে প্রয়োগও করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, অনেকেই যুক্তি দেবেন যে একটি 'বৈশ্বিক অবরোধ' ধারণাগতভাবেই অগ্রহণযোগ্য, কারণ এর পরিধি অনেক বেশি ব্যাপক।
তবে ইতিহাসে এর আগেও এমন বিশাল অবরোধের নজির রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিভিন্ন দেশ বিশ্বজুড়ে নৌ অবরোধ কার্যকর করেছিল।
এরও আগে, ফরাসি বিপ্লব ও নেপোলিয়নের যুদ্ধের সময় ব্রিটিশরা পুরো ফ্রান্স অবরোধ করে রেখেছিল। আর আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় উপনিবেশগুলো ও তাদের মিত্ররা ব্রিটিশ জাহাজে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত হামলা চালিয়েছিল।
তবে এত বড় পরিসরে অবরোধ কার্যকর করা বেশ কঠিন একটি কাজ।
হোমস বলেন, 'সাত সমুদ্র একটি বিশাল জায়গা, আর এর তুলনায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় নৌবাহিনী বা কোস্টগার্ডও নিতান্তই ক্ষুদ্র।' আইনগত দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের এই অবরোধ শেষ পর্যন্ত 'কার্যকর' হিসেবে বিবেচিত হবে কি না, তা নির্ভর করবে তাদের কাছে জাহাজ, বিমান ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা রয়েছে কি না, তার ওপর।
তবে হোমস এও জানান যে, আইনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে অবরোধটিকে একদম 'ছিদ্রহীন' হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। আর বাইরের পর্যবেক্ষকদের জন্য এর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা যেকোনো অবস্থাতেই বেশ কঠিন হবে। তার মতে, এই অবরোধ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কখনো কখনো হয়তো ছাড় দেওয়ারও প্রয়োজন হতে পারে।
হোমস বলেন, 'এমনও হতে পারে যে আমাদের নেতৃত্ব জাতীয় স্বার্থের কথা চিন্তা করে হয়তো নীরবে কোনো জাহাজকে পার হতে দিল। উদাহরণস্বরূপ, মে মাসে চীনের নেতা শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। তাই চীনের তেল আমদানিতে বাধা দিয়ে ওয়াশিংটন হয়তো এখনই কোনো উত্তেজনা তৈরি করতে চাইবে না।'
এই সম্প্রসারিত অবরোধটি ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক লড়াইয়েরই একটি অংশ। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এটি এক ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন।
যুদ্ধের শুরুতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে সাগরে থাকা ইরানের তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছিল।
একই কারণে গত সপ্তাহে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ আরোপের আগে, ইরানি ট্যাঙ্কারগুলোকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার হওয়ারও অনুমতি দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। এখন মনে হচ্ছে, ওয়াশিংটন আবার ইরানের ওপর চাপ ধরে রাখার দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
হার্ভার্ড ল স্কুলের ভিজিটিং প্রফেসর এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের অধ্যাপক জেমস ক্রাসকা বলেন, 'এই অবরোধটি মূলত ইরান সরকারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞারই একটি যুদ্ধকালীন সম্প্রসারণ।'
তিনি জানান, শান্তিকালীন সময়ে এই নিষেধাজ্ঞাগুলো ছিল ইরানের অর্থনীতিকে দুর্বল করার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। আর এখন এই অবরোধ একটি 'সক্রিয় সম্প্রসারণ' হিসেবে কাজ করছে।
বর্ধিত নৌ অবরোধের বিষয়ে জেনারেল কেইনের ঘোষণার ঠিক এক দিন আগে ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট 'অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি'র ঘোষণা দেন। তিনি একে বোমা হামলার 'আর্থিক সমতুল্য' বলে আখ্যায়িত করেন।
এর আওতায় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, যেমন—যেসব ব্যাংকের সঙ্গে ইরানের লেনদেন রয়েছে, তাদের ওপর দ্বিতীয় পর্যায়ের বা সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা বলা হয়েছে।
জেনিফার কাভানাঘ বলেন, এই সম্প্রসারিত অবরোধ যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে সংঘাতের মাত্রাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর একটি ইঙ্গিত দেয়। তবে তিনি এও বলেন যে, এটি ইরানের হিসাব-নিকাশে খুব বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে বলে মনে হয় না।
তিনি বলেন, 'ইরানের কাছে এই যুদ্ধ তাদের অস্তিত্বের লড়াই। তাই তারা এত সহজে বা এত দ্রুত হার মানবে না। অর্থনৈতিক চাপ হয়তো দীর্ঘমেয়াদে কাজ করতে পারে, কিন্তু একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য ট্রাম্প এতটাই অধৈর্য হয়ে আছেন যে, তার পক্ষে এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা সম্ভব নয়।'
