হরমুজ পার হতে লাগবে আইআরজিসি-র অনুমতি, জব্দকৃত অর্থ অবমুক্ত করা চুক্তির অংশ: ইরানি কর্মকর্তা
হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব ধরনের জাহাজ চলাচল করতে পারবে, তবে এর জন্য ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর সাথে সমন্বয় প্রয়োজন হবে।
রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই তথ্য জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, বিদেশে আটকে থাকা ইরানের অর্থ অবমুক্ত করা এই চুক্তির একটি অংশ ছিল।
লেবাননে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, এই জলপথটি এখন উন্মুক্ত।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বাস করেন যে ইরান যুদ্ধের অবসানে খুব শীঘ্রই একটি চুক্তি হতে যাচ্ছে, যদিও এর নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনও অস্পষ্ট।
বর্তমানে পারস্য উপসাগরের ভেতরে কয়েকশ জাহাজ এবং প্রায় ২০ হাজার নাবিক আটকা পড়ে আছেন। তারা বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি পার হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।
ইরানি ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জাহাজ চলাচল কেবল ইরান কর্তৃক নির্ধারিত নিরাপদ লেন বা পথগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কোনো সামরিক জাহাজকে এই প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে না।
তিনি উল্লেখ করেন, 'প্রণালিটি পুনরায় খোলার শর্ত হিসেবে ইরানের আটকে থাকা অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়টি চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।' মূলত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে তেহরানের প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের রাজস্ব বিভিন্ন দেশে আটকে আছে, যা তেল ও গ্যাস রপ্তানি থেকে অর্জিত হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য ১৯৭০-এর দশক থেকে ব্যবহৃত 'ট্রাফিক সেপারেশন স্কিম' (টিএসএস) লেনগুলো এই অনুমতির আওতায় পড়বে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ওই কর্মকর্তা বলেন, 'সামরিক জাহাজ বাদে এমনকি মার্কিন বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকেও চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে।' তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, নেভিগেশন বা জাহাজ চালনা অবশ্যই ইরানের বন্দর ও সমুদ্র সংস্থার এবং বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর অনুমতিক্রমে হতে হবে যাতে নৌ-নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
আরাগচির বিবৃতির পরপরই ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে পোস্ট করেন, 'ইরান এইমাত্র ঘোষণা করেছে যে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত এবং যাতায়াতের জন্য প্রস্তুত।'
তবে ট্রাম্প এও যোগ করেন যে, গত সপ্তাহের শেষে পাকিস্তানে ইরানের সঙ্গে আলোচনার পর মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানি বন্দরগুলোর ওপর যে অবরোধ আরোপ করেছিল, তা এখনও বহাল রয়েছে। উল্লেখ্য, পাকিস্তানের ওই আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছিল।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, যদি যুক্তরাষ্ট্রের এই নৌ-অবরোধ অব্যাহত থাকে, তবে তেহরান একে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করবে এবং পুনরায় প্রণালিটি বন্ধ করে দেবে।
মাইন বিস্ফোরণের ঝুঁকি
ইরান এই প্রণালিতে মাইন বা সমুদ্র-বোমা পেতে রাখার বিষয়ে সতর্ক করেছে, যা জাহাজ মালিক, বিমা কোম্পানি এবং পণ্য পাঠানো প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। মার্কিন নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে শুক্রবার এক সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, মাইনের এই হুমকির বিষয়টি এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয় এবং জাহাজগুলোর উচিত এই এলাকাটি এড়িয়ে চলা।
শিপিং খাতের আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে। শিপিং অ্যাসোসিয়েশন 'বিআইএমসিও'-এর প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা জ্যাকব লারসেন বলেন, 'প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবি যে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত—তা সঠিক নয়। মাইনের কারণে এই পথটি এখনও অনিরাপদ।' বিআইএমসিও মনে করে, জাহাজ কোম্পানিগুলোর উচিত এই এলাকাটি এড়িয়ে চলা।
জাতিসংঘের জাহাজ চলাচল বিষয়ক সংস্থা আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন জানিয়েছে তারাও বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।
সংস্থাটির মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গুয়েজ বলেন, 'আমরা হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়টি যাচাই করছি এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা কতটুকু নিশ্চিত হয়েছে তা পর্যবেক্ষণ করছি।'
