ইরান যুদ্ধের দুই মাস: যে সংঘাতে প্রায় সকলেই হারছে, খাদের কিনারে বিশ্ব
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্রুত ও চূড়ান্ত বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। যুদ্ধের মাত্র দশ দিনের মাথায় তিনি দাবি করেছিলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র "ইতোমধ্যেই অনেক উপায়ে যুদ্ধে জয়লাভ করেছে।"
কিন্তু এ যুদ্ধের দুই মাস অতিবাহিত হওয়ার পর— লড়াই এখন সাময়িকভাবে স্থগিত থাকলেও, সংঘাতের কোনো চূড়ান্ত সমাপ্তি দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। ওয়াশিংটন এখনও কোনো স্পষ্ট কৌশলগত সুবিধা অর্জন করতে পারেনি; বরং যে সংঘাতকে একসময় 'সীমিত' হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছিল, তা এখন বিশ্বের একটি বড় অংশকে এক গভীর চোরাবালিতে টেনে নিচ্ছে—যেখান থেকে বিজয়ীর বেশে কারোরই বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো মেলানি সিসন মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনকে বলেছেন, "এই যুদ্ধে আসলে প্রকৃত কোনো বিজয়ী নেই। তবে কিছু দেশ এই পরিস্থিতির প্রভাব মোকাবিলার জন্য তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে।"
চলমান সংকটে প্রধান পক্ষগুলোর বর্তমান অবস্থান নিচে তুলে ধরা হলো।
যারা পরাজিত
#ইরানি জনগণ
বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের যেকোনো সংঘাতে সাধারণ মানুষই সবসময় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়—আর ইরানের ক্ষেত্রে এটি বর্তমান সময়ের রূঢ় বাস্তবতা।
ইরানের সাধারণ মানুষ এখন দেশের ভেতর এবং বাইরে—উভয় দিক থেকেই আক্রমণের শিকার। অ্যাডভোকেসি গ্রুপ 'হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস ইন ইরান'-এর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে—যার রয়েছে বেসামরিক অবকাঠামোতেও। এসব হামলায় এখন পর্যন্ত ৩,৬০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে ১,৭০০ জনেরও বেশি বেসামরিক নাগরিক। ট্রাম্প এমনকি হুমকি দিয়েছেন যে, ইরানের শাসকরা যদি তার দাবি না মানেন, তবে দেশটির "সমগ্র সভ্যতা" ধ্বংস করে দেওয়া হবে।
একই সময়ে, ইরানি শাসকগোষ্ঠী ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর তাদের দমন-পীড়ন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির অধীনে দেশটির নতুন নেতৃত্ব আগের চেয়েও কঠোর বলে মনে হচ্ছে, যারা শাসকগোষ্ঠীকে চ্যালেঞ্জ করার মতো দুঃসাহস দেখানো যে কারো বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ব্যবস্থা নিতে উন্মুখ।
মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মতে, চলতি বছরের শুরু থেকে এপর্যন্ত ইরানের সরকার অন্তত ৬০০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। এর আগে গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে বিক্ষোভ চলাকালীন হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল। এছাড়া ইরানিরা গত আট সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে সরকার-আরোপিত ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মধ্যে রয়েছে। যুদ্ধের ফলে ইরানের অর্থনীতিতেও মারাত্মক ধস নেমেছে, যার ফলে ব্যাপক কর্মসংস্থান হ্রাস এবং দারিদ্র্য বেড়েছে।
#লেবাননের জনগণ
ইরান-সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েলের মধ্যকার দ্বন্দ্বে কয়েক দশক ধরে পিষ্ট হচ্ছে লেবাননের সাধারণ মানুষ। গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সেখানে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর ছিল। কিন্তু ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের ওপর রকেট হামলা শুরু করে।
জবাবে ইসরায়েল প্রাণঘাতী বিমান হামলা এবং হিজবুল্লাহকে ধ্বংসের উদ্দেশ্যে দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযান শুরু করে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার জানিয়েছে, ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে ২,৫০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।
সিএনএন-এর স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইসরায়েল লেবাননেও গাজার মতো একই কৌশল গ্রহণ করেছে এবং একের পর এক গ্রাম মাটির সাথে মিশিয়ে দিচ্ছে। ইসরায়েল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, দক্ষিণ লেবানন থেকে বাস্তুচ্যুত হওয়া ৬ লাখ মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের ঘরে ফিরতে পারবে না, যতক্ষণ না হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের জন্য হুমকি হিসেবে থাকবে।
#উপসাগরীয় দেশগুলো
পারস্য উপসাগর তীরের ধনী আরব দেশগুলো এমন এক যুদ্ধের প্রভাবে গভীরভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, যা তারা কখনোই চায়নি এবং যেটি ঠেকানোর জন্য তাদের অধিকাংশই আপ্রাণ চেষ্টা করেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতে ভয়াবহ সব যুদ্ধ চললেও— তারা কয়েক দশক ধরে স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি উপভোগ করে আসছিল। কিন্তু ইরান যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে এই দেশগুলোর ওপর আক্রমণ শুরু করে, তখন থেকেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়।
ইরানের জবাবি হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাত এপর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসরায়েলের চেয়েও আমিরাতের ওপর বেশিসংখ্যায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। যদিও এর বড় একটি অংশ প্রতিহত করা হয়েছে, তবুও আরব আমিরাতের আঞ্চলিক ব্যবসা ও পর্যটন হাব হিসেবে যে মর্যাদা ছিল, তা এখন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
এদিকে ইরানের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার ফলে ইরাক, কাতার ও কুয়েতের অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে পড়েছে। কারণ এই দেশগুলো তাদের তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং অন্যান্য জ্বালানি পণ্য রপ্তানির জন্য এই সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথের ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এই দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে দিয়েছে। এমনকী ধারণা করা হচ্ছে এ বছর ইরাক, কাতার ও কুয়েতের অর্থনীতি সংকুচিত হবে।
#মার্কিন জনগণ
এই যুদ্ধ মার্কিন নাগরিকদের পকেট এবং জীবনযাত্রার ওপরও ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। পেট্রল এবং উড়োজাহাজের টিকিটের দাম বাড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সেবার মূল্যও বাড়ছে, কারণ অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এখন তাদের পণ্যের ওপর 'ফুয়েল সারচার্জ' বা জ্বালানি মাশুল যোগ করছে। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতি ২.৪ শতাংশ থাকলেও—মার্চে তা বেড়ে ৩.৩%-এ দাঁড়িয়েছে এবং ভোক্তা আস্থার সূচক দ্রুত নিম্নমুখী হচ্ছে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের সিসন বলেন, "বিষয়টি ঘুরিয়ে বলার সুযোগ নেই—যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পরিস্থিতি মোটেই ভালো নয়। মার্কিন অর্থনীতি যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের জ্বালানির জন্য তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশটি এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে।"
#বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং বিশ্বজুড়ে ভোক্তাদের দুরাবস্থা
বিশ্বজুড়ে সাধারণ ভোক্তারা ইতোমধ্যেই যুদ্ধের প্রভাবে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
বিশেষ করে এশিয়ার পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক, কারণ এই অঞ্চলের অনেক দেশ উৎপাদন খাতের জন্য প্রয়োজনীয় তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল আমদানির ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে লাতিন আমেরিকাতেও আমজনতার নাভিশ্বাস উঠছে জ্বালানি ও খাদ্যদ্রব্যের চড়া দামে। আফ্রিকার দেশগুলোর ভঙ্গুর অর্থনীতি এই সংকটে আরও বিপাকে পড়েছে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যেই আঞ্চলিক অর্থনীতিতে একটি "বিশাল ধাক্কা" আসার বিষয়ে সতর্কবার্তা জারি করেছে।
আইএমএফ-এর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে ধারণা করা হয়েছিল এ বছর বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি গত বছরের ৪.১% থেকে কমে ৩.৮%-এ নামবে। কিন্তু এখন তারা আশঙ্কা করছে যে তা ৪.৪% পর্যন্ত বাড়তে পারে। আইএমএফ এ মাসের শুরুর দিকে তাদের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও কমিয়ে দিয়েছে। জানুয়ারি মাসে তারা বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ৩.৩% হওয়ার প্রক্ষেপণ করলেও, এখন তা কমিয়ে ৩.১% প্রক্ষেপণ করেছে।
সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে, সারের আকাশচুম্বী দামের কারণে দরিদ্র দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ এই দেশগুলোর মানুষ কৃষির ওপর বেশি নির্ভরশীল এবং তাদের আয়ের একটি বড় অংশই খাবার কেনার পেছনে ব্যয় হয়।
যাদের হারজিতের ব্যাপারে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না
#মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
ট্রাম্প একটি বিশাল রাজনৈতিক জুয়া খেলেছেন, যা এপর্যন্ত সফল হয়নি। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এই যুদ্ধ হবে সংক্ষিপ্ত এবং এর লক্ষ্য হবে ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি বন্ধ করা—এমনকি সম্ভব হলে শাসকগোষ্ঠীর পতন ঘটানো। কিন্তু সেই লক্ষ্যগুলো এখনও অর্জিত হয়নি এবং যুদ্ধের সমাপ্তি এখনও অনিশ্চিত।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই যুদ্ধ শুরু থেকেই অজনপ্রিয় ছিল। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও তত কমছে। সিএনএন-এর সাম্প্রতিক জরিপগুলোর গড় অনুযায়ী, গত তিন সপ্তাহে প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা মাত্র ৩৭%-এ নেমে এসেছে।
মেলানি সিসন বলেন, "রাজনৈতিকভাবে বললে, তেলের দাম ইতিমধ্যেই মাত্রা ছাড়িয়েছে এবং তা আরও বাড়ছে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় বিপদ। কূটনৈতিকভাবেও ট্রাম্পকে দুর্বল মনে হচ্ছে। তিনি এখন বুঝতে পারছেন, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া আমেরিকার জন্য অনেক ব্যয়বহুল হবে। এদিকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা, হরমুজ প্রণালি সচল করা বা ইরানে শাসনব্যস্থা পরিবর্তনের মতো যে ফলাফল তিনি চেয়েছিলেন, তা পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।"
তবে ইরান যদি শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সব চরম দাবি মেনে নেয়, তবে ট্রাম্প বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন। যদিও স্বল্প মেয়াদে তেমন কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
#ইসরায়েল ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
কয়েক বছর আগেও ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি সংঘাতের কথা ভাবা যেত না—কারণ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এটি ঠেকানোর চেষ্টা করছিল।
তা সত্ত্বেও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও শাসকগোষ্ঠীর মোকাবিলা করার একমাত্র উপায় হলো যৌথভাবে দেশটিতে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা। এটি নেতানিয়াহুর জন্য ছিল একটি কৌশলগত বিজয়। গত সপ্তাহে নেতানিয়াহু আবারও তার সেই শপথ পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন যে তিনি "মধ্যপ্রাচ্যের চেহারা বদলে দেবেন" এবং সেই লক্ষ্য তিনি ট্রাম্পের সাথে "পূর্ণ সহযোগিতার" মাধ্যমে কাজ করছেন।
ইরানের সামরিক শক্তি অনেকটা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায়— ইসরায়েলের নির্বাচনী বছরে নেতানিয়াহু রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারেন। কিন্তু একই সময়ে বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ ইসরায়েলি ইহুদি ইরানের সাথে যুদ্ধকে সমর্থন করলেও—তারা বিশ্বাস করে না যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই যুদ্ধে জয়লাভ করছে। গাজা সংঘাতের কারণে আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি সংকটে ছিল, এই যুদ্ধ তা আরও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এছাড়া ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে হিজবুল্লাহর রকেট ও ড্রোন হামলার হুমকি বাড়ায়, নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
#ইরানের শাসকগোষ্ঠী
এই সংঘাতে ইরানি শাসকগোষ্ঠী বড় ধাক্কা খেয়েছে। দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃবৃন্দ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত হয়েছেন।
কিন্তু তা সত্ত্বেও দেশটির শাসনব্যবস্থা এখনও টিকে আছে এবং নতুন নেতারা আগের চেয়েও বেশি উগ্র ও সংঘাতমুখী। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে বিশ্বজুড়ে বিশৃঙ্খলা তৈরির সক্ষমতা দেখিয়ে এই রেজিম এখন নতুন এক কূটনৈতিক সুবিধা বা লেভারেজ অর্জন করেছে।
মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক–সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর মিডল ইস্ট প্রোগ্রামের পরিচালক মোনা ইয়াকুবিয়ান বলেন, "তারা (ইরানের শাসকরা) বড় ধরনের বাজির দান চেলেছিলেন, যদিও তা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু তারা প্রমাণ করতে পেরেছেন, হরমুজ প্রণালির ওপর কার্যত ইরানের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এর ফলে এই অঞ্চল এবং বিশ্ব অর্থনীতির ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে।"
#ইউক্রেন
স্বল্প মেয়াদে ইরান যুদ্ধ কিয়েভের জন্য খুবই দুঃসংবাদ বয়ে এনেছে। এই সংঘাতের কারণে, ইউক্রেনমুখী গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের সরবরাহ পথ বদলে গেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি গত সপ্তাহে সিএনএন-কে বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে বিশ্বের নজর ইউক্রেন থেকে সরে গেছে।
তবে এর একটি ইতিবাচক দিকও থাকতে পারে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে চার বছরের বেশি সময় ধরে লড়াই করার ফলে ইউক্রেন এখন ড্রোন উৎপাদন ও যুদ্ধক্ষেত্রে এর ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি শক্তিকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ইরানের ড্রোন হুমকির ফলে বিশ্ব এই সক্ষমতাকে এখন গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।
ইয়াকুবিয়ান বলেন, "এই যুদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলে ইউক্রেনের জন্য কিছু আকর্ষণীয় সুযোগ তৈরি করেছে। জেলেনস্কি সেখানে সফর করেছেন এবং তারা তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছে। অ্যান্টি-ড্রোন প্রযুক্তি তৈরির অভিন্ন স্বার্থের কারণে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কের শুরু হতে পারে।"
যারা জয়ী... আপাতত
#চীন
বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি আমদানিকারক হিসেবে চীন মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংঘাতের শেষে বেইজিং আরও শক্তিশালী অবস্থানে চলে যেতে পারে।
চীন তেলের সংকট বেশ ভালোভাবেই মোকাবিলা করেছে। গত এক দশকে বেইজিং জ্বালানি তেলের বিশাল মজুদ গড়ে তুলেছে, আমদানির উৎসগুলোতে বৈচিত্র্য এনেছে এবং কয়লা ও নবায়নযোগ্য শক্তির মাধ্যমে বিদ্যুতায়িত ব্যবস্থার দিকে দ্রুত অগ্রসর হয়েছে। এটি প্রচলিত জ্বালানির উচ্চ মূল্যের চাপ সইতে চীনকে সাহায্য করছে। ভবিষ্যতে নবায়নযোগ্য শক্তির চাহিদা বাড়লে, বিশ্বজুড়ে চীনের তৈরি সোলার প্যানেল ও উইন্ড টারবাইনগুলোর চাহিদাও আরও বাড়বে।
এছাড়া কূটনৈতিক দিক থেকেও চীন লাভবান হতে পারে। ইয়াকুবিয়ান বলেন, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সুনামের যে ক্ষতি করেছে, তার সুবিধা বেইজিং নিতে পারে। তিনি বলেন, "ইরান যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদা বড় ধাক্কা খেয়েছে। এটি কেবল আমেরিকাতেই নয়, সারা বিশ্বে একটি অজনপ্রিয় যুদ্ধ। অন্যদিকে, চীন এখানে নিজেকে বিশ্ব শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রধান প্রবক্তা হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে।"
কৌশলগত দিক থেকেও চীনের লাভ হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তি এশিয়া থেকে সরিয়ে নিতে হয়েছে। ফলে এই অঞ্চলে আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ কিছুটা শিথিল হয়েছে, যেখানে চীন ক্রমাগত তার শক্তি প্রদর্শন করছে এবং তাইওয়ান নিয়ে তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বজায় রেখেছে।
তা সত্ত্বেও, চীনা অর্থনীতি এখনো ব্যাপকভাবে রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। বৈশ্বিক অর্থনীতি যদি সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে থাকে, তবে চীনা পণ্যের ক্রেতা বা গ্রাহক সংখ্যা কমে যাবে। এর লক্ষণ এখনই স্পষ্ট হতে শুরু করেছে; চীনের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাজার মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির রপ্তানি কার্যক্রম বর্তমানে বেশ স্তিমিত হয়ে পড়েছে।
#জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলো
তেলের চড়া দাম বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুললেও—তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো এখন মুনাফার পাহাড়ে ভাসছে।
শেভরন, শেল, বিপি, কনোকোফিলিপস, এক্সন এবং টোটালএনার্জি—সব কটি কোম্পানি তেলের চড়া দাম এবং বাজারের অস্থিরতার কারণে আকাশচুম্বী মুনাফা করছে। অক্সফামের একটি নতুন প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ছয়টি কোম্পানি এ বছর ৯৪ বিলিয়ন ডলার মুনাফা করবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। তবে এই অস্বাভাবিক মুনাফার কারণে অনেক দেশে এই কোম্পানিগুলোর ওপর অতিরিক্ত কর বা 'উইন্ডফল ট্যাক্স' আরোপের দাবি উঠছে।
অবশ্য একইসঙ্গে বর্তমান এই সংকট নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে আগের চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয় করে তুলছে, যা শেষ পর্যন্ত জীবাশ্ম জ্বালানির আধিপত্য হ্রাসের প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।
#রাশিয়া
রাশিয়ার অর্থনীতি এই সংঘাত থেকে যে বড় ধরনের সুবিধা পাচ্ছে– তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তেল ও সারের চড়া দামের কারণে ক্রেমলিনের কোষাগারে বাড়তি অর্থ জমা হচ্ছে—বিশেষ করে আমেরিকা যখন বাজারে সরবরাহ বাড়াতে রুশ তেলের ওপর সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছিল।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার জ্বালানি আয় ৯.৭৫ বিলিয়ন ডলার থাকলেও মার্চে তা দ্বিগুণ হয়ে ১৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে ইউক্রেন যেভাবে রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও বন্দরগুলোতে হামলা চালাচ্ছে, তা রাশিয়ার তেল বিক্রির সক্ষমতাকে কিছুটা ব্যাহতও করছে।
"তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ 'কিন্তু' রয়েছে," উপসাগরীয় অঞ্চলে ইউক্রেনের গড়ে তোলা নতুন সম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত করে ইয়াকুবিয়ান বলেন। মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে মস্কোর দীর্ঘদিনের উপস্থিতি ও নিবিড় সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "রুশদের জন্যও বিষয়টি নিশ্চিতভাবেই গভীর উদ্বেগের। কারণ, যারা নিজেরাও উপসাগরীয় অঞ্চলে ভালো অবস্থানে রয়েছে, তাদের প্রধান শত্রু (ইউক্রেন) মধ্যপ্রাচ্যে জায়গা করে নিচ্ছে—এটি মস্কোর জন্য দুশ্চিন্তার বড় কারণ।"
#নবায়নযোগ্য শক্তি
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের সংকট অনেক দেশকে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে ধাবিত হতে উৎসাহিত করেছে, যা এই খাতের জন্য একটি বড় আশীর্বাদ। ইউরোপীয় কমিশন গত সপ্তাহে জীবাশ্ম জ্বালানির দামের ধাক্কা থেকে জনগণকে রক্ষা করতে এবং নিজস্ব পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবস্থা দ্রুত সম্প্রসারণের জন্য নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে।
তবে এখানেও একটি সমস্যা রয়েছে—ইরান সংকটের কারণে অ্যালুমিনিয়ামের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ব্যবহৃত উপকরণের দাম বাড়ছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে। এর ফলে এই প্রযুক্তি আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
#ড্রোন ও সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদক প্রতিষ্ঠান
যেকোনো যুদ্ধের মতোই সমরাস্ত্র নির্মাতারা এখানে লাভবান হচ্ছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই বা সিপ্রি)-র গত সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় ২.৯% বেড়ে ২০২৫ সালে ২.০৯ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
সংস্থাটির গবেষক শিয়াও লিয়াং বলেন, বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রতিক্রিয়ায় দেশগুলো বড় পরিসরে সমরাস্ত্র সংগ্রহের প্রতিযোগিতায় নামায় এই ব্যয় বেড়েছে। তিনি আরও বলেন, "বর্তমান সংকটগুলো এবং অনেক দেশের দীর্ঘমেয়াদী সামরিক পরিকল্পনা বিবেচনায় নিলে এই প্রবৃদ্ধি ২০২৬ সাল এবং তার পরেও অব্যাহত থাকবে।"
তবে প্রতিরক্ষা খাতকেও দীর্ঘমেয়াদে নিশ্চিত বিজয়ী বলা যাচ্ছে না। গত কয়েক বছর শেয়ার বাজারে চাঙ্গা থাকলেও গত কয়েক মাসে বিশ্বের বড় বড় প্রতিরক্ষা কোম্পানির শেয়ারের ওপর চাপ বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে ইরান যুদ্ধের চরম অজনপ্রিয়তা এবং ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিরক্ষা বাজেট কংগ্রেসে অনুমোদিত হবে কি না—তা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণেই এমনটি ঘটছে।
