যুক্তরাষ্ট্রে লিমন-বৃষ্টির হত্যাকাণ্ড তদন্তে চ্যাটজিপিটি যেভাবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছে
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) দুই বাংলাদেশি গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার কয়েক দিন আগে, সন্দেহভাজন ঘাতক হিশাম আবুঘারবিয়াহ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চ্যাটবট 'চ্যাটজিপিটি'র কাছে একটি ভয়ংকর প্রশ্ন করেছিলেন। ফ্লোরিডার প্রসিকিউটরদের দাখিল করা এক হলফনামা অনুযায়ী, গত ১৩ এপ্রিল তিনি চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করেন, "মানুষকে কালো আবর্জনার ব্যাগে ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দিলে কী ঘটে?"
আদালতের নথি অনুযায়ী, চ্যাটজিপিটি উত্তর দিয়েছিল যে বিষয়টি বিপজ্জনক মনে হচ্ছে। এরপর আবুঘারবিয়াহ চ্যাটজিপিটির কাছে আরেকটি প্রশ্ন করেন, "তারা (কর্তৃপক্ষ) কীভাবে এটি খুঁজে বের করবে?" আবুঘারবিয়াহর বিরুদ্ধে বর্তমানে দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে প্রথম ডিগ্রি হত্যার অভিযোগে মামলা চলছে এবং তদন্তকারীরা তার এআই চ্যাট হিস্ট্রিকে অন্যতম প্রধান প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করছেন।
তদন্তকারীদের মতে, এই চ্যাট লগগুলো সন্দেহভাজন ব্যক্তির মানসিক অবস্থা এবং উদ্দেশ্য সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে। ওয়াশিংটন ডিসির সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবী ইলিয়া কোলোচেঙ্কো বলেন, "আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য এআই চ্যাটবটের সাথে যে কোনো যোগাযোগ একটি গুপ্তধনের খনির মতো। সন্দেহভাজনরা মনে করে যে এআই-এর সাথে তাদের কথোপকথন গোপন থাকবে, তাই তারা প্রায়ই খুব সরাসরি প্রশ্ন করে ফেলে।"
এই মামলাটি ব্যক্তিগত পরামর্শের জন্য এআই চ্যাটবটের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার এবং সেই কথোপকথনের ক্ষেত্রে গোপনীয়তার সুরক্ষার অভাবকে সামনে নিয়ে এসেছে। যদিও চ্যাটবটগুলো আইনি পরামর্শ বা থেরাপির উৎস হয়ে উঠেছে, কিন্তু একজন লাইসেন্সপ্রাপ্ত আইনজীবী বা ডাক্তারের সাথে কথা বললে যেমন আইনি সুরক্ষা পাওয়া যায়, চ্যাটজিপিটির ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়।
ওপেনএআই-এর সিইও স্যাম অল্টম্যান গত জুলাই মাসে এক পডকাস্টে বলেছিলেন, "মানুষ চ্যাটজিপিটির কাছে তাদের জীবনের সবচেয়ে ব্যক্তিগত বিষয়গুলো শেয়ার করে। তরুণরা বিশেষ করে একে থেরাপিস্ট বা লাইফ কোচ হিসেবে ব্যবহার করে। কিন্তু বর্তমানে থেরাপিস্ট, আইনজীবী বা ডাক্তারের সাথে কথা বললে যেমন আইনি সুরক্ষা বা পেশাগত গোপনীয়তা থাকে, চ্যাটজিপিটির ক্ষেত্রে আমরা এখনো সেটি নিশ্চিত করতে পারিনি। তাই সংবেদনশীল বিষয়ে কথা বলার পর যদি মামলা হয়, তবে আমরা সেই তথ্য দিতে বাধ্য হতে পারি।"
সিএনএন-এর আইনি বিশ্লেষক জোই জ্যাকসন বলেন, এআই চ্যাটবটের তথ্যগুলো অনেকটা গুগল সার্চের মতো। গত বছর ব্রায়ান ওয়ালশে তার স্ত্রীকে হত্যার পর গুগলে "লাশ গুম করার ১০টি উপায়" লিখে সার্চ করে ধরা পড়েছিলেন।
ফ্লোরিডার এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ঘাতক আবুঘারবিয়াহ চ্যাটজিপিটিকে আরও অনেক প্রশ্ন করেছিলেন। হলফনামা অনুযায়ী, তিনি জানতে চেয়েছিলেন—বিনা লাইসেন্সে বাড়িতে বন্দুক রাখা যায় কি না এবং গাড়ির আইডেন্টিফিকেশন নম্বর পরিবর্তন করা যায় কি না।
বাংলাদেশি দুই শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার পরের দিনগুলোতেও আবুঘারবিয়াহর এআই সার্চ অব্যাহত ছিল। ১৯ এপ্রিল তিনি প্রশ্ন করেন, "স্নাইপারের বুলেট মাথায় লাগার পর কি কেউ বেঁচে থাকে?", "আমার বন্দুকের শব্দ কি প্রতিবেশীরা শুনতে পাবে?" এবং "পানির এমন কোনো তাপমাত্রা আছে কি যা তাৎক্ষণিকভাবে পুড়িয়ে ফেলে?" ২৩ এপ্রিল তিনি সার্চ করেন, "নিখোঁজ বিপন্ন প্রাপ্তবয়স্ক বলতে কী বোঝায়?"
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জামিল লিমনের মরদেহ একটি আবর্জনার ব্যাগে পাওয়া গেছে। অন্য একটি ব্যাগে মানুষের দেহাবশেষ পাওয়া গেলেও তা এখনো নাহিদা বৃষ্টির কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ওপেনএআই মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে বলেছে, তারা নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয় এবং গুরুতর ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে। তবে আইনি বিশেষজ্ঞরা মানুষকে চ্যাটবটের সাথে কথা বলার সময় সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
বারগ্রুয়েন ইনস্টিটিউটের উপদেষ্টা নিলস গিলম্যান বলেন, "চ্যাটজিপিটি আপনার বন্ধু নয়, আপনার আইনজীবী নয়, আপনার ডাক্তার নয় এবং আপনার স্ত্রীও নয়। তাদের সাথে সেভাবে কথা বলা বন্ধ করুন।"
