চুক্তি বহাল থাকলে ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল গঠনের পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের
তেহরান যদি একটি পারমাণবিক চুক্তি অন্তর্ভুক্ত করে যুদ্ধ অবসানের জন্য একটি চূড়ান্ত সমঝোতায় সম্মত হয়, তবে ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন বা ৩০ হাজার কোটি ডলারের একটি বিনিয়োগ তহবিল প্রতিষ্ঠার অনুমতি দিতে প্রস্তুত ট্রাম্প প্রশাসন।
একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ওয়াশিংটন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সম্ভাবনা এবং 'দেশ পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বড় তহবিল' নিয়ে আলোচনা করেছে। এসব প্রণোদনা ইরানের 'পারফরম্যান্স' বা সমঝোতা স্মারকে বর্ণিত শর্তগুলো মেনে চলার ওপর নির্ভর করবে। ওই সমঝোতা স্মারকটি শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে।
আলোচনা সম্পর্কে অবগত একজন ব্যক্তি বলেন, এই তহবিল নির্ভর করবে সমঝোতা স্মারকের অংশ হিসেবে একটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি চুক্তির ওপর। এছাড়া যুদ্ধবিরতি আরও ৬০ দিন বাড়ানো, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে অতিরিক্ত আলোচনার পরই এটি কার্যকর হবে।
তিনি আরও বলেন, এই তহবিল কোনো সরকারের অর্থ থেকে আসবে না। বরং ৯ কোটি জনসংখ্যার এবং বিপুল জ্বালানি সম্পদসমৃদ্ধ দেশটিতে বিনিয়োগে আগ্রহী কোম্পানিগুলোর জন্য এটি গঠন করা হবে। তহবিলটির কাঠামো ও ব্যবস্থাপনা কেমন হবে, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট নয়।
ওই ব্যক্তি বলেন, 'ইউরোপের অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, এশিয়ার অনেক প্রতিষ্ঠান—দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানসহ—এবং আমেরিকান কোম্পানি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোরও আগ্রহ রয়েছে। যদি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়, তাহলে এই তহবিলের পরিমাণ হবে অত্যন্ত বড় এবং এর প্রভাবও হবে ব্যাপক।'
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সিবিএস নিউজকে বলেন, ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিল এমন একটি বিষয়, 'যার সুযোগ ইরান পেতে পারে... যতক্ষণ তারা তাদের দায়বদ্ধতার অংশটি যথাযথভাবে পালন করে।'
ইরানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র যে আর্থিক প্রণোদনার প্রস্তাব দিয়েছে, তার পরিমাণ আলোচনায় একটি বিতর্কিত বিষয় হয়ে উঠেছে। এটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি ইস্যু, কারণ তিনি চান না যে তাকে ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে পুরস্কৃত করছেন বলে মনে করা হোক।
বারাক ওবামার প্রশাসন ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে বিশ্বশক্তিগুলোর যৌথ পারমাণবিক চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন ট্রাম্প। ওই চুক্তির মাধ্যমে ইরানকে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। ট্রাম্প অভিযোগ করেছিলেন, এর মাধ্যমে তেহরানে 'নগদ অর্থভর্তি প্যালেট' পাঠানো হয়েছিল।
সমঝোতা স্মারকের সমালোচকেরা বলেছেন, বর্তমানে যে আর্থিক প্রণোদনাগুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তার পরিমাণ ওবামা আমলের চুক্তিতে সম্মত সুবিধার তুলনায় অনেক বেশি।
সোমবার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, ট্রাম্প, ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ দূরবর্তী পদ্ধতিতে নথিতে স্বাক্ষর করার পর থেকে ইরানের কাছে 'শূন্য' ডলার গেছে।
আলোচনার সঙ্গে পরিচিত ওই ব্যক্তি বলেন, সমঝোতা স্মারকের শর্ত অনুযায়ী যেকোনো নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ—বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত করাসহ—ধাপে ধাপে কার্যকর হবে এবং তা পারমাণবিক আলোচনা ও চূড়ান্ত সমঝোতার অগ্রগতির ওপর নির্ভর করবে।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বলেছেন, আস্থা তৈরির পদক্ষেপ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র শুরুতে আর্থিক স্বস্তির কিছু 'ছোট উদ্যোগ' নেবে।
মার্কিন কর্মকর্তারা আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানকে বৃহত্তর তহবিল ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য মানদণ্ডের ভিত্তিতে নয়, বরং পরিস্থিতি মূল্যায়নের ভিত্তিতে দেওয়া হবে।
সোমবার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, 'নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ কোনো নির্দিষ্ট আচরণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। এটি সামগ্রিকভাবে তাদের উপযুক্ত আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত। আর অবশ্যই যে বিষয়টি আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হলো পারমাণবিক কর্মসূচি।'
সমঝোতা স্মারকের অংশ হিসেবে, তেহরান এবং ওয়াশিংটন একটি সম্মত ব্যবস্থার অধীনে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত বা ভাণ্ডার অপসারণের বিষয়টি সমাধান করতে সম্মত হয়েছে। আলোচনা সম্পর্কে অবহিত ব্যক্তির মতে, সর্বনিম্ন প্রতিশ্রুতি হলো আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আইএইএ-র তত্ত্বাবধানে সমস্ত ইউরেনিয়াম নির্দিষ্ট স্থানেই মিশ্রিত বা তরল করতে হবে।
কর্মকর্তাটি বলেন, গত জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালানোর ফলে ওই কর্মসূচি 'ইতোমধ্যে পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে'।
তবে প্রশাসন নিশ্চিত হতে চাইবে যে, 'তারা যেন এটি আবার গড়ে তুলতে না পারে।'
ইরানের কাছে বর্তমানে ৯ হাজার কিলোগ্রামের বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ রয়েছে। এর বেশিরভাগই নিম্নমাত্রায় সমৃদ্ধ করা হলেও, ৪৪০ কিলোগ্রাম ইউরেনিয়াম অস্ত্র-মানের কাছাকাছি মাত্রায় সমৃদ্ধ করা হয়েছে—যাকে ট্রাম্প 'পারমাণবিক ধূলিকণা' বলে উল্লেখ করেন।
