হামলার ঝুঁকি ছাড়াই হরমুজ প্রণালির ওমান অংশে জাহাজ চলাচলের সুযোগ দিতে পারে ইরান
নতুন করে সংঘাত এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চায় ইরান। চুক্তিটি হলে হরমুজ প্রণালির ওমান অংশ দিয়ে কোনো রকম হামলার ঝুঁকি ছাড়াই জাহাজ চলাচলের সুযোগ দিতে পারে তারা। তেহরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের বরাতে এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই সূত্র জানিয়েছে, সংকীর্ণ এই প্রণালির অন্য পাশ, অর্থাৎ ওমানের জলসীমা দিয়ে জাহাজ চলাচলে তেহরান কোনো বাধা নাও দিতে পারে।
তবে ইরান ওই জলসীমায় কোনো মাইন পুঁতে থাকলে তা সরাবে কি না, সংশ্লিষ্ট সূত্র তা পরিষ্কার করেনি। এছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পৃক্ত জাহাজগুলোসহ সব নৌযান সেখানে অবাধে চলতে পারবে কি না, সে বিষয়েও কিছু জানানো হয়নি।
ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এই যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস সরবরাহে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে। কারণ, যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেয় ইরান। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশই এই পথ দিয়ে সরবরাহ করা হয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকা পড়েছে কয়েক শ জাহাজ। এসব জাহাজে অন্তত ২০ হাজার নাবিক রয়েছেন। গত ৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এরপর গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধ প্রায় শেষের পথে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের আলোচনায় হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি এখনও একটি বড় ইস্যু হয়ে আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করছে প্রস্তাব
সূত্রের বরাতে রয়টার্স আরও জানায়, ইরানের এই প্রস্তাব মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করছে। ওয়াশিংটন তেহরানের দাবিগুলো মানতে প্রস্তুত কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। হরমুজ প্রণালি নিয়ে যেকোনো সমাধানের ক্ষেত্রে এটিই প্রধান শর্ত।
এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের কাছে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তারা তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া দেয়নি। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
পশ্চিমা একটি নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, ওমানের জলসীমা দিয়ে নির্বিঘ্নে জাহাজ চলাচলের প্রস্তাবটি নিয়ে কাজ চলছে। তবে ওয়াশিংটন এ নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব
ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী এই প্রণালি মাত্র ৩৪ কিলোমিটার (২১ মাইল) চওড়া। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ এবং সারসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্য পরিবহনের অন্যতম প্রধান রুট এই হরমুজ প্রণালি।
সম্প্রতি তেহরানের পক্ষ থেকে বেশ কিছু আক্রমণাত্মক পদক্ষেপের কথা শোনা যাচ্ছিল। আন্তর্জাতিক নৌপথ ব্যবহারের জন্য জাহাজের কাছ থেকে মাশুল আদায় এবং প্রণালিতে নিজেদের সার্বভৌমত্ব জারির মতো কথা বলেছিল তারা। তবে বর্তমান প্রস্তাবটি সেসব আক্রমণাত্মক অবস্থান থেকে ইরানের সরে আসার প্রথম দৃশ্যমান পদক্ষেপ হতে পারে।
চলতি সপ্তাহে লন্ডনে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) সদস্য দেশগুলোর একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারের জন্য ইরানের মাশুল বসানোর ধারণার তীব্র বিরোধিতা করা হয়। আইএমও বলেছে, এমন কিছু হলে তা একটি ভয়ংকর নজির স্থাপন করবে।
পুরোনো ব্যবস্থা ফেরানোর ইঙ্গিত
এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে কয়েক দশক ধরে একটি স্থিতিশীল অবস্থা বজায় ছিল। যদিও ইরান মাঝে মাঝেই এখান দিয়ে যাওয়া জাহাজ জব্দ করত। তবে ইরানের নতুন প্রস্তাবের ফলে সেই পুরোনো স্থিতিশীল অবস্থা ফিরিয়ে আনার পথ খুলতে পারে।
১৯৬৮ সালে জাতিসংঘের সহায়তায় এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর সম্মতিতে এই অঞ্চলে দ্বিমুখী নৌ চলাচল ব্যবস্থা চালু হয়। এর ফলেই জাহাজ চলাচলের পথটি ইরান ও ওমানের জলসীমার মধ্যে বিভক্ত হয়ে যায়।
এদিকে, গত সোমবার ইরানের বন্দরগুলো ছেড়ে যাওয়া তেলের জাহাজগুলোর ওপর অবরোধ আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
