মার্কিন অবরোধের পর কত জাহাজ হরমুজ পেরোল?
গত সোমবার থেকে হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর থেকে এই নৌপথ দিয়ে ১৫টি জাহাজ পার হয়েছে। এর মধ্যে নয়টি জাহাজের সঙ্গেই ইরানের সম্পৃক্ততা রয়েছে। জাহাজের অবস্থান শনাক্তকারী (ট্র্যাকিং) উপাত্তের বিশ্লেষণ করে এই তথ্য পেয়েছে বিবিসির তথ্য যাচাইকারী দল 'বিবিসি ভেরিফাই'।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানের বন্দরগুলোতে যাওয়া-আসা করা সব জাহাজের ক্ষেত্রেই এই অবরোধ প্রযোজ্য। গত মঙ্গলবার সেন্টকম জানায়, অবরোধের প্রথম ৩৬ ঘণ্টায় কোনো জাহাজই এই পথ পাড়ি দিতে পারেনি। উল্টো নির্দেশনা মেনে ছয়টি জাহাজ ফিরে গেছে।
তবে ট্র্যাকিং ডেটা বলছে, হরমুজ দিয়ে পার হওয়া ছয়টি জাহাজ আগেই ইরানের কোনো না কোনো বন্দরে নোঙর করেছিল। এর বাইরে আরও দুটি জাহাজ শনাক্ত করা হয়েছে, যেগুলো ইরানের একটি বন্দরের কাছ থেকে রওনা হয়েছিল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, প্রণালিটি খুলে দিতে ইরান 'ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যর্থ' হওয়ায় এই অবরোধ দেওয়া হয়েছে।
মূলত জাহাজের অবস্থান নির্ভুলভাবে সম্প্রচারের ওপরই এই ট্র্যাকিং নির্ভর করে। তবে কিছু জাহাজ হয়তো তাদের ট্র্যাকার বন্ধ করে রাখছে অথবা ভুয়া অবস্থান দেখাচ্ছে। এই কৌশলকে 'স্পুফিং' বলা হয়। বিশেষজ্ঞরা বিবিসিকে জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ও নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ট্যাংকারগুলোর জন্য এমন কাজ করা খুবই সাধারণ বিষয়।
ছয়টি জাহাজ ফিরে যাওয়ার বিষয়ে মার্কিন দাবিটি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে পারেনি বিবিসি। তবে ট্র্যাকিং ডেটা বলছে, প্রণালি পার হওয়া অন্তত একটি জাহাজ মাঝপথ থেকে ফিরে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় থাকা ট্যাংকার 'রিচ স্টারি' সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ থেকে পূর্ব দিকে প্রণালির ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু গত বুধবার সেটি দিক পরিবর্তন করে আবার উপসাগরে ফিরে আসে।
এ ছাড়া অবরোধ শুরুর পর ইরানের পতাকাবাহী দুটি জাহাজকে চাবাহার বন্দরের কাছ থেকে ছেড়ে যেতে দেখা গেছে। বন্দরটি হরমুজ প্রণালির পূর্বে ইরানের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত।
অর্থনীতিতে ধাক্কা ও সংঘাতের প্রেক্ষাপট
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি কার্যত বন্ধ করে রেখেছে ইরান। ফলে আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠে এসেছে প্রণালিটি। জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এই সংঘাত শুরুর আগে প্রতিদিন গড়ে ১৩৮টি জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করত।
এদিকে ট্রাম্প কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, কোনো ইরানি মার্কিন নৌবাহিনীর ওপর হামলা চালালে তাদের 'নরকে পাঠানো হবে'। সেই সঙ্গে ইরানকে ট্রানজিট ফি দেওয়া যেকোনো জাহাজের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
গত ছয় সপ্তাহ ধরে চলা এই সংঘাতের জেরে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। জ্বালানির বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। উপসাগরের সঙ্গে ভারত মহাসাগরকে যুক্ত করা এই নৌপথটির ওপর আন্তর্জাতিক সরবরাহ কতটা নির্ভরশীল, তা এই সংকটে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
জাহাজ মালিকদের সংগঠন 'বাল্টিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম কাউন্সিল'-এর জ্যাকব লারসেন বিবিসিকে বলেন, মার্কিন অবরোধের কারণে জাহাজের ওপর সরাসরি হামলার ঝুঁকি বাড়ছে।
আটকে আছে প্রায় ৮০০ জাহাজ
মেরিটাইম সংবাদমাধ্যম লয়েডস লিস্টের প্রধান সম্পাদক রিচার্ড মিড বলেন, 'সেখানে কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রায় ৮০০ জাহাজ আটকে আছে। এর বেশির ভাগই এখন মালবোঝাই। তাই এগুলোকে বের করে আনাই হবে মূল অগ্রাধিকার।'
বিবিসি ভেরিফাইয়ের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যেসব জাহাজ প্রণালি পার হয়েছে, সেগুলো ইরানের উপকূল ঘেঁষে উত্তরাঞ্চলীয় পথ ধরে তাদের জলসীমার ভেতর দিয়ে গেছে। অথচ সংঘাতের আগে জাহাজগুলো সাধারণত প্রণালির মাঝখান দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলীয় পথ ব্যবহার করত।
ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব শিপিংয়ের মহাসচিব থমাস কাজাকোস বলেন, সাগরে পেতে রাখা মাইন নিয়েও একধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে। তিনি বলেন, 'জাহাজ ও নাবিকদের জন্য পথটি কতটা নিরাপদ, সে বিষয়ে আমাদের স্পষ্ট নিশ্চয়তা দরকার।'
এদিকে সাগরে পেতে রাখা মাইনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘর্ষ এড়াতে প্রণালি পার হওয়ার জন্য কিছু 'অনুমোদিত পথ'-এর ম্যাপ প্রকাশ করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌ শাখা। তারা প্রণালির মাঝখানের একটি অংশকে 'বিপজ্জনক এলাকা' হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং তা এড়িয়ে চলতে বলেছে।
এর আগে সেন্টকম জানিয়েছিল, আইআরজিসির পেতে রাখা মাইনগুলো অপসারণ করতে ওই এলাকায় ইউএসএস ফ্র্যাঙ্ক ই পিটারসেন এবং ইউএসএস মাইকেল মারফি নামের দুটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ার (যুদ্ধজাহাজ) কাজ করছে।
