ইরান যুদ্ধ এমন সব ক্ষতি করছে, যা আর পূরণ হওয়ার নয়
যেকোনো যুদ্ধবিরতির পরই একটি পুরোনো প্রশ্ন নতুন করে সামনে আসে—শান্তির এই প্রতিশ্রুতি আদৌ সফল হবে কিনা।
ইসলামাবাদে সদ্য সমাপ্ত শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সমাধানের চেয়ে নিজেদের মতবিরোধ নিয়েই যেন বেশি মেতে ছিল।
ফলে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে হওয়া এই আলোচনা শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি ছাড়াই মুখ থুবড়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের ১০-দফা শান্তি প্রস্তাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের ১৫-দফা পরিকল্পনার মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান থাকায় কোনো ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
তবে ইতিহাস দেখলে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ১৯৪৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত হওয়া শান্তি চুক্তির পরিসংখ্যান বলে, সশস্ত্র সংঘাতের শিকার হওয়া অর্ধেকের বেশি দেশই পুনরায় রক্তপাতে জড়িয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির ক্ষীণ আশা
মধ্যপ্রাচ্যের অতীত ইতিহাস আরও বেশি হতাশাজনক। ১৯৭৮ সালের 'ক্যাম্প ডেভিড' চুক্তি মিসর ও ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি এনেছিল ঠিকই, কিন্তু এর চড়া মূল্য চোকাতে হয়েছিল মিসরের নেতা আনোয়ার সাদাতকে নিজের জীবন দিয়ে।
এমনকি আরব লীগ থেকেও বের করে দেওয়া হয়েছিল মিসরকে। ১৯৯৩ সালে হোয়াইট হাউসের লনে বুকভরা আশা নিয়ে সই হওয়া 'অসলো চুক্তি'ও শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় ইন্তিফাদার রক্তপাতে রূপ নেয়।
২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তিটিও (জেসিপিওএ) মাত্র তিন বছর টিকেছিল; এরপরই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে এই চুক্তি থেকে বের করে আনেন। সবশেষ ২০২৫ সালের জুনে ইরান-ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতিও কয়েক মাসের মাথাতেই ভেঙে যায়।
এখন বিশ্বকে আবারও নতুন করে আশার আলো দেখতে বলা হচ্ছে। টানা ৪০ দিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ হামলার পর গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়।
তবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় এই সংঘাত বিশ্বব্যাপী তেলের বাজারে এরই মধ্যে চরম সংকট তৈরি করেছে; অন্যদিকে লেবাননেও অবিরাম বোমা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল।
ইরানের ১০-দফা শান্তি পরিকল্পনায় হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ক্ষতিপূরণ আদায়, মার্কিন সেনা প্রত্যাহার ও মিত্রদের সুরক্ষার মতো দাবিগুলো ছিল।
যুক্তরাষ্ট্র এগুলোকে 'অবাস্তব ও সর্বোচ্চ পর্যায়ের দাবি' আখ্যা দিয়ে উড়িয়ে দেয়। চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার পরই যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে নৌ-অবরোধের ঘোষণা দেয়, যা আগুনে আরও ঘি ঢেলেছে।
শান্তির পুরো কাঠামোই এখন ভেঙে পড়ছে—আর তা কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং বেশ পরিকল্পিতভাবেই হচ্ছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ২০২৬ সালের বাজেটে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী খাতে দেওয়া ১২৩ কোটি (১.২৩ বিলিয়ন) ডলারের পুরো অনুদানই বাতিল করেছে।
পাশাপাশি কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক অনুদান কমিয়েছে ৮৫ শতাংশ। ৬৪ বছর ধরে চলা ইউএসএআইডি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এমন পদক্ষেপে চরম তহবিল সংকটে পড়েছে জাতিসংঘ। বাধ্য হয়ে তারা ২৫ শতাংশ শান্তিরক্ষী বাহিনী কমিয়েছে।
ফলে লেবানন, কঙ্গো বা দক্ষিণ সুদানের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত জায়গাগুলোতে ঠিক যখন সাহায্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তখনই সেখানে শান্তিরক্ষীদের উপস্থিতি কমতে শুরু করেছে।
এই যুদ্ধ বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার এক অদ্ভুত উল্টো চিত্রও সামনে এনেছে। শান্তি স্থাপনের এই চরম সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো পশ্চিমা মিত্রই এগিয়ে আসেনি।
উল্টো ভারত ও আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনায় জর্জরিত পাকিস্তান প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সামনে এসেছে। তাদের সঙ্গী হয়েছে তুরস্ক, মিসর ও সৌদি আরব। আর পর্দার আড়াল থেকে এই প্রক্রিয়ায় কলকাঠি নেড়েছে চীন।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই চার দেশ এখন এমন একটি অঞ্চলের প্রধান কূটনৈতিক কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে, যেখানে ইসরায়েল ও ইরান উভয়েই অনেকটাই একঘরে।
অন্যদিকে বিশ্ব মোড়ল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতাও এখন তলানিতে। ১৯৪৫ সালের পর যে দেশটি বিশ্বজুড়ে নিয়মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল, আজ নিজেদের শুরু করা যুদ্ধ থেকে বাঁচতে তাদেরই এমন দেশগুলোর দ্বারস্থ হতে হচ্ছে, যাদের তারা একসময় সুশাসন ও শান্তির শিক্ষা দিত।
সেই এথেন্সের সঙ্গে অদ্ভুত মিল
যুক্তরাষ্ট্র যদি সুস্পষ্ট লক্ষ্য ছাড়াই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে পারে, রাশিয়া যদি গায়ের জোরে ইউক্রেনের সীমানা পাল্টে দিতে পারে এবং ইসরায়েল যদি লেবানন ও গাজায় বিনা বাধায় ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারে—তবে এটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী থাকা অন্যান্য দেশের কাছে কী বার্তা দিচ্ছে?
ধ্বংসযজ্ঞের পর শুধু যুদ্ধ শেষ করা নয়, যুদ্ধ প্রতিরোধ করার মতো কোনো ব্যবস্থা কি মানবজাতি আদৌ গড়তে পারবে?
আজ থেকে ২ হাজার ৪০০ বছর আগে গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডাইডিস একটি সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছিলেন—সামরিক শক্তি ও প্রযুক্তির বড়াই কখনোই চিরস্থায়ী শান্তির নিশ্চয়তা দেয় না।
খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি এথেন্সের পতন কিন্তু কোনো শক্তিশালী শত্রুর হাতে হয়নি। তাদের পতন হয়েছিল এমন এক যুদ্ধের কারণে, যে যুদ্ধে জড়ানোর কোনো প্রয়োজনই তাদের ছিল না।
তাদের সেই 'সিসিলিয়ান অভিযান' এথেন্সের রাজকোষ শূন্য করেছিল, মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙেছিল এবং সাম্রাজ্যবাদী অহংকারের চূড়ান্ত পতন ঘটিয়েছিল। আজকের বিশ্ব পরিস্থিতির সঙ্গে ইতিহাসের এই মিল এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই।
নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী চাপিয়ে দেওয়া এই যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে যুক্তরাষ্ট্র আজ ধ্বংসযজ্ঞের পেছনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ওড়াচ্ছে।
অথচ যেসব প্রতিষ্ঠান বিশ্বকে সারিয়ে তোলার কাজ করে, তাদের সামান্য বাজেটও তারা কেড়ে নিচ্ছে। এটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ক্রমাগত সংঘাতের এই যুগে মানবজাতি আজ সত্যিই তার পথ হারিয়ে ফেলছে।
