বুকিং বাতিলের ঢেউয়ে গভীরতর সংকটে আবাসন খাত, খেলাপি ঋণ ২৬.৭%
বাংলাদেশের আবাসন বা রিয়েল এস্টেট খাত সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম গভীর মন্দার মুখে পড়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে বুকিং বাতিলের ঢেউ শুরু হয়েছে। অন্যদিকে নির্মাণ ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি, উচ্চ সুদের হার এবং বৈশ্বিক অস্থিরতা— খাতটির খেলাপি ঋণের হার প্রায় ২৭ শতাংশে ঠেলে দিয়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সংকট ডেভেলপারদের নগদ প্রবাহকে সংকুচিত করছে, প্রকল্প বাস্তবায়ন থমকে দিচ্ছে এবং এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে সংশ্লিষ্ট ডজনখানেক শিল্পে।
ডেভেলপারদের মতে, বুকিং বাতিলের প্রধান কারণ হলো অনেক বিনিয়োগকারী ও উচ্চ আয়ের ক্রেতা দেশ ছেড়ে চলে গেছেন অথবা 'অপেক্ষা করে দেখার' কৌশল নিয়েছেন। হঠাৎ এই চাহিদা কমে যাওয়ায় সেই অগ্রিম অর্থ-নির্ভর মডেল ভেঙে পড়েছে, যার ওপর নির্ভর করেই অনেক ডেভেলপার প্রকল্প অর্থায়ন করতেন।
একই সময়ে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতসহ বৈশ্বিক ধাক্কায় ইস্পাত, সিমেন্ট ও জ্বালানির মতো প্রধান নির্মাণ উপকরণগুলোর দাম বেড়েছে, যা ডেভেলপারদের ওপর আরও চাপ তৈরি করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আর্থিক চাপে পরিস্থিতির গভীরতা স্পষ্ট। ২০২৫ সালে রিয়েল এস্টেট খাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬ দশমিক ৭০ শতাংশে, যা ২০২২ সালে ছিল প্রায় ৮ শতাংশ। এটি ডেভেলপারদের ক্রমবর্ধমান আর্থিক সংকটের প্রতিফলন।
খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, বিক্রি কমে যাওয়া এবং ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বড় ও ছোট—উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠানই ব্যাংক ঋণ পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে।
গত দুই বছরে অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আবাসন খাতের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে আগের বছরের তুলনায় মোট বিক্রি ৩০-৩৫ শতাংশ কমেছে এবং ২০২৫ সালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
ঢাকায় মাঝারি মানের অ্যাপার্টমেন্টের বুকিং বছরওয়ারি ২০-২৫ শতাংশ কমেছে, আর বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের বিক্রি কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। অনেক ডেভেলপারের ক্ষেত্রে মাসিক বিক্রি পাঁচ থেকে আট ইউনিট থেকে নেমে এসেছে মাত্র এক বা দুই ইউনিটে।
গ্রিন হ্যাট রিয়েল এস্টেটের পরিচালক মেজবা উদ্দিন মারুফ বলেন, "এখন শুধু যাদের জরুরি প্রয়োজন তারাই ফ্ল্যাট কিনছে। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বেশিরভাগ মানুষ বিরত থাকছে।"
তার প্রতিষ্ঠানটির ঢাকায় বর্তমানে ৩০টির বেশি চলমান প্রকল্প রয়েছে। বিক্রি না হওয়া অবস্থায় পড়ে আছে প্রায় ২০০টি ফ্ল্যাট, যা বাজারের সামগ্রিক মন্দার প্রতিফলন।
ছোট ডেভেলপারদের ওপর বাড়তি চাপ
এই মন্দা সবচেয়ে বেশি আঘাত হেনেছে ছোট ডেভেলপারদের ওপর, যাদের অনেকেই আয় কমে যাওয়া ও ব্যয় বেড়ে যাওয়ার মধ্যে প্রকল্প টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন।
ঐশী প্রপার্টিজের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আইয়ুব আলী জানান, তার বেশ কয়েকটি প্রকল্প গুরুতর সমস্যায় পড়েছে। তিনি বলেন, "আমাদের রামপুরা প্রকল্পটি সমস্যায় আছে। যারা ফ্ল্যাট বুকিং দিয়েছিলেন তারা কিস্তি দিচ্ছেন না, আবার নতুন ক্রেতাও আসছে না। শুধু কার্যক্রম চালিয়ে রাখতে গিয়ে এরমধ্যেই আমাদের মূলধন শেষ হয়ে গেছে।"
জেসিএক্স ডেভেলপমেন্টসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রায় ১০ শতাংশ বুকিং গ্রাহক হঠাৎ উধাও হয়ে গেছেন, ফলে কিছু প্রকল্পে কাজ বন্ধ রাখতে হয়েছে। তিনি বলেন, "নির্মাণ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অন্যদিকে ফ্ল্যাট কিনতে ক্রেতার আগ্রহ কমে গেছে। ফলে অনেক অ্যাপার্টমেন্ট অবিক্রীত থাকছে।"
দেশের অন্যতম শীর্ষ ডেভেলপার শেলটেক জানিয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে তাদের প্রায় ২৫ শতাংশ বুকিং বাতিল হয়েছে এবং নতুন বিক্রি কমেছে ১৫-১৮ শতাংশ।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ বলেন, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ বিঘ্ন এই সংকটকে আরও জটিল করেছে। তিনি বলেন, "বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে ইস্পাত ও সিমেন্টের দাম বেড়েছে, আর স্থানীয় উৎপাদনকারীরাও উৎপাদন কমিয়েছে। ফলে ডেভেলপারদের বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকে কিনতে হচ্ছে।"
তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ধীরগতির পরও রূপায়ণ অ্যাসেট লিমিটেড এ বছর কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাব্বির হোসেন খান বলেন, "বছরের শুরু থেকে আমাদের বিক্রি কিছুটা বেড়েছে এবং বর্তমানে কোনো প্রকল্প বন্ধ নেই।"
তিনি জানান, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে কাঁচামালের দাম বেড়েছে, তবে বিক্রির গতি মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে। "প্রতিক্রিয়া খারাপ নয়, তবে খুব শক্তিশালীও বলা যাবে না," তিনি যোগ করেন।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান বাজারে কেবলমাত্র অনেক বেশি কমপ্ল্যায়েন্ট বড় প্রতিষ্ঠানগুলোই তুলনামূলক ভালো করছে, যেখানে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে।
অন্যদিকে, চাহিদা কম থাকলেও নতুন প্রকল্প চালুর হার দ্রুত কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে আবাসন ঘাটতির আশঙ্কা করছেন ডেভেলপাররা।
এনজেডএসি ডিজাইন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামুনুর রশীদ বলেন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে এ খাতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত ধীর হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, "অনেক বিনিয়োগকারী ও ক্রেতা অপেক্ষা করছেন। নতুন প্রকল্প কমে গেছে, যা বাজার স্বাভাবিক হলে সরবরাহ সংকট তৈরি করতে পারে।"
নির্মাণ ও অর্থায়ন ব্যয় বেড়েছে
নির্মাণ ব্যয় প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে, যার পেছনে ইস্পাত ও সিমেন্টের দাম বৃদ্ধি এবং ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (ডিএপি)সহ নিয়ন্ত্রক পরিবর্তন কাজ করেছে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সিমেন্টের দাম প্রতি ব্যাগ ৪৮০-৫২০ টাকা থেকে বেড়ে ৫২০-৫৫০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। রডের দাম প্রতি টন ৮০ হাজার টাকার নিচে থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৮ হাজার টাকায় উঠেছে।
ইস্পাত বাজারে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত দুই মাসে মাইল্ড স্টিল (এমএস) রডের দাম প্রতি টনে প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, দীর্ঘ মন্দার পর চাহিদা কিছুটা বেড়েছে, অন্যদিকে উৎপাদনকারীরা বৈশ্বিক ও স্থানীয়ভাবে স্ক্র্যাপের দাম বাড়ার কথা উল্লেখ করছেন। পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও রড উৎপাদকরা দাম বাড়িয়েছেন এবং বিভিন্ন গ্রেডের রডে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে বড় বাজারগুলোতে তীব্রভাবে দাম বাড়তেও দেখা গেছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা এই মূল্যবৃদ্ধির জন্য বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং জ্বালানি তেলের দাম বাড়াকে দায়ী করছেন।
ডেভেলপাররা আরও জানান, সুদের হার বৃদ্ধি ও ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকটের কারণে ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
একটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, "ডেভেলপাররা বড় অঙ্কের ঋণ নিয়েছেন, কিন্তু এখন অনেক প্রকল্প মাঝপথে আটকে গেছে। অন্যদিকে ঋণের সুদের চাপ বাড়ছে, ফলে একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়েছে।"
সংশ্লিষ্ট খাতের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে আবাসনে খেলাপি ঋণের হার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে—২০২২ সালে যেখানে ৭–৯ শতাংশ ছিল, ২০২৫ সালে তা ২৬ দশমিক ৭০ শতাংশে পৌঁছেছে। এর পেছনে ঋণ পুনরুদ্ধার কমে যাওয়া এবং বকেয়া ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির প্রভাব রয়েছে।
অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব
বাংলাদেশের জিডিপিতে রিয়েল এস্টেট বা আবাসন খাতের অবদান প্রায় ৮ শতাংশ। এই খাত সরাসরি প্রায় ৩৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। এছাড়া ইস্পাত, সিমেন্ট, সিরামিক ও পরিবহনসহ ২৫০টির বেশি শিল্পের সঙ্গে এ খাতের সম্পর্ক রয়েছে।
আবাসনে বর্তমান মন্দার প্রভাব ইতোমধ্যেই এসব খাতে পড়তে শুরু করেছে।
শুধু ইস্পাত উৎপাদকরাই গত তিন মাসে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার ক্ষতির কথা জানিয়েছে, আর সিমেন্ট শিল্পেও চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
নির্মাণ কার্যক্রম কমে যাওয়া এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্প স্থগিত হওয়ায়— প্রায় ৯০ শতাংশ সিমেন্ট কারখানা উৎপাদন সক্ষমতার নিচে চলছে বা উৎপাদন বন্ধ রেখেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সহ-সভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া সরকারের কাছে দ্রুত আবাসনখাতে নীতি সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন। এর মধ্যে ৩ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠন করে চলমান প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ করতে ডেভেলপারদের সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।
আবাসনখাতের ব্যবসায়ী নেতারা, সরকারের কাছে মধ্য ও নিম্ন মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের জন্য স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি আবাসন ঋণ চালু করা এবং ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার আহ্বানও জানিয়েছেন।
কিছু অংশীজনের মতে, স্বল্পমেয়াদে চাহিদা বাড়াতে অপ্রদর্শিত অর্থ (কালো টাকা) বিনিয়োগের সুযোগ দিলে সেটিও কার্যকর হতে পারে।
