যুদ্ধের শুরুতে মাত্র ৫% মিসাইল ইসরায়েলে আঘাত হানে, শেষদিকে ইসরায়েলে আঘাত হানে ২৭% মিসাইল
৪০ দিনের যুদ্ধের শেষ সপ্তাহে ইসরায়েলে ছোড়া ইরানের প্রতি চারটি ক্ষেপণাস্ত্রের একটি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করেছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজের এক বিশ্লেষণে এই তথ্য উঠে এসেছে। এতে একটি বিষয় স্পষ্ট—যুদ্ধ যত গড়িয়েছে, ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে ক্ষেপণাস্ত্র পড়ার হার ও ধ্বংসযজ্ঞ তত বেড়েছে।
যেসব ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের সুরক্ষাবলয় ভেদ করেছে, তার বেশির ভাগই ছিল ক্লাস্টার (গুচ্ছ) বোমাবাহী।
গত জুনের ১২ দিনের যুদ্ধেও ইসরায়েল এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের মুখোমুখি হয়েছিল। কিন্তু তারা এখনও এর কোনো কার্যকর সমাধান বের করতে পারেনি।
হারেৎজের হিসাব অনুযায়ী, ৪০ দিনের এই যুদ্ধে ইসরায়েলে প্রায় ৬৫০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান। ইসরায়েলের একটি নিরাপত্তা সূত্রও এই হিসাবকে বেশ নির্ভুল বলে উল্লেখ করেছে।
সব মিলিয়ে ৭৭টি ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ করে আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে ১৬টি ছিল একক ওয়ারহেড বা সাধারণ বোমাবাহী [যাতে ১০০ থেকে ৫০০ কেজি বিস্ফোরক থাকে]। এগুলোর আঘাতে ১৪ জন নিহত হন।
বাকি ৬১টি ছিল ক্লাস্টার মিসাইল বা গুচ্ছবোমা। প্রতিটি ক্লাস্টার মিসাইলের ভেতরে থাকা ছোট ছোট বোমায় কয়েক কেজি করে বিস্ফোরক থাকে, যা বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এসব গুচ্ছবোমা অন্তত ৩৮০টি জায়গায় আঘাত হেনেছে। এতে ইসরায়েলে ছয়জন এবং পশ্চিম তীরে চার ফিলিস্তিনি নারী নিহত হন। গুরুতর আহত হন অন্তত পাঁচজন।
গত জুনে ইসরায়েলে প্রায় ৫৩০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল ইরান। তখন ইসরায়েলের সুরক্ষাবলয় ভেদ করেছিল ৩৫টি ক্ষেপণাস্ত্র। তবে এর মধ্যে ৩২টিই ছিল সাধারণ বোমা এবং মাত্র তিনটি ছিল ক্লাস্টার মিসাইল।
খরচ বাঁচাতে গিয়ে বিপত্তি
ইসরায়েলের সামরিক সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক এই হামলায় ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের অনেকগুলোই ফাঁকা জায়গায় পড়েছে। তাই সেগুলো আকাশে ধ্বংস করার প্রয়োজন হয়নি।
তারা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার (ইন্টারসেপ্টর) কোনো ঘাটতি থাকার কথাও অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, যুদ্ধ দীর্ঘ হওয়ায় ইন্টারসেপ্টরের মজুত ধরে রাখতেই বেছে বেছে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার কৌশল নেওয়া হয়েছিল।
এ কারণেই 'ডেভিডস স্লিং'-এর মতো অন্যান্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে, যা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে। তবে ক্লাস্টার মিসাইল ঠেকাতে এটি খুব একটা কার্যকর নয়।
অন্যদিকে ইসরায়েলের আরেক ব্যবস্থা 'অ্যারো ৩'-ও ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু দেশটির হাতে থাকা ইন্টারসেপ্টরগুলোর মধ্যে 'অ্যারো ৩'- সবচেয়ে দামি [প্রতিটির দাম প্রায় ৩০ লাখ ডলার]। আর জুনের যুদ্ধের পর এর মজুতও বেশ কমে গেছে।
গত সেপ্টেম্বরে ইসরায়েলের চ্যানেল ১২-এর খবরে বলা হয়েছিল, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এবং ক্ষমতাসীন লিকুদ পার্টির আরেক নেতার মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে ইন্টারসেপ্টরের মজুত বাড়ানোর কাজ কয়েক মাস পিছিয়ে যায়। এ ছাড়া গত বছরের যুদ্ধে মার্কিন 'থাড' ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও অনেকটাই ফুরিয়ে যায়।
গুচ্ছবোমা ঠেকাতে কেন ব্যর্থ ইসরায়েল
সাধারণত ইরান থেকে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হলে ইসরায়েলি রাডার তা ট্র্যাক করে। যদি তা ফাঁকা জায়গার দিকে যায়, তবে তাকে পড়তে দেওয়া হয়। আর নাহলে ইন্টারসেপ্টর ছুড়ে ধ্বংস করা হয়।
কিন্তু সমস্যা হলো, আকাশে থাকা অবস্থায় ক্ষেপণাস্ত্রটিতে সাধারণ বোমা আছে নাকি গুচ্ছবোমা—তা সব সময় বোঝা যায় না। গুচ্ছবোমাগুলো সাধারণত মাটি থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার ওপরে থাকা অবস্থায় মূল ক্ষেপণাস্ত্র থেকে আলাদা হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
তাই অনেক উঁচুতে আঘাত হানতে সক্ষম 'অ্যারো' বা 'থাড' ছাড়া এগুলো ঠেকানো কঠিন। কারণ, যখন ডেভিডস স্লিং ব্যবহার করা হয়, ততক্ষণে গুচ্ছবোমাগুলো হয়তো আকাশ থেকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়া শুরু করে দেয়।
যেভাবে বেড়েছে হামলার তীব্রতা
ইসরায়েলে ঠিক কতগুলো ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে, তার একটি চিত্র পাওয়া গেছে। যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহে ছোড়া প্রায় ২২০টি ক্ষেপণাস্ত্রের মাত্র ৫ শতাংশ ইসরায়েলে আঘাত হানতে পেরেছিল। কিন্তু এই ৫ শতাংশের আঘাতেই তেল আবিব ও জেরুজালেমের কাছে ১০ জন নিহত হন।
দ্বিতীয় সপ্তাহে এসে হামলার পরিমাণ প্রায় অর্ধেক কমে যায়। কিন্তু ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার হার বেড়ে ৭ শতাংশে দাঁড়ায়। পরের দুই সপ্তাহে হামলার হার স্থিতিশীল থাকলেও আঘাত হানার হার বেড়ে যথাক্রমে ১৬ ও পরে ২৩ শতাংশে গিয়ে ঠেকে। পঞ্চম সপ্তাহে এই আঘাতের হার ছিল ১০ শতাংশ।
তবে যুদ্ধের শেষ পাঁচ দিনের চিত্র ছিল ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ। এই সময়ে ছোড়া প্রায় ৬০টি ক্ষেপণাস্ত্রের ২৭ শতাংশই ইসরায়েলের সুরক্ষাবলয় ভেদ করে আঘাত হানে। এর মধ্যে হাইফায় একটি হামলায় একই পরিবারের চারজন নিহত হন।
'ইন্টারসেপশন পলিসি' ও 'ছুরি-কাঁচির বৃষ্টি'
সামরিক কর্মকর্তারা এটিকে তাদের 'ইন্টারসেপশন পলিসি' বা কৌশলগত সিদ্ধান্ত বলে দাবি করছেন। কৌশলগত স্থাপনা ও জনসংখ্যা অধ্যুষিত এলাকা রক্ষা এবং মজুত ধরে রাখতেই এই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে তাদের ভাষ্য।
রিজার্ভ ফোর্সের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও এই বিষয়ের বিশেষজ্ঞ বলেন, 'টানা আড়াই বছরের যুদ্ধ, ইরান থেকে চার দফা সরাসরি হামলা এবং ইয়েমেন ও লেবানন থেকে ধেয়ে আসা হামলার জন্য কেউ কখনো প্রস্তুত ছিল না।'
তার ধারণা, গত আড়াই বছরে ইসরায়েলে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকশ' আকাশেই ধ্বংস করা হয়েছে।
ইসরায়েলের মূল লক্ষ্যই থাকে ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা। কোনোটি না আটকানোর সিদ্ধান্ত একদম শেষ মুহূর্তে গিয়ে নেওয়া হয়। তবে ক্লাস্টার মিসাইল বা গুচ্ছবোমার কারণে এই কৌশল বাস্তবায়ন বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে একটি গুচ্ছবোমা যেখানে আস্ত একটি ফ্ল্যাট ধ্বংস করে দিতে পারে, সেখানে কয়েকশ' কেজির সাধারণ বোমা পুরো একটি ভবন ধসিয়ে দিতে পারে।
উদ্ধারকারী বাহিনীর তথ্যের ভিত্তিতে হারেৎজের হিসাব বলছে, গুচ্ছবোমার সবচেয়ে বড় আঘাতগুলো হয়েছে তেল আবিব (৫৪টি আঘাত, ১ জন নিহত) এবং এর তিনটি শহরতলিতে। এগুলো হলো—পেতাহ তিকভা [৪৮টি আঘাত], বনেই ব্রাক [৩৬টি আঘাত, ১১ বছরের এক মেয়ে গুরুতর আহত] এবং রামাত গান [৩২টি আঘাত, ২ জন নিহত]। এসব হামলায় ভবনগুলোরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
অনেকের মতে, গুচ্ছবোমাগুলো খোলা জায়গায় পড়লেও এর প্রভাব ভয়াবহ।
ইসরায়েল পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটের প্রধান সুপারইন্টেন্ডেন্ট ডোরন লাভি বলেন, 'এগুলো প্রায় একই সময়ে এবং একসঙ্গে বিশাল এলাকাজুড়ে আঘাত হানে। বড় বোমার তুলনায় এগুলোর ধ্বংসক্ষমতা কম মনে হলেও এগুলো খুবই প্রাণঘাতী। এগুলো যখন বিস্ফোরিত হয়, তখন চারদিকে যেন ধারালো ছুরি-কাঁচির বৃষ্টি হতে থাকে।'
রিজার্ভ ফোর্সের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ২০২৪ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া আগের তিনটি সংঘাতের সঙ্গে এবারের হামলার একমাত্র পার্থক্য শুধু গুচ্ছবোমার ব্যাপক ব্যবহারই নয়। আরেকটি পার্থক্য হলো, ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরিমাণ ক্রমশ বাড়ছে।
আরেকটি বড় পার্থক্য হলো, আগের হামলাগুলোতে ইরান মূলত অবকাঠামো ও সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করত। কিন্তু জুনের যুদ্ধের শেষ দিকে এসে তারা সরাসরি জনবহুল এলাকাগুলোতে হামলা চালাতে শুরু করে। এ জন্য তারা গুচ্ছবোমাও ব্যবহার করছে।
এ বিষয়ে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চাওয়া হলে তারা হারেৎজকে আইডিএফের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলে।
আইডিএফ জানায়, 'শত্রুদের কাছে তথ্য ফাঁস এড়াতে আমরা ইন্টারসেপশন (ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের) নীতি নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলব না। তবে প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বহুস্তরের একটি প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে, যা বহু বেসামরিক মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে। আইডিএফ ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ইন্ডাস্ট্রিগুলোর সঙ্গে মিলে নিরবচ্ছিন্নভাবে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে।'
