সুয়েজ সংকটে আধিপত্য শেষ হয়েছিল ব্রিটিশদের, হরমুজে ট্রাম্পও কি একই পথে?
প্রতিটি ঘটনাকেই চরম ধ্বংসাত্মক ভাষায় তুলে ধরার একটা নেশা আছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। এ কারণেই মার্ক লেভিনের মতো রক্ষণশীল বিশ্লেষকেরা তাঁকে 'শতাব্দীর সেরা প্রেসিডেন্ট' বলে প্রশংসা করেন। কিন্তু এই বেপরোয়া খেলায় শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের পতন হতে পারে। আর তার পতন হলে খাদের কিনারে ছিটকে পড়তে পারে খোদ যুক্তরাষ্ট্রও।
সুয়েজ খাল হলো হরমুজ প্রণালির মতোই বাণিজ্যিক ও কৌশলগত দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি কৃত্রিম নৌপথ। মিসরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদেল নাসের এই খাল জাতীয়করণের ঘোষণা দিলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি ইডেন। এর কড়া জবাব দেন নাসেরও।
এরপর ব্রিটেন ও ফ্রান্স মিসরের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। 'সুয়েজ ক্যানেল ইউজার্স অ্যাসোসিয়েশন'-এর আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লন্ডন ১৫টি দেশের একটি সম্মেলনও ডাকে। কূটনীতি ব্যর্থ হতে দেখে ইডেন এমনকি নাসেরকে হত্যার কথাও ভেবেছিলেন। খালটি পুনরায় দখল এবং নাসেরকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েল যখন একটি পরিকল্পনা সাজায়, তখন হস্তক্ষেপ করে তা থামিয়ে দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট আইজেনহাওয়ার।
নানা কারণে ব্রিটেনের ওই পদক্ষেপ মানতে পারেননি আইজেনহাওয়ার। এর একটি কারণ হলো, ইউরোপের পূর্বাঞ্চলে হাঙ্গেরির একটি বিদ্রোহ নির্মমভাবে দমন করছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। ওই বড় সংঘাত থেকে নজর ঘোরানোর জন্য সুয়েজ সংকটকে একটি অপ্রয়োজনীয় বিষয় মনে করেছিলেন তিনি।
সে সময় যুক্তরাজ্যজুড়ে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। অভিজ্ঞদের কোণঠাসা করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলে জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তারা পদত্যাগ করেন। ১৯৫৬ সালের নভেম্বরে ব্রিটেন তাদের পদক্ষেপের মাধ্যমে যা প্রতিরোধ করতে চেয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তার উল্টোটাই ঘটে। জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় মিসর খালের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। ওই সংকট থেকে নাসের আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। আর মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটেনের দুর্বলতা প্রকাশ্যে চলে আসে।
ইরান সংকটও কি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এমন কিছু বয়ে আনছে? রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নাথালি তোচ্চি মনে করেন, ব্যক্তি হিসেবে ট্রাম্প হয়তো লেভিনের চোখে শতাব্দীতে একবার আসা কোনো এক ব্যতিক্রমী চরিত্র হতে পারেন। কিন্তু তিনি হলেন ভাসমান হিমশৈলের সেই চূড়া, যার মাধ্যমেই যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য কমবে।
আর যদি সত্যিই এমনটা হয়, তবে তা হবে ইতিহাসের অন্যতম বড় পরিহাস। কারণ, যে ইরানকে সাধারণত একটি রক্ষণশীল ও পিছিয়ে পড়া দেশ মনে করা হয়, সেই ইরানই হয়তো জন্ম দেবে এক নতুন যুগের।
চতুর্মুখী সংকটে ট্রাম্প
অভিবাসীদের কারণে ইউরোপের সভ্যতা হুমকির মুখে—ট্রাম্প এমন কথা বলতে খুব ভালোবাসেন। কিন্তু চলতি সপ্তাহে তিনি নিজেই হুমকি দেন, তাঁর দাবি না মানলে ৭ হাজার বছরের পুরোনো একটি সভ্যতা 'এমনভাবে ধ্বংস হবে... যা আর কখনো ফিরে আসবে না।'
তবে তিনি দ্রুতই বুঝতে পারেন, এই হুমকি বাস্তবায়ন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান ও চীনের মধ্যস্থতায় তাঁকে এই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পেতে হয়। ইরানে হামলার সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র ৮৮ মিনিট আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্ট দিয়ে তিনি পিছু হটেন।
ট্রাম্পের হুমকির জবাবে ইরান কোনোভাবেই পিছু হটতে রাজি হয়নি। এর প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে লাখ লাখ ইরানি স্বেচ্ছায় নিজেদের দেশের সেতুগুলোতে গিয়ে অবস্থান নেন। এরপর হোয়াইট হাউসে গভীর রাতে এক হুলুস্থুল পড়ে যায়। সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই ট্রাম্পের এই হঠকারী সিদ্ধান্ত থেকে সম্মানজনকভাবে সরে আসার একটা অজুহাত খুঁজতে মরিয়া হয়ে ওঠে তারা।
এদিকে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি হলেও, এটি নিশ্চিতে আসলে কী চুক্তি হয়েছে, তা নিয়ে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কারও কোনো ঐকমত্য ছিল না।
তাছাড়া, ডানপন্থীদের তীব্র সমালোচনার মুখেও পড়েছেন ট্রাম্প। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি যে বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এখন সেগুলোর কারণেই তার পুরো মেয়াদ হুমকির মুখে। এটি জেনেও ট্রাম্প নিজের ভুলের পরিণতি মেনে নিতে নারাজ। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ভুলটি ছিল ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সরল বিশ্বাসে মেনে নেওয়া। নেতানিয়াহু তাকে বলেছিলেন, এই যুদ্ধ কয়েক দিনের মধ্যেই জেতা সম্ভব।
বিশ্বজুড়ে সমালোচনার মুখে পড়ার পরও ট্রাম্প ইসরায়েলকে লেবাননে হামলা বন্ধের নির্দেশ দিতে দ্বিধা করছেন। এতেই বোঝা যায় এই দুই নেতার ভাগ্য কতটা গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তবে হোয়াইট হাউস জানে, তেহরানের ডাকে সাড়া দিয়ে এত বড় ক্ষতির শিকার হওয়ার পর হিজবুল্লাহকে এখন একা ফেলে যেতে পারবে না ইরান।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের মিত্র এখন হাতে গোনা। এর মধ্যে ইরান তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিয়া মিত্রকে কিছুতেই ছাড়তে পারে না। তাই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে এখন যুদ্ধবিরতি অথবা ইসরায়েলের মাধ্যমে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া—যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে। তিনি বলেন, 'একসঙ্গে দুটো হতে পারে না। এখন বল যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে। বিশ্ববাসী তাকিয়ে আছে তারা নিজেদের প্রতিশ্রুতি পালন করে কি না, তা দেখার জন্য।'
কাজেই ট্রাম্প এখন ফাঁদে পড়েছেন। ঠিক হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা সেই তেলের ট্যাংকারগুলোর মতো, যেগুলো পার হওয়ার জন্য ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর অনুমতির অপেক্ষায় আছে।
একপর্যায়ে ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিলেন, 'প্রণালিটা খোল, নইলে তোদের নরকে বাস করতে হবে।' তার এই দাবি কোনো কাজেই আসেনি। উল্টো নিজের জনসমর্থন কমতে দেখে ট্রাম্প নিজেই হয়তো এখন নরকযন্ত্রণা ভোগ করছেন।
বিশ্বজুড়ে বিশৃঙ্খলা
বিশ্বজুড়ে এখন যে পরিস্থিতি, সেটি দেখলেই ট্রাম্পের বর্তমান অবস্থান বোঝা যায়। যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রল পাম্পগুলোতে প্রতি গ্যালন জ্বালানির দাম ৪ ডলারে পৌঁছেছে। তেলের বাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এই ধাক্কায় বিশ্ব অর্থনীতি টালমাটাল। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বিশ্বজুড়ে প্রবৃদ্ধি কমা ও মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে।
অন্যদিকে গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিয়েল ইনস্টিটিউট বলছে, আগামী বছর রাশিয়ার কোষাগারে অতিরিক্ত ৪৫ বিলিয়ন থেকে ১৫১ বিলিয়ন ডলার যোগ হতে পারে। এতে লাভবান হবেন ভ্লাদিমির পুতিন।
উপসাগরীয় অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ও আধুনিকতার যে রূপরেখা তৈরি হয়েছিল, তা হঠাৎ করেই ভঙ্গুর মনে হচ্ছে। তরল গ্যাস শিল্পকে নতুন করে সাজাতে কাতারের বহু বছর সময় লাগবে। পর্যটন কমার আশঙ্কায় ব্রিটিশ এয়ারওয়েজও মে মাস থেকে জেদ্দায় ফ্লাইট বন্ধ করে দিচ্ছে।
ইরানের ভেতরে স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং চিকিৎসা গবেষণা কেন্দ্রগুলোতে বোমা হামলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস ইন ইরান-এর হিসাব অনুযায়ী, হামলায় মোট ৩ হাজার ৬৩৬ জন ইরানি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১ হাজার ৭০১ জনই বেসামরিক নাগরিক।
নাগরিক সাংবাদিকতার ওয়েবসাইট 'ইরানওয়্যার'-এ উঠে আসা একটি বর্ণনায় এই হামলার ভয়াবহতা ফুটে ওঠে। একজন ইরানি নারী জানান, 'আমার স্বামী পরপর ১৩টি বিস্ফোরণের শব্দ গুনেছেন। আশপাশের নারীরা চিৎকার করছিলেন, কেউ কেউ পাগলপ্রায় হয়ে গেছিলেন। চারদিকে শুধু ধুলো আর ধুলো, যেন গলা আটকে দিচ্ছিল।'
অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়েই ২০২৬ সাল শুরু করেছিল ইরান। এর ফলে দেশটিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম বড় বিক্ষোভ দেখা দেয়। তবে সরকার নির্মমভাবে সেই বিক্ষোভ দমন করে। এখন রাস্তায় শুধু সরকার-সমর্থিত দেশাত্মবোধক সংহতির সমাবেশই দেখা যায়। সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা এখন অনেকটাই কমে গেছে। আর ইরানের সরকারকেও আগের চেয়ে শক্তিশালী মনে হচ্ছে।
এত কিছুর পরও টিকে থাকতে পারায় ইরানের নেতৃত্ব বেশ উদ্যমী। তবে তারা এখন অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে কোনো ভুল চাল চালতে পারে বলে একটা ঝুঁকি রয়েছে। ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভাদ জারিফ সম্প্রতি 'ফরেন অ্যাফেয়ার্স' সাময়িকীতে একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে তেহরানের উচিত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করা। সেই সঙ্গে বিদ্যমান পারমাণবিক উপকরণের মজুত কমানো, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম একটি নতুন বহুপক্ষীয় কনসোর্টিয়ামে স্থানান্তর করা এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া উচিত।
তার এই পরিকল্পনাকে সমর্থন জানিয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি। তবে রক্ষণশীল গণমাধ্যম ও কট্টরপন্থীরা এর তীব্র সমালোচনা করেছেন।
ইউরোপীয় দৃষ্টিকোণ
যুক্তরাষ্ট্র এমন অদক্ষতা ও বেপরোয়া আচরণ দেখানোর পর ইউরোপ এখন মার্কিন জোট টিকিয়ে রাখার বিষয়ে নতুন করে ভাবছে। স্বল্পমেয়াদে হলেও ইউরোপের ক্ষুব্ধ হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এরই মধ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করেছেন। ইউরোপকে পারমাণবিক আলোচনা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। যে যুদ্ধের জন্য তাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করা হয়নি এবং যাকে তারা প্রয়োজনীয় বলে মনে করেনি, স্বভাবতই সেই যুদ্ধে তারা সমর্থন দিতে অস্বীকার করে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের পাশে না থাকায় ট্রাম্প বারবার ইউরোপকে দোষারোপ করেছেন।
তবে ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইউরোপের ভেতরে যে বিভাজন তৈরি হয়েছিল, এবার তা হয়নি। উল্টো সে সময় জর্জ ডব্লিউ বুশকে সবচেয়ে বেশি সমর্থন দেওয়া ইউরোপের দুই দেশ ব্রিটেন ও স্পেন এই যুদ্ধের স্পষ্ট বিরোধিতা করেছে।
সম্প্রতি পলিটিকোর একটি জরিপের ফল প্রকাশ পেয়েছে। গত মার্চে পোল্যান্ড, স্পেন, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালিতে এই জরিপ করা হয়। জরিপে দেখা যায়, এই দেশগুলোর মাত্র ১২ শতাংশ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রকে ঘনিষ্ঠ মিত্র মনে করে। আর ৩৬ শতাংশ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি হিসেবে দেখছে। বিপরীতে, এই ছয়টি দেশের ২৯ শতাংশ মানুষ চীনকে হুমকি মনে করে। ন্যাটোর মাধ্যমে যে জোট প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে, তার জন্য শুধু হোয়াইট হাউস নয়, ইউরোপের জনগণের সম্মতিও প্রয়োজন।
