ইরানের নতুন নিরাপত্তা প্রধান জোলকাদরের নিয়োগ যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ
ইরান গত মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) আলী লারিজানির উত্তরসূরি হিসেবে মোহাম্মদ বাকের জোলকাদরকে দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এসএনএসসি) প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এর আগে গত সপ্তাহে এক বিমান হামলায় লারিজানি নিহত হন।
ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ একটি পদের জন্য নির্বাচিত জোলকাদরকে একটি জটিল নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে, যা ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের সামরিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে।
আল জাজিরার প্রতিনিধি সুহায়েব আলআসা জোলকাদরকে একজন 'নিরাপত্তা জগতের প্রভাবশালী ব্যক্তি' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি সাবেক ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) কমান্ডার এবং ২০২৩ সাল থেকে উপদেষ্টা সংস্থা এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিলের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার এই অভিজ্ঞতা তাকে ইরানের নিরাপত্তা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর গঠিত আইআরজিসি-র প্রথম প্রজন্মের সদস্য হিসেবে জোলকাদর ইরান-ইরাক যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি আট বছর আইআরজিসি-র জয়েন্ট স্টাফ প্রধান এবং আরও আট বছর সংস্থাটির ডেপুটি কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে দায়িত্ব পালনসহ ধারাবাহিকভাবে বেশ কিছু উচ্চপদস্থ সামরিক ও নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। এরপর তিনি উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ও বিচার বিভাগীয় পদে আসীন হন।
আলআসা বলেন, 'তার এই দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়টি তেহরানের এমন একজনের প্রয়োজনীয়তাকে প্রতিফলিত করে যিনি লারিজানির রেখে যাওয়া শূন্যতা পূরণ করতে সক্ষম। লারিজানি দীর্ঘকাল ধরে শাসনব্যবস্থার মধ্যে একজন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিলেন। তার স্থলাভিষিক্ত হওয়া কখনোই সহজ ছিল না।'
সেই প্রেক্ষাপটে, জোলকাদরের নিয়োগকে বর্তমান যুদ্ধের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা উচিত নয়, বরং এটি এমন একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফলাফল যার মাধ্যমে এমন সংবেদনশীল ভূমিকার জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ গুণাবলি সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা হয়েছে।
চ্যালেঞ্জসমূহ
এসএনএসসি নেতৃত্ব পদের জন্য এমন একজন ব্যক্তির প্রয়োজন যিনি নিরাপত্তা বিষয়ক দক্ষতার সাথে কৌশলগত পোর্টফোলিওগুলো পরিচালনা করার ক্ষমতা সম্পন্ন। ইরানের কট্টরপন্থীরাও জোলকাদরকে তার শক্তিশালী সামরিক দক্ষতার কারণে লারিজানির তুলনায় দেশটির বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি সামলানোর জন্য বেশি যোগ্য হিসেবে দেখতে পারেন। এই যুদ্ধ জোলকাদরের সামনে বেশ কিছু তাৎক্ষণিক পরীক্ষা হাজির করেছে।
তেহরান এবং ইসফাহানের মতো বড় শহরগুলো ছাড়াও বিশেষ করে পশ্চিম এবং উত্তর-পশ্চিম ইরান—বিশেষত দেশের পশ্চিম সীমান্তের কাছে অবস্থিত পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশকে লক্ষ্য করে দেশজুড়ে হামলা অব্যাহত রয়েছে। এসব হামলা ভেতর থেকে দেশকে অস্থিতিশীল করার প্রচেষ্টার বিষয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষ বিদেশি শত্রুর প্রতি সহযোগিতার অভিযোগে শত শত মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি সম্ভাব্য নিরাপত্তা লঙ্ঘন প্রতিরোধের একটি প্রচেষ্টার অংশ। এটি চলতি বছরের শুরুর দিকে ঘটে যাওয়া একটি প্রতিবাদ আন্দোলনের পর করা হলো, যাতে হাজার হাজার ইরানি নাগরিকের মৃত্যু হয়েছিল।
অন্যদিকে, তেহরান পুরো অঞ্চলজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রেখেছে। ইরানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আশা করছে যে, এসব হামলার মাধ্যমে এই বার্তা দেওয়া যাবে যে তারা ইসরায়েলি ভূখণ্ডের ভেতরের লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে সক্ষম।
ইরান হরমুজ প্রণালিতে তাদের চাপ তৈরির চেষ্টা অব্যাহত রাখারও আশা করছে, যেখানে জাহাজ চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এটি ইতোমধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে এবং তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, এই ঘটনাপ্রবাহ একটি জটিল পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করে যা বাহিরের সামরিক চাপের সাথে ভেতরের নিরাপত্তা বজায় রাখার প্রচেষ্টাকে এক করে দিয়েছে।
এটি জোলকাদরকে তার ভারসাম্য রক্ষার ক্ষমতার একটি প্রাথমিক পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। এছাড়া যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যেকোনো আলোচনাতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।
তেহরান থেকে আল জাজিরার আলী হাশেম রিপোর্ট করেছেন, 'জোলকাদরের নিয়োগ ইঙ্গিত দেয় যে ইরানের নেতৃত্ব জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আরও সামরিক স্তর যুক্ত করার চেষ্টা করছে।' তিনি আরও যোগ করেন, 'একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আলোচনার টেবিলে যিনিই বসুন না কেন, কোনো কিছু পাস করার আগে তাকে জোলকাদরের অনুমোদন নিতে হবে।'
