ইরান যুদ্ধ থামাতে উপসাগরীয় তেল উৎপাদকদের হাতে ‘নিউক্লিয়ার অপশন’ কী
হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উপসাগরীয় তেল উৎপাদক দেশগুলোর কাছে হঠাৎ করেই মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধে বিশাল কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের একটি সুযোগ এসেছে। প্রতিদিন প্রায় দেড় কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি কার্যত আটকে পড়ায়, গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি)ভুক্ত দেশগুলো এক ধরনের 'জ্বালানির নিউক্লিয়ার অপশন' প্রয়োগ করতে পারে—যেখানে তারা তেল ও গ্যাস রপ্তানিতে ফোর্স মাজ্যুর ঘোষণা দিয়ে বৈশ্বিক সরবরাহের আরও ২০ শতাংশ বাজার থেকে সরিয়ে নিতে পারে।
ফোর্স মাজ্যুর ধারা অনুযায়ী প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ বা মহামারির মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা পরিস্থিতিতে চুক্তিবদ্ধ কোনো পক্ষকে চুক্তির বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
মিডল ইস্ট আই-এ প্রকাশিত একটি মতামত নিবন্ধে বলা হয়েছে, এমন পদক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক ধাক্কা সৃষ্টি করবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ইরানের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক অভিযানের কৌশল পুনর্বিবেচনায় বাধ্য করবে।
গেল সপ্তাহান্তে কার্যত অচল হয়ে পড়ে হরমুজ প্রণালি। জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, শনিবার কোনো বাণিজ্যিক জাহাজ এই জলপথ দিয়ে চলাচল করেনি। যুদ্ধ শুরুর পর যেখানে প্রতিদিন গড়ে ২.৬টি এবং সংঘাতের আগে প্রায় ১৩৫টি জাহাজ চলাচল করত, সেখানে এই সংখ্যা শূন্যে নেমে আসে।
এই পরিস্থিতিতে ইউরোপে জরুরি কূটনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে। সোমবার ইউরোপের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠকে বসে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজকে নৌবাহিনীর পাহারায় সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টি আলোচনাও করেছেন।
হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৪৮ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানির পথ না থাকায় এসব চালান আটকে আছে। এতে প্রতিদিন প্রায় ১২০ কোটি ডলার রপ্তানি আয় হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেল ও গ্যাস খাতে ক্ষতির পরিমাণ ১৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জিসিসি জোটে রয়েছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান এবং বাহরাইন।
উপসাগরীয় তেল উৎপাদকারী দেশগুলো মনে করতে পারে, বৈশ্বিক তেলের সরবরাহ আরও ২০ শতাংশ কমিয়ে দিলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ইরানের ওপর হামলা বন্ধ করতে বাধ্য করা সম্ভব হবে। বর্তমানে এই দুই দেশের যুদ্ধ থামানোর তেমন প্রণোদনা নেই। ইসরায়েল তার মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভর করছে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন, তিনি এখনো "বিজয় ঘোষণা করতে প্রস্তুত নন" কিংবা বর্তমান আলোচনার শর্ত মেনে নিতে রাজি নন।
এই অবস্থায়, যদি জিসিসিভুক্ত দেশগুলো একযোগে তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেয়, তাহলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দেবে এবং শক্তির ভারসাম্য হঠাৎ করে তাদের পক্ষে চলে যাবে। এতে যুদ্ধরত দেশগুলোকে তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনায় বাধ্য হতে পারে।
ফোর্স মাজ্যুর ঘোষণার জন্য জিসিসি দেশগুলোর যুক্তিও রয়েছে। ২ মার্চ ইরানের ড্রোন হামলার জেরে সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি আরামকোর রাস তানুরা রিফাইনারির দৈনিক সাড়ে ৫ লাখ ব্যারেল পরিশোধন সক্ষমতা বন্ধ হয়ে যায়। সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুটি ড্রোন ভূপাতিত করলেও, ধ্বংসাবশেষ পড়ে স্থাপনাটিতে আগুন ধরে যায়।
আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হলেও সৌদি আরব এই যুদ্ধের বড় অর্থনৈতিক চাপ বহন করছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই তেল উৎপাদক দেশটি ইতোমধ্যে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার সম্ভাব্য রাজস্ব হারিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, কাতার ইতোমধ্যে তাদের এলএনজি উৎপাদনে ফোর্স মাজ্যুর ঘোষণা করেছে। ২ মার্চ ইরানের ড্রোন হামলার পর কাতারএনার্জি রাস লাফান ও মেসাইয়িদ শিল্পনগরীতে এলএনজি উৎপাদন বন্ধ করে দেয়, যা বৈশ্বিক তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ কমিয়ে দেয়।
রাস লাফান শিল্পনগরী কাতারের এলএনজি কার্যক্রমের প্রধান কেন্দ্র এবং এটি বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানি কমপ্লেক্স হিসেবে পরিচিত। এখানে ১৪টি এলএনজি ইউনিট রয়েছে, যার বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৭ কোটি ৭০ লাখ মেট্রিক টন।
তবে এমন কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আর্থিক সক্ষমতা জিসিসি দেশগুলোর রয়েছে। তাদের সার্বভৌম সম্পদ তহবিলগুলো বিশ্বের বৃহত্তমগুলোর মধ্যে অন্যতম, যেগুলো সম্মিলিতভাবে প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ পরিচালনা করে, যা এধরনের বৈশ্বিক তহবিলের প্রায় ৪০ শতাংশ।
সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (পিআইএফ) বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম সার্বভৌম তহবিল, যার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১.১৫ ট্রিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে আবুধাবি ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি প্রায় ১.১ ট্রিলিয়ন ডলার এবং কুয়েত ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি ১ ট্রিলিয়নের বেশি সম্পদ ব্যবস্থাপনা করে।
সাধারণত তেলের দাম বাড়লে সৌদি আরবসহ পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়। প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়ালে এসব দেশের রাজস্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বিশেষ করে, সৌদি আরব তার "ভিশন ২০৩০" কর্মসূচির জন্য তেলের উচ্চ দামের ওপর নির্ভর করছে।
তবে বর্তমান সংকট পরিস্থিতি ভিন্ন চিত্র তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিপুল পরিমাণ তেল আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে পারছে না। ফলে তেলের দাম বাড়লেও উৎপাদকরা সেই সুবিধা পুরোপুরি নিতে পারছে না।
যদি চলমান যুদ্ধের দ্রুত সমাধান না হয়, তাহলে জিসিসি দেশগুলো বড় অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত ৩ থেকে ৬ মাস চললে উপসাগরীয় অঞ্চলের জিডিপি ২২ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
এসব দেশের কাছে স্বল্পমেয়াদে সংকট মোকাবিলার জন্য বড় তহবিল থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে তাদের ওপর তীব্র আর্থিক চাপ তৈরি হবে এবং চলতি হিসাবের ঘাটতিও বাড়বে।
