উপসাগরীয় দেশগুলোর পানি সরবরাহে হুমকি, খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে উপসাগরীয় দেশগুলো তেল ও গ্যাস উৎপাদন বন্ধ করে দিচ্ছে। তবে কেবল জ্বালানি অবকাঠামোই নয়, ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকিতে এখন তাদের খাদ্য ও পানির নিরাপত্তাও পড়েছে।
পারস্য উপসাগরের উপকূলজুড়ে ৪০০-এর বেশি পানি লবণমুক্তকরণ (ডিস্যালিনেশন) প্ল্যান্ট রয়েছে। এসব স্থাপনায় উৎপাদিত মিঠা পানি শিল্পকারখানা সচল রাখা থেকে শুরু করে উদ্যান, পর্যটক শিল্প এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের পানির চাহিদা মেটাতে ব্যবহৃত হয়।
জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর ওয়াটার, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হেলথ-এর মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক প্রধান মোহাম্মদ মাহমুদ মিডল ইস্ট আইকে বলেন, "ইরান যদি এসব স্থাপনায় হামলা শুরু করে, তা হলে পরিস্থিতি হবে ভয়াবহ। উপকূলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এসব অবকাঠামো খুবই ঝুঁকিতে রয়েছে।"
কিছু উপসাগরীয় দেশ—যেমন সৌদি আরব—একসময় ভূগর্ভস্থ বিপুল পরিমাণ মিঠাপানি উত্তোলনের ওপর নির্ভর করত। কিন্তু বড় বৈশ্বিক অর্থনীতি ও প্রবাসী শ্রমিকনির্ভর কেন্দ্রে রূপান্তরের সময় সেই পানির ভাণ্ডার দ্রুত শেষ হয়ে যায়। এরপর ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে বিপুল সংখ্যায় ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট নির্মাণের উদ্যোগ নেয় রিয়াদ।
বিশ্বব্যাপী পানি লবণমুক্তকরণ সক্ষমতার প্রায় ৬০ শতাংশই উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত। পৃথক দেশভিত্তিক হিসাব করলে নির্ভরতার মাত্রা আরও স্পষ্ট হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতে সুপেয় পানির ৪২ শতাংশ আসে ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট থেকে; কুয়েতে ৯০ শতাংশ; ওমানে ৮৬ শতাংশ; আর সৌদি আরবে ৭০ শতাংশ।
এই অঞ্চলের ভূরাজনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা এক উপসাগরীয় বিশ্লেষক মিডল ইস্ট আইকে বলেন, কিছু দেশ কৌশলগত মজুত তৈরি করেছে। তবে কাতার ও বাহরাইনের মতো ছোট দেশগুলোর ক্ষেত্রে যদি তাদের ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে কয়েক দিনের মধ্যেই সেই মজুত ফুরিয়ে যেতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই বিশ্লেষক বলেন, "এই অর্থনীতিগুলো কতটা পানি-নির্ভর তা কল্পনাও করা কঠিন—বিশেষ করে যখন বসন্ত ও গ্রীষ্মকাল শুরু হচ্ছে। এসব স্থাপনায় হামলা হলে তাদের কাছে কোনো সুস্পষ্ট বিকল্প পরিকল্পনা নেই।"
উপসাগরীয় দেশগুলোর শিল্পে বিপুল পানির ব্যবহার
২০০৮ সালে ফাঁস হওয়া একটি কূটনৈতিক বার্তায় সৌদি আরবে মার্কিন দূতাবাস জানায়, দেশটির জুবাইল ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট একাই রাজধানী রিয়াদের সুপেয় পানির ৯০ শতাংশের বেশি সরবরাহ করত। গত ২০ বছরে উপসাগরীয় দেশগুলো আরও অনেক প্ল্যান্ট নির্মাণ করে সরবরাহে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করেছে, কিন্তু এখনও এসব স্থাপনার ওপর নির্ভরতা প্রায় একই রয়ে গেছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর পেট্রোকেমিক্যাল রিফাইনারি এবং সংশ্লিষ্ট উৎপাদন শিল্পেও বিপুল পরিমাণ মিঠাপানির প্রয়োজন হয়।
মোহাম্মদ মাহমুদ বলেন, "পানি ব্যবহারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মানুষের জন্য সুপেয় পানি সরবরাহ। কিন্তু মোট ব্যবহারের তুলনায় সেটাই সবচেয়ে কম। শিল্প ও কৃষিতে এর ব্যবহার অনেক বেশি। আর উপসাগরীয় অঞ্চলের শিল্পখাত অত্যন্ত পানি-নির্ভর।"
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনো পর্যন্ত ইরান উপসাগরের ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টগুলোকে লক্ষ্যবস্তু না বানানো থেকে বোঝা যায় যে ইসলামি প্রজাতন্ত্র কিছুটা সংযম দেখাচ্ছে।
যুদ্ধ যত এগোচ্ছে, ততই পরিষ্কার হচ্ছে যে ইরান অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন করছে—যার মধ্যে রয়েছে মার্কিন রাডার স্থাপনা, কূটনৈতিক কমপাউন্ড এবং জ্বালানি অবকাঠামো। শুক্রবার ইরানের হামলায় বাহরাইনের বৃহত্তম তেল শোধনাগারে আগুন ধরে যায়।
নেদারল্যান্ডসের লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তা বিষয়ক গবেষক ক্রিশ্চিয়ান হেন্ডারসন বলেন, "এই মুহূর্তে ইরানের কৌশল মনে হচ্ছে উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালিয়ে অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়ানো। তারা চাইলে খুব সহজেই ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টগুলোতে হামলা করতে পারে, কিন্তু সেটি হলে পরিস্থিতি অনেক বেশি উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠবে।"
উপসাগরীয় দেশগুলো সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় অংশ নেবে—সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এমন আলোচনা অনেকটাই স্তিমিত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, পানির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তাদের উত্তেজনা বাড়াতে নিরুৎসাহিত হওয়ার একটি কারণ হতে পারে।
এদিকে হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান বিভিন্ন সময়ে পরস্পরবিরোধী বার্তা দিয়েছে। বাহরাইন, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত জ্বালানি রপ্তানি এবং খাদ্য ও অন্যান্য পণ্য আমদানির জন্য এই সংকীর্ণ জলপথের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
বাস্তবে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে পশ্চিমা বীমা কোম্পানিগুলো যুদ্ধঝুঁকি কাভারেজ দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। ফলে একান্তই সাহদ দেখানো কিছু জাহাজ মালিকসংস্থা ছাড়া অন্যরা এই পথে চলাচল করতে চাইছে না, যা কার্যত প্রণালিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং আকাশপথে চলাচলে ব্যাপক বিঘ্নের ফলে উপসাগরীয় অঞ্চল খাদ্যসংকটের ঝুঁকিতেও পড়তে পারে।
হেন্ডারসন বলেন, "কিছু উপসাগরীয় দেশের খাদ্যের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই আমদানি করতে হয়। তাদের পুরো অর্থনৈতিক কাঠামোই আমদানিনির্ভর। সমুদ্রপথ ও বন্দর বন্ধ হয়ে গেলে তা সরবরাহ ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে।"
অর্থনৈতিক কাঠামোতে চাপ
তিনি বলেন, "সরকারগুলো পরিস্থিতি ঠেকাতে কাজ করছে, কিন্তু আতঙ্কে মানুষ পণ্য মজুত করতে শুরু করবেই। তবে এটাও ঠিক যে উপসাগরীয় দেশগুলো—বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত—তিন থেকে ছয় মাসের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক পণ্যসামগ্রীর মজুত গড়ে তুলেছে।"
উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের খাদ্য আমদানির বড় অংশের জন্য আকাশপথে পরিবহনের ওপর নির্ভর করে। যদিও কেউ কেউ উল্লেখ করেন যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব শক্তিশালী কৃষিখাত গড়ে তুলেছে—বিশেষ করে দুগ্ধ খাতে তারা আঞ্চলিক কেন্দ্র। তবে এসব খামারের গবাদিপশু আবার আমদানিকৃত পশুখাদ্যের ওপর নির্ভরশীল। যেমন সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্য থেকে পশুখাদ্যের জন্য প্রচুর আলফালফা আমদানি করে।
ইরানের হামলার পর সংযুক্ত আরব আমিরাত দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পুনরায় চালুর চেষ্টা করছে। যদিও যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশের আকাশসীমা এখনও বন্ধ রয়েছে। ফলে কার্গো ফ্লাইটও ব্যাহত হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের খাদ্যপণ্যকে সৌদি আরব ও ওমানের এমন কিছু বন্দরের মাধ্যমে আনতে হবে, যেগুলো তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হেন্ডারসন বলেন, "শিপিং ও বীমা ব্যয় বেড়ে গেলে তার প্রভাব পড়বে খাদ্যদ্রব্যের দামে। সবকিছু যদি ওমানের সোহর ও সৌদি আরবের জেদ্দা বন্দরের মাধ্যমে ঘুরিয়ে আনতে হয়, তাহলে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস করতে হবে।"
উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ—বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত—এশিয়া ও আফ্রিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ট্রান্সশিপমেন্ট ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠেছে। ইরান সরাসরি লক্ষ্যবস্তু না করলেও যুদ্ধ তাদের এই ব্যবসায়িক মডেলকে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে, দুবাইভিত্তিক আল খালিজ সুগার বিশ্বের বৃহত্তম বন্দরনির্ভর চিনি পরিশোধনাগারের মালিক। প্রতিষ্ঠানটি বছরে প্রায় ১৬ লাখ মেট্রিক টন কাঁচা চিনি আমদানি করে এবং প্রায় ১৩ লাখ টন পরিশোধিত চিনি রপ্তানি করে।
তবে আল খালিজ সুগার বৃহস্পতিবার রয়টার্সকে জানিয়েছে, তাদের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে এবং তাদের কাছে দুই বছরের কাঁচামালের মজুত রয়েছে।
