ইরাক-ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতোই অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ: জরিপ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুরু করা ইরান যুদ্ধ আমেরিকানদের কাছে চরম অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ২০০৬ সালের চরম সহিংসতার সময় ইরাক যুদ্ধ বা সত্তরের দশকের শুরুর দিকে ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে আমেরিকানদের যেমন বিরক্তি ছিল, ইরান যুদ্ধ নিয়েও ঠিক তেমনই নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে।
ওয়াশিংটন পোস্ট, এবিসি নিউজ ও ইপসোস-এর যৌথ জনমত জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে। সামরিক অভিযানের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট ও সন্ত্রাসবাদের আশঙ্কার কারণেই মূলত এই নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
জরিপ অনুযায়ী, ৬১ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করা একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। প্রতি ১০ জনের মধ্যে মাত্র ২ জন মনে করেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ সফল হয়েছে। আর ৪০ শতাংশ মানুষ একে সরাসরি ব্যর্থ বলেছেন। বাকি ৪০ শতাংশের মতে, এই বিষয়ে মন্তব্য করার সময় এখনো আসেনি।
জরিপের এই ফলাফল এমন এক সময়ে এল, যখন হোয়াইট হাউস প্রমাণ করার চেষ্টা করছে যে ডেমোক্র্যাটদের আমলের চেয়ে ট্রাম্পের শাসনামলেই আমেরিকানরা বেশি ভালো আছেন।
তবে রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যে এই যুদ্ধের প্রতি সমর্থন এখনো বেশ জোরালো। তাদের ৭৯ শতাংশ মনে করেন এটি সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের প্রতি সহানুভূতিশীল স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে এ নিয়ে বিভক্তি রয়েছে—৫২ শতাংশ এটিকে সঠিক সিদ্ধান্ত বললেও, ৪৬ শতাংশ মনে করেন এটি ভুল ছিল।
তবে যুদ্ধ নিয়ে সংশয় থাকলেও আমেরিকানরা ইরানের ওপরও খুব একটা ভরসা করতে পারছেন না। এখনই একটি শান্তি চুক্তি মেনে নেওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে বিভক্তি রয়েছে। ৪৮ শতাংশ চান, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শর্ত কিছুটা খারাপ হলেও ইরানের সঙ্গে শান্তি চুক্তি হোক। অন্যদিকে ৪৬ শতাংশ চান, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভালো শর্ত আদায় করতে প্রয়োজনে আবার সামরিক অভিযান শুরু করা হোক।
এই বিষয়ে ডেমোক্র্যাটদের ৭৬ শতাংশ এবং স্বতন্ত্র ভোটারদের ৫০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কিছুটা খারাপ চুক্তি হলেও শান্তি চান। কিন্তু রিপাবলিকানদের ৭৯ শতাংশই চান, প্রয়োজনে আবার যুদ্ধ শুরু করে হলেও একটি ভালো চুক্তি আদায় করা হোক।
গত ৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির আগে ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, 'ইরান চুক্তিতে না এলে আজ রাতেই পুরো একটি সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে, যা আর ফেরানো যাবে না।' তার এই মন্তব্য আমেরিকানদের কাছে চরম অজনপ্রিয় ছিল। মাত্র ২১ শতাংশ মানুষ এই মন্তব্যের পক্ষে ছিলেন, আর ৭৬ শতাংশই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। এই মন্তব্য রিপাবলিকানদের মধ্যেও বিভক্তি তৈরি করেছে।
ইরাক ও ভিয়েতনামের সঙ্গে তুলনা
ইরাক ও ভিয়েতনাম যুদ্ধের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ওই দুটি যুদ্ধও আমেরিকানদের বিভক্ত করেছিল এবং শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতা হিসেবেই বিবেচিত হয়েছিল।
২০০৩ সালের মার্চে শুরু হওয়া ইরাক যুদ্ধ নিয়ে আমেরিকানদের যে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হতে কয়েক বছর সময় লেগেছিল, ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে তা মাত্র দুই মাসেই তৈরি হয়েছে। গ্যালপ জরিপ অনুযায়ী, ২০০৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে ৫৯ শতাংশ আমেরিকান বলেছিলেন যে ইরাক যুদ্ধ একটি ভুল ছিল। সত্তরের দশকের শুরুর দিকে ভিয়েতনাম যুদ্ধ সম্পর্কেও প্রায় একই সংখ্যক মানুষ একই কথা বলেছিলেন।
তবে আগের ওই যুদ্ধগুলোতে আমেরিকানদের হতাহতের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। ১৯৭১ সাল নাগাদ ভিয়েতনামে ৫০ হাজারেরও বেশি আমেরিকান নিহত হয়েছিলেন। তখন গ্যালপ জানিয়েছিল, ৬১ শতাংশ আমেরিকান সেখানে সেনা পাঠানোকে ভুল বলে মনে করেন। একইভাবে, ২০০৬ সালের এপ্রিলে ওয়াশিংটন পোস্ট-এবিসি নিউজের এক জরিপে দেখা যায়, ৫৯ শতাংশ আমেরিকান ইরাক যুদ্ধকে ভুল বলছেন। ওই সময় পর্যন্ত সেখানে ২ হাজার ৪০২ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছিলেন।
অন্যদিকে, ইরান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১৩ জন মার্কিন সেনার মৃত্যুর খবর দিয়েছে পেন্টাগন। তা সত্ত্বেও যুদ্ধটি এত অজনপ্রিয় হয়ে ওঠা বেশ বিস্ময়কর।
ট্রাম্পের এই যুদ্ধের প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা। কিন্তু আমেরিকানরা বিশ্বাস করেন না যে এই যুদ্ধ সেই লক্ষ্য অর্জনে সফল হবে। ৬৫ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন, যুদ্ধ শেষ করবার কোনো চুক্তিই ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে আটকাতে পারবে না। ২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসনের করা চুক্তির সময়ও ৬৪ শতাংশ মানুষ একই কথা বলেছিলেন।
তবে ট্রাম্প বৃহস্পতিবার দাবি করেন, শিগগিরই একটি চুক্তি হবে। তিনি বলেন, 'ইরান চুক্তি করতে মরিয়া হয়ে আছে। আমি শুধু এটুকু বলতে পারি, তাদের হাতে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকতে পারবে না।'
২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে বিদেশি যুদ্ধ থেকে দূরে রাখবেন। তাই হঠাৎ করে ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত অনেক আমেরিকানকে অবাক করেছে। মাত্র ২২ শতাংশ মনে করেন, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ তার প্রচারণার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। ৪৬ শতাংশ একে অসঙ্গতিপূর্ণ বলছেন এবং ৩০ শতাংশ এ বিষয়ে নিশ্চিত নন।
এই যুদ্ধ ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা মোতায়েনের কঠোর সমালোচকদের একজন ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স । তিনিও বুধবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডার ফুরিয়ে যাওয়ার খবরে নিজের উদ্বেগের কথা স্বীকার করেন তিনি। তবে প্রশাসনের ভেতরে মতবিরোধের কথা অস্বীকার করেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট।
অর্থনৈতিক ধাক্কা ও বদলে যাওয়া জীবনযাত্রা
ট্রাম্প বৃহস্পতিবার জানান, ইরানে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ঠেকাতে যে স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে, তা মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবে আমেরিকানদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ইতোমধ্যে বদলাতে শুরু করেছে। ৬০ শতাংশ মানুষ মনে করেন, এই সামরিক অভিযানের কারণে মন্দার ঝুঁকি বেড়েছে।
প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৪ জনেরও বেশি মানুষ জানিয়েছেন, গ্যাসের বাড়তি দামের কারণে তারা গাড়ি চালানো কমিয়ে দিয়েছেন এবং সংসারের খরচ কাটছাঁট করেছেন। ৩ জনের বেশি মানুষ জানিয়েছেন, তারা ভ্রমণের পরিকল্পনা বাতিল করেছেন। সব মিলিয়ে ১০ জনের মধ্যে ৬ জনই অন্তত একটি ক্ষেত্রে এই প্রভাব টের পেয়েছেন।
খুব কম আমেরিকানই আশা করেন যে আগামী এক বছরের মধ্যে গ্যাসের দাম কমবে। এটি রিপাবলিকানদের জন্য একটি বড় সতর্কসংকেত। কারণ তারা আশা করছে, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই মানুষ এই অর্থনৈতিক কষ্ট ভুলে যাবে। তবে অর্ধেক আমেরিকানই মনে করেন, আগামী এক বছরে গ্যাসের দাম আরও বাড়বে।
যেসব মানুষ 'আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়ছেন' বলে মনে করেন, ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত তাদের হার ১৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আর 'আর্থিকভাবে খারাপ অবস্থায়' আছেন—এমন মানুষের সংখ্যা ট্রাম্প ক্ষমতা নেওয়ার সময়কার তুলনায় ৩৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশ হয়েছে।
আমেরিকানরা আরও ভয় পাচ্ছেন যে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ তাদের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। ৬১ শতাংশ মনে করেন, ইরানে সামরিক অভিযানের ফলে আমেরিকানদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঝুঁকি বেড়েছে। ২০২০ সালে ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের শীর্ষ সামরিক নেতা কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার পরও ৪৮ শতাংশ মানুষ একই কথা বলেছিলেন।
এ ছাড়া ৫৬ শতাংশ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এসব পদক্ষেপের ফলে মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে। কারণ ইরান যুদ্ধের কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তোলায় ট্রাম্প ইউরোপীয় মিত্রদের তীব্র সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে ইরানের পাল্টা হামলার শিকার হয়েছে পারস্য উপসাগরীয় মিত্ররা।
এদিকে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইরানের সঙ্গে বর্তমান অচলাবস্থা দীর্ঘ মেয়াদে চলতে পারে। বুধবার তিনি বলেন, 'ইরানের নেতারা নতি না স্বীকার করা পর্যন্ত আমি ছাড়ব না।' তিনি আরও বলেন, 'তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না—এমন চুক্তিতে রাজি না হওয়া পর্যন্ত কোনো মীমাংসা হবে না।'
অন্যদিকে ইরানি নেতারা চান, আগে যুদ্ধ শেষ এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি প্রাথমিক চুক্তি হোক। এরপরই তারা পারমাণবিক বিষয়ে আলোচনায় বসতে চান। যদিও তারা দাবি করেন, তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না।
আপাতত এই দুই দেশের মধ্যে মুখোমুখি আলোচনার সম্ভাবনা গত বুধবার ট্রাম্প নাকচ করে দিয়েছেন। এপ্রিলে প্রথম দফার আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই ভেস্তে যাওয়ার পর তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন। যদিও পরে তিনি অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধ স্থগিত করেছেন।
