নিজ আবিষ্কারই মৃত্যু ডেকে আনে যে ৮ উদ্ভাবকের
দুর্ভাগ্যবশত, সবাই টমাস এডিসন বা জর্জ স্টিফেনসনের মতো সফল হতে পারেন না। বেশির ভাগ উদ্ভাবকই এমন কিছু আবিষ্কারের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন যা বিশ্বকে বদলে দিয়েছে এবং আমাদের জীবনকে করেছে আরও উন্নত। তবে এর উল্টো চিত্রও আছে। এমন কয়েকজন উদ্ভাবক ছিলেন যাদের আবিষ্কার এতটাই ত্রুটিপূর্ণ বা বিপজ্জনক ছিল যে, তা শুধু ব্যর্থই হয়নি, বরং খোদ উদ্ভাবকের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
নিজেদের আবিষ্কারের কারণেই প্রাণ হারানো এমন আটজন হতভাগ্য উদ্ভাবককে নিয়ে আজকের এই আয়োজন।
ফ্রাঞ্জ রেইশেল্ট
গত শতাব্দীর শুরুতে প্যারিসে বসবাস করতেন অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান এই দর্জি। উড্ডয়নের শুরুর যুগে যেসব বৈমানিক বিমান থেকে লাফ দিতে বাধ্য হতেন, তাদের জীবন বাঁচাতে একটি প্যারাসুট স্যুট বা পোশাক আবিষ্কারের নেশায় মেতে ওঠেন রেইশেল্ট। নিজের পাঁচতলার অ্যাপার্টমেন্টের জানালা দিয়ে ডামির (পুতুল) ওপর স্যুটটি পরিয়ে তিনি পরীক্ষা চালাতেন। প্রাথমিক পরীক্ষাগুলো সফল হলেও, পরবর্তী সময়ে স্যুটের উন্নতি করতে গিয়ে তা আরও খারাপ হয়ে যায়।
তবে এই ব্যর্থতায় তিনি দমে যাননি। রেইশেল্টের ধারণা ছিল, যথেষ্ট উচ্চতা থেকে পরীক্ষা না করার কারণেই স্যুটটি ঠিকমতো কাজ করছে না। তিনি আইফেল টাওয়ারের প্রথম প্ল্যাটফর্ম থেকে স্যুটটি পরীক্ষা করার জন্য পুলিশের অনুমতি আদায়ে সক্ষম হন। কিন্তু পরীক্ষার দিন টাওয়ারে পৌঁছে রেইশেল্ট যখন পুলিশকে জানান যে তিনি ডামির বদলে নিজেই লাফ দেবেন, তখন সঙ্গে সঙ্গে অনুমতি বাতিল করা হয়।
তবে এই দর্জি প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়াই এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্ল্যাটফর্ম থেকে লাফিয়ে পড়েন। তার প্যারাসুটটি ঠিকমতো খোলেনি এবং ১৮৭ ফুট নিচে আছড়ে পড়ে রেইশেল্টের মৃত্যু হয়।
জিম ফিক্স
জিম ফিক্স নিজে দৌড়ানো আবিষ্কার না করলেও, জগিংকে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন তিনি। ১৯৭৭ সালে তার লেখা বেস্টসেলার বই 'দ্য কমপ্লিট বুক অব রানিং' বাজারে আসার পর জগিং নিয়ে রীতিমতো উন্মাদনা শুরু হয়। বইটির ১০ লাখেরও বেশি কপি বিক্রি হয় এবং ফিক্সকে এনে দেয় বিপুল খ্যাতি ও সম্পদ।
দুর্ভাগ্যবশত, একজন ধনী ও বেস্টসেলার লেখক হিসেবে তিনি বেশিদিন বাঁচতে পারেননি। ১৯৮৪ সালের ২০ জুলাই তিনি জগিংয়ে বেরিয়েছিলেন এবং হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল মাত্র ৫২ বছর। মর্মান্তিক হলেও, তার এই মৃত্যু পরবর্তী সময়ে অনেকের কাছেই হাস্যরসের খোরাক হয়ে দাঁড়ায়।
কারেল সুচেক
চেকোস্লোভাকিয়ার এই পেশাদার স্টান্টম্যান একটি নয় ফুট লম্বা উজ্জ্বল লাল রঙের ব্যারেল নকশা করেছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল ১৯৮৪ সালে নায়াগ্রা জলপ্রপাত থেকে লাফ দেওয়ার সময় নিজেকে সুরক্ষিত রাখা। জলপ্রপাত থেকে ১ হাজার ফুট নিচে পড়ার সেই স্টান্টটি দারুণ সফল হয়েছিল। এর মাধ্যমে সুচেক এতটাই খ্যাতি ও অর্থ অর্জন করেন যে, জলপ্রপাতের কাছেই তিনি নিজস্ব একটি জাদুঘর খোলেন। এই সাফল্য একটি কোম্পানিকে আরেকটি স্টান্ট স্পনসর করতে উৎসাহিত করে। এবারের পরিকল্পনা ছিল, হিউস্টন অ্যাস্ট্রোডোম স্টেডিয়ামের ছাদ থেকে একটি পানির ট্যাংকে লাফ দেওয়া।
বিখ্যাত স্টান্টম্যান ইভেল কানিভেলের সতর্কতা সত্ত্বেও, সুচেক ব্যারেলের ভেতরে ঢুকে ছাদ থেকে লাফ দেন। কিন্তু ব্যারেলটি পানিতে না পড়ে ট্যাংকের কিনারে সজোরে আঘাত হানে। এতে এই স্টান্টম্যান মারাত্মকভাবে আহত হন এবং আতঙ্কিত দর্শকদের সামনে ব্যারেল থেকে বের করে আনার কিছুক্ষণ পরই তার মৃত্যু হয়।
টমাস অ্যান্ড্রুজ
বিখ্যাত নৌ-স্থপতি টমাস অ্যান্ড্রুজ হয়তো জাহাজ বা ওশান লাইনার আবিষ্কার করেননি, তবে সর্বকালের অন্যতম ভয়াবহ নৌ-বিপর্যয়ের শিকার হওয়া জাহাজ—টাইটানিকের মূল কারিগর ছিলেন তিনিই। ১৯০৭ সালে অ্যান্ড্রুজ এমন তিনটি নতুন ওশান লাইনার তৈরির কাজ শুরু করেন, যা হবে তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং বিলাসবহুল। তিনি এবং তার দল মিলে ব্রিটানিক, অলিম্পিক এবং টাইটানিক জাহাজের নকশা করেছিলেন।
জাহাজের জলরোধী দেয়ালের উচ্চতা এবং লাইফবোটের সংখ্যা নিয়ে তার পরামর্শ অগ্রাহ্য করা হয়েছিল। এরপরও অ্যান্ড্রুজ টাইটানিকের প্রথম যাত্রায় নিউইয়র্কে যাওয়ার এক দুর্ভাগ্যজনক সিদ্ধান্ত নেন। ১৯১২ সালের ১৫ এপ্রিল জাহাজটি একটি আইসবার্গের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ডুবে যায়। নিজের তৈরি জাহাজের সঙ্গে সঙ্গে অ্যান্ড্রুজ এবং আরও ১,৫০০ জনেরও বেশি মানুষের সলিলসমাধি হয়।
হেনরি স্মোলিনস্কি
অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্নাতক হেনরি স্মোলিনস্কি ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে তার সহপাঠী হ্যারল্ড ব্লেকের সঙ্গে মিলে উড়ন্ত গাড়ি তৈরির জন্য একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। তারা দুটি প্রোটোটাইপ বা প্রাথমিক মডেল তৈরি করেছিলেন। এর দুটিতেই 'সেসনা স্কাইমাস্টার' বিমানের কাঠামোর সঙ্গে 'ফোর্ড পিন্টো' মডেলের গাড়ি জোড়া লাগানো হয়েছিল।
১৯৭৩ সালে একটি পরীক্ষামূলক ফ্লাইটে স্মোলিনস্কি ছিলেন চালকের আসনে এবং ব্লেক ছিলেন যাত্রীর আসনে। দুর্বল ওয়েল্ডিং বা ঝালাইয়ের কারণে উড্ডয়নকালে সেসনা বিমানটি পিন্টো গাড়ি থেকে আলাদা হয়ে যায়। ফলে উড়ন্ত যানটি সোজা মাটিতে আছড়ে পড়ে এবং ঘটনাস্থলেই দুজনের মৃত্যু হয়।
ডা. সাবিন আর্নল্ড ফন সোচকি
বর্তমান যুগে এটিকে চরম পাগলামি মনে হলেও, একসময় দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিসপত্রে তেজস্ক্রিয় পদার্থ ব্যবহারের একটি ক্ষণস্থায়ী কিন্তু মারাত্মক উন্মাদনা ছিল। ১৯১৫ সালে এই উন্মাদনার চরম পর্যায়ে ডা. সাবিন আর্নল্ড ফন সোচকি 'রেডিয়াম লুমিনাস ম্যাটেরিয়ালস কো.' নামে একটি কোম্পানি খোলেন। সেখানে ঘড়ির ডায়ালে রেডিয়ামযুক্ত রং করার জন্য কিশোরী মেয়েদের নিয়োগ দেওয়া হতো, যাতে ঘড়িগুলো অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে।
রং করার সময় তুলির আকার ঠিক রাখতে ওই মেয়েরা বারবার তুলির মাথা জিভ দিয়ে চাটত এবং প্রতিবারই মারাত্মক তেজস্ক্রিয় পদার্থের কিছুটা গিলে ফেলত। পাঁচ বছরের মধ্যে তাদের বেশিরভাগেরই হাড়ের ক্ষত দেখা দেয় এবং ১৯২৪ সালের মধ্যে তাদের নয়জন মারা যায়। সোচকির নিজের পরিণতিও ভালো হয়নি। তেজস্ক্রিয় বিকিরণের শিকার হয়ে ১৯২৮ সালে ৪৫ বছর বয়সে অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়ায় ভুগে তিনি মারা যান।
টমাস মিডগ্লে জুনিয়র
সীসাযুক্ত পেট্রোল এবং ক্লোরোফ্লুরোকার্বন (সিএফসি) আবিষ্কারে প্রধান ভূমিকা রাখার জন্য টমাস মিডগ্লে জুনিয়রকে পরিবেশ ইতিহাসবিদ জে. আর. ম্যাকনিল এমন একজন মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, 'যিনি পৃথিবীর ইতিহাসে অন্য যেকোনো একক প্রাণীর চেয়ে বায়ুমণ্ডলে বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিলেন।' তবে তার এই আবিষ্কারগুলো তার মৃত্যুর কারণ ছিল না।
১৯৪০ সালে ৫১ বছর বয়সে মিডগ্লে পোলিওতে আক্রান্ত হন, যা তাকে মারাত্মকভাবে অক্ষম করে তোলে। এর সমাধান হিসেবে তিনি বিছানা থেকে কারো সাহায্য ছাড়াই ওঠার জন্য দড়ি এবং পুলির (কপিকল) সমন্বয়ে একটি জটিল ব্যবস্থা আবিষ্কার করেন। কিন্তু ১৯৪৪ সালের ২ নভেম্বর তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। সরকারি ভাষ্যমতে, তিনি নিজের তৈরি যন্ত্রের দড়িতে আটকে শ্বাসরোধ হয়ে মারা গিয়েছিলেন। তবে ব্যক্তিগতভাবে তার পরিবার বিশ্বাস করত যে, তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন।
কাউপার ফিপস কোলজ
কোলজ ছিলেন একজন উদ্ভাবক এবং রয়্যাল নেভির একজন ক্যাপ্টেন। ক্রিমিয়ার যুদ্ধের সময় তিনি একটি ঘূর্ণায়মান গান টারেট (কামান বসানোর মিনার) আবিষ্কার করেন, যা পরবর্তীতে বেশ কয়েকটি ব্রিটিশ জাহাজে বসানো হয়েছিল। যখন জাহাজে পালের বদলে ইঞ্জিনের ব্যবহার শুরু হয়, তখন এই নকশাটি সব যুদ্ধজাহাজের জন্য একটি স্ট্যান্ডার্ডে পরিণত হয়। কারণ পালের খুঁটি বা দড়ির বাধা ছাড়াই এটি দিয়ে বিশাল এলাকাজুড়ে গোলাবর্ষণ করা যেত।
১৮৬৬ সালে রয়্যাল নেভি কোলজের নকশা করা একটি পরীক্ষামূলক যুদ্ধজাহাজ 'এইচএমএস ক্যাপ্টেন' নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। তিন বছর পর জাহাজটি পানিতে নামানো হয়। দীর্ঘ অসুস্থতার কারণে জাহাজ নির্মাণের বেশিরভাগ সময় কোলজ উপস্থিত থাকতে পারেননি। এর ফলে লোহার কাঠামোর এই বাষ্পচালিত জাহাজটি অতিরিক্ত ভারী ও ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। ১৮৭০ সালের ৭ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতের পরপরই এক ঝড়ের কবলে পড়ে 'এইচএমএস ক্যাপ্টেন' উল্টে ডুবে যায়। এতে ৪৭২ জন প্রাণ হারান। সেই মৃতদের তালিকায় ছিলেন কাউপার ফিপস কোলজও, যিনি ৫১ বছর বয়সে নিজের আবিষ্কারের সঙ্গেই ডুবে নিহত হন।
