১৪ মাস সার্ভিসে ফিরতে পারবে না বিমানবাহী রণতরী জেরাল্ড আর ফোর্ড
মার্কিন নৌবাহিনী এখন এক বড় ধরনের 'এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার সংকটের' মুখে পড়তে যাচ্ছে। তাদের সবচেয়ে অত্যাধুনিক বিমানবাহী রণতরী 'ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড' (সিভিএন-৭৮) রয়েছে বর্তমানে গ্রিসের ক্রীট দ্বীপের সৌদা বে-তে। লোহিত সাগরের সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে এসে মেরামতের অপেক্ষায় থাকা এই রণতরীর অবস্থা আসলে একুশ শতকের নৌ-শক্তির প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাকেই নির্দেশ করে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক জ্যাক বাকবি সতর্ক করে বলেছেন, গত ১২ মার্চ রণতরীটির লন্ড্রি রুমে অগ্নিকাণ্ডের পর এটি হয়তো ১২ থেকে ১৪ মাসের জন্য পুরোপুরি 'আউট অফ সার্ভিস' হয়ে পড়তে পারে।
কেন এই বিপত্তি?
বর্তমানে সৌদা বে-তে নোঙর করা এই সুপারক্যারিয়ারটি টানা নয় মাস ধরে সাগরে ছিল। এই দীর্ঘ সময়ে এটি ইরানের বিরুদ্ধে ৭ হাজারেরও বেশি হামলায় সহায়তা করেছে।
কিন্তু অগ্নিকাণ্ডের কারণে রণতরীটির ১০০টি থাকার জায়গা বা বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে ইম্যালস (EMALS) এবং এএজি (AAG)-এর মতো অত্যাধুনিক সিস্টেমগুলোর দীর্ঘদিনের জমে থাকা রক্ষণাবেক্ষণের কাজ আরও পিছিয়ে গেছে।
এই 'রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি' মার্কিন নৌবাহিনীর বৈশ্বিক উপস্থিতিকে এমন এক কৌশলগত মুহূর্তে হুমকির মুখে ফেলেছে, যা ১ লাখ টন ওজনের এই পারমাণবিক শক্তিচালিত রণতরীর স্থায়িত্বের এক বড় পরীক্ষা।
এক বছর বা তারও বেশি সময়ের জন্য কি বসে থাকবে ফোর্ড?
মার্কিন নৌবাহিনীর সবচেয়ে নতুন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডকে লোহিত সাগরের সক্রিয় অভিযান থেকে এরই মধ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। টানা কয়েক মাস যুদ্ধ করার পর ১২ মার্চ জাহাজে আগুন লাগা এবং সিস্টেমের ওপর অতিরিক্ত চাপের কারণেই একে ক্রীটের সৌদা বে-তে পাঠানো হয়েছে।
জাহাজের প্রধান লন্ড্রি এলাকায় লাগা এই আগুনে বেশ কয়েকজন নাবিক আহত হন, থাকার জায়গাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আগুন নেভাতে ও উদ্ধারকাজে কয়েক ঘণ্টা সময় লেগে যায়।
প্রায় নয় মাস সাগরে থাকার পর—যা নৌবাহিনীর সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘ ও কঠিন মিশন—ফোর্ড এখন দীর্ঘমেয়াদি মেরামতের মুখে পড়তে পারে বলে জোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আগুনের ক্ষয়ক্ষতি এবং দীর্ঘদিনের জমে থাকা রক্ষণাবেক্ষণের কাজ মিলিয়ে রণতরীটি ১২ থেকে ১৪ মাসের জন্য নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। এমনিতেই মার্কিন রণতরীর সহজলভ্যতা এখন চাপের মুখে, তার ওপর সবচেয়ে অত্যাধুনিক রণতরীটি বসিয়ে রাখা নৌবাহিনীর জন্য এক বড় মাথাব্যথার কারণ হতে পারে।
ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ও এর ভূমিকা
ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড হলো নৌবাহিনীর ফোর্ড-শ্রেণির বিমানবাহী রণতরীর প্রথম জাহাজ। এটি নিমিৎজ-শ্রেণির রণতরীগুলোর জায়গা নিতে এবং মার্কিন নৌ-বিমান চলাচলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য তৈরি করা হয়েছে।
২০১৭ সালে কমিশন পাওয়া প্রায় ১ লাখ টনের এই পারমাণবিক শক্তিচালিত রণতরীটিতে ৭৫টির বেশি বিমান এবং ৫ হাজারেরও বেশি কর্মী বহনের ক্ষমতা রয়েছে।
এতে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক এয়ারক্রাফট লঞ্চ সিস্টেম (ইম্যালস) এবং অ্যাডভান্সড অ্যারেস্টিং গিয়ার (এএজি)-এর মতো বড় ধরনের প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। এগুলোর উদ্দেশ্য হলো পুরোনো সিস্টেমের তুলনায় দ্রুত বিমান ওড়ানো এবং জনবল কমানো।
এই উদ্ভাবনগুলো নৌবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু হলেও, জাহাজটি সার্ভিসে আসার পর থেকেই এর জটিলতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে নানা চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে।
ফোর্ডের জন্য যেকোনো দীর্ঘমেয়াদি নিষ্ক্রিয়তা একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত। এটি এই শ্রেণির প্রথম জাহাজ হওয়ায় এর দীর্ঘ নিষ্ক্রিয়তা পুরো ফোর্ড-শ্রেণির ওপরই আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।
ইরান সংঘাতে এক ক্লান্তিকর মিশন
ফোর্ড এখন পর্যন্ত অত্যন্ত কঠিন এক মিশন পার করেছে। রণতরীটি প্রায় নয় মাস ধরে সক্রিয় ছিল। প্রথমে এটি ক্যারিবিয়ানে কাজ করেছে, এরপর মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে, যেখানে এটি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের টানা অভিযানে সহায়তা করেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মার্কিন বাহিনী এই অভিযানের অংশ হিসেবে ৭ হাজারেরও বেশি হামলা চালিয়েছে, যেখানে ফোর্ড আকাশপথে হামলা চালানো এবং অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতি বজায় রাখতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে।
এটি কোনো সাধারণ মিশন ছিল না। জাহাজটিকে উচ্চ হারে বিমান ওড়াতে হয়েছে এবং অন্যান্য মার্কিন আকাশযানের সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়েছে। চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে এই রণতরীর ওপর টানা চাপ ছিল। মিশনটি কয়েকবার বাড়ানোও হয়েছে, যা একে আধুনিক নৌবাহিনীর ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘ মিশনে পরিণত করেছে।
এর ফলে রণতরীটির ওপর দৃশ্যমান চাপ পড়েছে। অনবোর্ড প্লাম্বিংয়ের মতো সিস্টেমে ক্রমাগত সমস্যা দেখা দিয়েছে। সেই সঙ্গে কয়েক মাস ধরে পূর্ণাঙ্গ রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া কাজ করায় ক্রুদের ক্লান্তি এবং যন্ত্রপাতির ক্ষয়ক্ষতি নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে। সহজ কথায়, ফোর্ড এমন মাত্রায় কাজ করেছে যা এর যান্ত্রিক সিস্টেমগুলোর ক্ষয়ক্ষতি ত্বরান্বিত করেছে এবং মানুষের কর্মক্ষমতাও কমিয়ে দিয়েছে।
আগুন এবং মেরামতের কারণ
জাহাজটি প্রত্যাহারের তাৎক্ষণিক কারণ ছিল ১২ মার্চের আগুন, যা লন্ড্রি থেকে শুরু হয়ে আশেপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনায় প্রায় ১০০টি বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ধোঁয়ায় শ্বাস নেওয়ার কারণে প্রায় ২০০ জন নাবিককে চিকিৎসা দিতে হয়। অন্তত একজনকে সরিয়ে নেওয়ারও প্রয়োজন হয়।
নৌবাহিনী নিশ্চিত করেছে যে প্রোপালশন বা চালিকাশক্তি ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি এবং রণতরীটি কার্যকর ছিল, তবে ঘটনার ভয়াবহতার কারণে জাহাজের অবস্থা পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন দেখা দেয়।
তবে মেরামতের জন্য আগুনই একমাত্র কারণ নয়—এটি বরং কফিনের শেষ পেরেক। কয়েক মাসের টানা কাজ এবং পরিচিত সিস্টেমগত সমস্যা, তার ওপর রক্ষণাবেক্ষণের সুযোগ না পাওয়ার পরই এই ঘটনা ঘটে।
মেরামতে কি ১৪ মাস লাগবে?
স্বাভাবিক অবস্থায় কোনো পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরীর বড় ধরনের ক্ষতি না হলেও মিশন-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। অতীতের উদাহরণ বলছে, কাজের পরিধি এবং সিস্টেম আপগ্রেডের ওপর ভিত্তি করে জটিল ওভারহল বা বড় ধরনের মেরামতের সময় এক বছরেরও বেশি হতে পারে।
ফোর্ডের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি কারণে এই সময় আরও দীর্ঘ হতে পারে। প্রথমত, এটি এই শ্রেণির প্রথম জাহাজ, যার একাধিক সিস্টেমে আগে থেকেই পরিচিত সমস্যা রয়েছে, যার মানে হলো রক্ষণাবেক্ষণ এমনিতেই জটিল হবে। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘ মিশনের কারণে অনেক কাজ জমে গেছে, যা এখন একসঙ্গেই করতে হবে। তৃতীয়ত, আগুন নিজেই কাঠামোগত এবং বাসযোগ্যতার এমন ক্ষতি করেছে, যা রুটিন ইঞ্জিনিয়ারিং কাজের পাশাপাশি মেরামত করতে হবে। এর কোনোটিই রুটিন কাজ নয়।
এই সব কারণ মেলালে ১২-১৪ মাসের নিষ্ক্রিয়তার সম্ভাবনাটি পুরোপুরি যৌক্তিক মনে হয়, যদিও এটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। দীর্ঘ মিশনের একটি মূল্য থাকে, আর ফোর্ডের ক্ষেত্রে হয়তো সেটিই হতে যাচ্ছে।
