জনসংখ্যা 'বিপর্যয়ে' ইউক্রেন, হয়ে উঠছে বিধবা ও এতিমদের দেশ
ওলিয়েনা বিলোজেরস্কা এবং তার স্বামী বরাবরই সন্তান নিতে চেয়েছিলেন। ২০১৪ সালে যখন পূর্ব ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু হয়, তখন ওলিয়েনার বয়স ছিল ৩৪। কিন্তু দেশ রক্ষার ডাকে সাড়া দিয়ে তারা যুদ্ধে যোগ দেন এবং সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা পিছিয়ে দেন। যখন তিনি সেনাবাহিনী ছাড়েন, ততদিনে তার বয়স ৪১। চিকিৎসকরা জানান, তার মা হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। অনেক দেরি হয়ে গেছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের চার বছর হতে চলল। এর মধ্যেই দেশটির জন্মহার আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। একদিকে সন্তান জন্মদানে সমস্যা বাড়ছে, অন্যদিকে অনেকেই অনিশ্চয়তার কারণে সন্তান নিতে চাচ্ছেন না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণহানি এবং লাখ লাখ মানুষের দেশত্যাগ। সব মিলিয়ে ইউক্রেন এখন বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ জনতাত্ত্বিক সংকটের মুখে।
প্রখ্যাত ইউক্রেনীয় জনসংখ্যাবিদ এলা লিবানোভা সিএনএনকে বলেন, 'এটা এক বিপর্যয়। মানুষ ছাড়া কোনো দেশ টিকে থাকতে পারে না। যুদ্ধের আগেও ইউক্রেনের জনঘনত্ব কম ছিল এবং তা সমানভাবে বিস্তৃত ছিল না।'
লিবানোভা জানান, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউক্রেন প্রায় ১ কোটি মানুষ হারিয়েছে। এর মধ্যে নিহত, দেশত্যাগী এবং রাশিয়ার দখলে থাকা এলাকার মানুষও রয়েছে। ইউরোপজুড়েই জন্মহার কমছে, কিন্তু ইউক্রেনে তা এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়।
রাশিয়ার এই আগ্রাসন লাখ লাখ ইউক্রেনীয়র জীবন থমকে দিয়েছে। অনেক নারীর জন্য এই সিদ্ধান্তের মূল্য অনেক বেশি।
সন্তান নেওয়ার স্বপ্ন যখন দুঃস্বপ্ন
যুদ্ধ থেকে ফেরার পর ৪১ বছর বয়সী ওলিয়েনা বিলোজেরস্কাকে বলা হয়েছিল, তার নিজের বাচ্চার মা হওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ৫ শতাংশ। চিকিৎসকরা দাতার ডিম্বাণু নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু তিনি নিজের সন্তানের আশায় প্রজনন চিকিৎসা বা ফার্টিলিটি ট্রিটমেন্ট শুরু করেন।
কিয়েভে বসে তিনি বলেন, 'সৈন্যরা প্রতিটি দিন বেঁচে থাকার লড়াই করে। তাদের চিন্তা থাকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বা পরদিন পর্যন্ত বাঁচার। ড্রোনের টাকা কোথা থেকে আসবে, গাড়ি মেরামত কীভাবে হবে—এসব নিয়েই তাদের জরুরি ভাবনা। ভবিষ্যতের কোনো পরিকল্পনা তাদের থাকে না।'
তিনি আরও বলেন, 'আমি মনে করি নারী সৈনিকদের বলা আমার নৈতিক দায়িত্ব—ভবিষ্যতে সন্তান চাইলে আগেই ডিম্বাণু ফ্রিজ করে রাখা উচিত। আমার গল্প শুনে যেন অন্য কেউ এমন বিপদে না পড়ে।'
ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (আইভিএফ) প্রক্রিয়ায় সাধারণত ১০-১৫টি ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু বিলোজেরস্কার ক্ষেত্রে মাত্র একটি পাওয়া গিয়েছিল এবং সেটিও সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা কম ছিল। স্বামীর শুক্রাণু দিয়ে নিষিক্ত করার পরও চিকিৎসকরা সাফল্যের আশা কম দিয়েছিলেন।
কয়েক দিন পর জানা যায় ভ্রূণটি টিকে গেছে। তখন তার বয়স ৪২। তিনি সন্তান নেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। ঠিক তখনই রাশিয়া পূর্ণমাত্রায় আক্রমণ শুরু করে। দক্ষ সেনা কর্মকর্তা হিসেবে তাকে তখনই ফ্রন্টলাইনে বা সম্মুখযুদ্ধে ডাক পড়ে। ভ্রূণটি কিয়েভের একটি ক্রায়োব্যাংকে হিমায়িত অবস্থায় থেকে যায়। সেখানে আরও প্রায় ১০ হাজার ভ্রূণ ছিল।
বিলোজেরস্কা বলেন, 'আমি যুদ্ধে ফিরে গেলাম। ক্লিনিকটিতে বোমা হামলা হতে পারে ভেবে আমি খুব ভয় পেতাম। আমি ফোন করে জানতে চাইতাম ক্রায়োব্যাংক বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হবে কি না।' তাকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল, ভ্রূণগুলো সুরক্ষিত দেয়ালের ভেতরে আছে। সরাসরি হামলা না হলে শার্পনেল বা ধ্বংসস্তূপ থেকে সেগুলো রক্ষা পাবে।
বন্ধ্যাত্বের প্রকোপ ও যুদ্ধের প্রভাব
ডা. ভ্যালেরি জুকিন ইউক্রেনের প্রজনন চিকিৎসার অন্যতম পথিকৃৎ এবং 'নাদিয়া' (যার অর্থ আশা) ক্লিনিকের পরিচালক। তিনি জানান, যুদ্ধ ইউক্রেনের প্রজনন হারের ওপর ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলছে। গর্ভপাতের পর ভ্রূণের জেনেটিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, যুদ্ধের পর থেকে ক্রোমোজোমাল অসঙ্গতি বা ত্রুটি অনেক বেড়েছে।
নাদিয়া ক্লিনিকের প্রজনন বিশেষজ্ঞ ডা. আলা বারানেঙ্কো জানান, কম বয়সী নারীদের মধ্যেও অকাল মেনোপজ বা ঋতুস্রাব বন্ধের ঘটনা বাড়ছে।
তিনি বলেন, 'স্ট্রেস বা মানসিক চাপের কারণে ডিম্বাণুর মান খারাপ হচ্ছে এবং সংখ্যা কমছে। শুধু রোগীদের নয়, সুস্থ দাতাদের ডিম্বাণুর মানও কমেছে।' তিনি আরও জানান, যুদ্ধ থেকে ফেরা পুরুষদের শুক্রাণুর মানও আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে।
বিধবার দেশ
ইরিনা ইভানোভা বুঝতে পারছিলেন তিনি মা হতে চলেছেন। কিন্তু নিশ্চিত না হয়ে স্বামীকে বলতে চাননি। স্বামী পাভলো ইভানভ ছিলেন ইউক্রেনের এলিট এফ-১৬ পাইলট। তিনি সন্তান নেওয়ার বিষয়ে খুব উত্তেজিত ছিলেন। ইরিনা চেয়েছিলেন নিশ্চিত হয়েই সুখবরটা দেবেন।
কিন্তু যখন তিনি নিশ্চিত হলেন, ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ২০২৫ সালের ১২ এপ্রিল এক অভিযানে পাভলো নিহত হন।
ডিসেম্বরে মেয়ের জন্মের পর ইরিনা নাম রাখেন ইউস্টিনা। সন্তানের কল্পনায় স্বামী-স্ত্রী মিলে এই নামটি ঠিক করে রেখেছিলেন। ইউস্টিনার চোখ বাবার মতোই হালকা নীল এবং সে বাবার মতোই শান্ত।
চোখের পানি মুছতে মুছতে ইরিনা বলেন, 'প্রথমবার ওর কান্না শুনে মনে হলো আমি আবার নিঃশ্বাস নিতে পারছি। একই সঙ্গে চরম আনন্দ আর চরম বেদনা অনুভব করা যায়। এখন এটাকেই জীবনের অংশ হিসেবে মেনে নিয়েছি।'
ইউক্রেন হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ করে না। তবে মার্কিন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক 'সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ' জানুয়ারিতে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, চার বছরের যুদ্ধে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার ইউক্রেনীয় নিহত হয়েছেন।
ইউক্রেনে সাধারণত বেশি বয়সী পুরুষদের যুদ্ধে ডাকা হয়। তাই গড় সৈনিকের বয়স প্রায় ৪৩ বছর, যা পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় বেশি। ফলে ফ্রন্টলাইনে মারা যাওয়া নারী-পুরুষের অধিকাংশই বিবাহিত এবং তাদের সন্তান আছে। এতে ইউক্রেন বিধবা ও এতিমদের দেশে পরিণত হচ্ছে। সরকারি হিসাবে বর্তমানে ৫৯ হাজার শিশু তাদের জৈবিক বাবা-মা ছাড়াই বড় হচ্ছে, যাদের বেশির ভাগই পালক পরিবারে আছে।
ওকসানা বোরকুন অল্প বয়সে বিধবা হওয়ার যন্ত্রণা বোঝেন। ২০২২ সালের গ্রীষ্মে বাখমুতে তার স্বামী ভলোদিমির হুনকো নিহত হন। যে সমাজে শোক ব্যক্তিগত বিষয় এবং স্বামীহারা নারীদের নিচু চোখে দেখা হয়, সেখানে তিনি বিধবাদের জীবন সহজ করার ব্রত নিয়েছেন।
কিয়েভের এক ক্যাফেতে বসে বোরকুন এবং তার দুই বন্ধু জুলিয়া সেল্যুটিনা ও ওলিয়েনা বিলেটস্কা নিজেদের গল্প করছিলেন। তিনজনই বিধবা। তাদের অনলাইন গ্রুপে এখন ৬ হাজারেরও বেশি সদস্য। তারা নিয়মিত দেখা করেন এবং নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন।
বোরকুন শহীদ সেনাদের সন্তানদের জন্মদিনের উপহার দেওয়ার একটি প্রকল্পে বিলেটস্কাকে যুক্ত করেন। বিলেটস্কা বলেন, 'আমার আর ভভচিকের কোনো সন্তান ছিল না। আমি ভয় পাচ্ছিলাম এটা আমার জন্য খুব কষ্টের হবে। কিন্তু এই কাজ আমাকে শোক কাটাতে সাহায্য করেছে।' এখন তারা প্রতি মাসে গড়ে ২০০ উপহার পাঠান।
৪৫ বছর বয়সী বিলেটস্কা মেনে নিয়েছেন যে তিনি আর মা হতে পারবেন না। স্বামী যুদ্ধে যাওয়ার আগে তারা চিকিৎসার চেষ্টা করছিলেন। তিনি বলেন, 'যুদ্ধ আমার মা হওয়ার সময়টুকু কেড়ে নিয়েছে।'
ইরিনা ও পাভলো অনেক সন্তান নিতে চেয়েছিলেন। ইউক্রেনের জন্মহার এখন ১-এর নিচে নেমে গেছে, যেখানে ইউরোপে তা ১.৪ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১.৬। ইভানভদের মতো দম্পতিরাই জনসংখ্যা সংকট কাটাতে পারত। কিন্তু সেই স্বপ্ন তার স্বামীর সঙ্গেই শেষ হয়ে গেছে।
মেধা পাচার বা ব্রেইন ড্রেন
সেল্যুটিনা জানান, তারা বিধবা নারীদের সমাজের সক্রিয় সদস্য হিসেবে গড়ে তুলতে চান। যুদ্ধ শেষে দেশ পুনর্গঠনে এটি জরুরি হবে।
২০২২ সালের পর থেকে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ দেশ ছেড়েছে, যাদের বেশির ভাগই তরুণী ও শিশু। লিবানোভা বলেন, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তাদের ফেরার সম্ভাবনা তত কমবে। তিনি বলেন, 'এখানে ধ্বংস বাড়ছে, আর বিদেশে তারা নতুন জীবনে মানিয়ে নিচ্ছে।'
এই গণপ্রস্থান ইউক্রেনের জন্য বড় মেধা পাচারের কারণ। লিবানোভা আশা করেন, দক্ষ কর্মীরা ফিরে আসবেন। তবে ঘাটতি পূরণে বিদেশিদের আনার কথাও ভাবা হতে পারে।
সেল্যুটিনা মনে করেন, যুদ্ধের বিধবারাই ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ গড়তে পারেন। তিনি বলেন, 'যারা স্বজন হারিয়েছে, তারা ক্ষতির মূল্য বোঝে। তারা জানে কেন আমাদের পুরুষরা জীবন দিয়েছে। আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না।'
গত বছর ৪৫ বছর বয়সে বিলোজেরস্কা বুঝতে পারেন তিনি বুড়িয়ে যাচ্ছেন। শুধু মাতৃত্বের জন্য নয়, যুদ্ধের জন্যও। তিনি স্নাইপার হিসেবে কাজ করতেন। তিনি বলেন, 'আমি আর শারীরিক ধকল নিতে পারছিলাম না। আমার ইউনিটের বেশির ভাগই তরুণ অ্যাথলেট।'
মা মারা যাওয়ার পর অসুস্থ বাবাকে দেখার জন্য তিনি কিয়েভে ফিরে আসেন।
তার ভ্রূণটি তিন বছর ধরে নাদিয়া ক্লিনিকে অপেক্ষা করছিল। তিনি বলেন, 'মনে হলো এটাই শেষ সুযোগ। আমি ক্লিনিকে গেলাম। এভাবেই ৪৬ বছর বয়সে পাভলাসের জন্ম হলো।'
ডা. বারানেঙ্কো ২০ বছরের ক্যারিয়ারে ৫ হাজার শিশুর জন্ম দিয়েছেন। কিন্তু বিলোজেরস্কার গল্পটি তার মনে গেঁথে আছে।
ছোট্ট স্নোম্যানের মতো নীল পোশাকে মোড়ানো পাভলাসকে কোলে নিয়ে বিলোজেরস্কা বলেন, 'ওর ডাকনাম বোহদান, যার অর্থ সৃষ্টিকর্তার উপহার। ওকে কোলে নিলে সব গলে যায়। ও যখন হাসে, তখন আর কোনো কিছুই বর্ণনা করার ভাষা থাকে না।'
