যুদ্ধ, সংঘাত ও ট্রমাটিক ঘটনা: শিশুদের সঙ্গে কথা বলবেন যেভাবে
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি কিংবা সংঘাতের বিভিন্ন ছবি দেখে অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষই যেখানে বিচলিত বোধ করছেন, সেখানে শিশুদের জন্য এসব ঘটনা বুঝতে পারা আরও কঠিন। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব শিশুদের চিন্তা, অনুভূতি এবং আচরণের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
শিশু মনোবিজ্ঞানী ও বিকাশ বিশেষজ্ঞরা অভিভাবকদের পরামর্শ দিয়েছেন শিশুদের খোঁজ নিতে, বয়োপযোগী আলোচনার সময় বের করতে এবং ভুল তথ্য সংশোধন করে দিতে। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন অতিরিক্ত বীভৎস তথ্য শিশুদের সামনে না আসে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা 'সেভ দ্য চিলড্রেন'-এর চাইল্ড প্রোটেকশন প্রধান রেবেকা স্মিথ বলেন, "অনেক সময় বড়রা ভাবেন কঠিন কোনো বিষয় নিয়ে কথা না বললে হয়তো সেটির অস্তিত্ব থাকবে না। কিন্তু শিশুদের বাস্তবতায় বিষয়টি তেমন নয়। সংঘাতের বিষয়গুলো এড়িয়ে গেলে শিশুরা নিজেদের একা, অসহায় এবং ভীত মনে করতে পারে। শিশুরা কী ঘটছে তা যেন বুঝতে পারে, সে জন্য তাদের সঙ্গে খোলামেলা ও সততার সঙ্গে কথা বলা জরুরি।"
শিশুদের সঙ্গে যুদ্ধ ও এর প্রভাব নিয়ে আলোচনার জন্য বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন:
নিরাপদ পরিবেশ তৈরি ও আবেগ বুঝতে পারা
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন ইউক্রেন, গাজা, ইরান, ইসরায়েল বা সুদানসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কী ঘটছে সে সম্পর্কে শিশুটি আগে থেকে কতটুকু জানে, তা বোঝার চেষ্টা করতে। কিছু শিশু হয়তো জানেই না যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরান ও এর মিত্রদের সংঘাত বেড়েছে। আবার অনেকে পরিবারের ধারণার চেয়েও বেশি জানে কিন্তু নিজের আবেগ চেপে রাখে।
রেবেকা স্মিথ বলেন, "যেসব জায়গায় আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র দেখা যাচ্ছে, সেখানে শিশুদের জন্য এটি একটি নতুন ও ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হতে পারে। এমন ঘটনা শিশুর নিরাপত্তার বোধকে বিঘ্নিত করে। যা একসময় স্থিতিশীল ছিল, তা হঠাৎ অনিশ্চিত মনে হতে পারে।"
শিশুদের মানসিকভাবে সহায়তা দিতে হলে বড়দেরও নিজেদের খেয়াল রাখা জরুরি। ন্যাশনাল চাইল্ড ট্রমাটিক স্ট্রেস নেটওয়ার্কের মতে, বড়রা যদি শিশুদের সঙ্গে নিজেদের অনুভূতি শেয়ার করেন, তবে অন্যের প্রতি কেমন আচরণ করা উচিত সে বিষয়ে নিজস্ব মূল্যবোধ ও বিশ্বাস বিনিময়ের একটি সুযোগ তৈরি হয়। তবে শিশুরা কী ভাবছে সে সম্পর্কে কোনো পূর্বানুমান করা ঠিক হবে না।
যদি কোনো শিশু কথা বলতে না চায়, তবে ধৈর্য ধরতে হবে। ইউক্রেনীয় সংস্থা 'ভয়েসেস অব চিলড্রেন'-এর মনোবিজ্ঞানী নাটালিয়া সোসনোভেনকো বলেন, "শিশুর কথা না বলার অধিকারকে সম্মান করতে হবে। তাদের নিজস্ব অনুভূতি বা মানসিক অবস্থা থাকতে পারে যা তারা হয়তো শেয়ার করতে চাচ্ছে না।"
বয়স অনুযায়ী আলোচনা
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন শিশুদের সংঘাত সম্পর্কে মৌলিক ও বয়সোপযোগী তথ্য দেওয়ার সুপারিশ করেছে। খুব ছোট শিশুদের জন্য যুদ্ধ মানে দুটি দেশের লড়াই—এমন সহজ ধারণা দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু ছোট শিশুরা স্ক্রিনে যা দেখছে এবং বাস্তবে যা ঘটছে তার পার্থক্য বুঝতে পারে না। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা টিভিতে যুদ্ধের ছবি দেখলে তারা আতঙ্কিত হতে পারে যে তারা নিজেরাও বিপদে আছে। তাই তাদের বারবার আশ্বস্ত করতে হবে যে তারা নিরাপদ।
বয়সে বড় শিশুরা যুদ্ধ ও এর ফলাফল সম্পর্কে সচেতন থাকে। তারা আরও বিস্তারিত প্রশ্ন করতে পারে। এক্ষেত্রে মানবিক সহায়তা এবং সঠিক তথ্য যাচাইয়ের মতো বিষয়গুলোতে তাদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। ইউনিসেফ বলছে, সব প্রশ্নের উত্তর আপনার কাছে না থাকলেও কোনো সমস্যা নেই।
লেবাননের একটি স্কুলের আশ্রয়ে থাকা শিশুদের বিষয়ে সেভ দ্য চিলড্রেনের কান্ট্রি ডিরেক্টর নোরা ইংডাল বলেন, "একটি শিশু তার মাকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করছিল—মা, তারা কেন লড়াই করছে? তারা কেন আমাদের আক্রমণ করছে? মা তখন আমার দিকে তাকালেন, কারণ তার কাছে কোনো উত্তর ছিল না। আমি তাকে বললাম, 'আপনার কাছে উত্তর নেই বা আপনি কোনো গ্যারান্টি দিতে পারছেন না, এটা বলাতে কোনো সমস্যা নেই। বরং তাকে বলুন, আমি তোমার সঙ্গেই আছি'।"
অপ্রয়োজনীয় খবর ও ছবি দেখা সীমিত করা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংবাদ মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যুদ্ধের খবর দেখার বিষয়ে অভিভাবকদের সতর্ক থাকতে হবে। শিশুর বয়স যত কম হবে, সংঘাতের খবরের সংস্পর্শে তাকে তত কম রাখা উচিত। প্রয়োজনে খবর দেখা বন্ধ রাখতে হবে বা বড়দের মধ্যে এসব নিয়ে আলোচনা করার সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন শিশুরা তা না শোনে।
সেভ দ্য চিলড্রেন বলছে, বড়রা ডিজিটাল আচরণের ক্ষেত্রে উদাহরণ হতে পারেন। শিশুদের ক্ষতিকর বা গ্রাফিক ছবি শেয়ার না করতে উৎসাহিত করতে হবে এবং আবেগপ্রবণ বা ভুল তথ্য শেয়ার করার আগে দুবার ভাবতে শেখাতে হবে।
সোসনোভেনকো বলেন, "যুদ্ধের সময় মানুষের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক সচেতনতা বাড়ছে এবং তারা বুঝতে পারছে যে থেরাপি বা কাউন্সেলিং গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে অধিকাংশ মানুষ ও শিশুরই মনোবিজ্ঞানীর সহায়তা প্রয়োজন।"
