মার্কিন শিখ নেতাকে হত্যার ষড়যন্ত্রের দায় স্বীকার করলেন ভারতীয় নাগরিক
নিউইয়র্কে বসবাসরত শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা গুরপাতবন্ত সিং পান্নুনকে হত্যার জন্য ভাড়াটে খুনি নিয়োগের ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার কথা মার্কিন আদালতে স্বীকার করেছেন এক ভারতীয় নাগরিক। ফেডারেল প্রসিকিউটররা জানান, ২০২৩ সালের ওই হত্যা পরিকল্পনায় তার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল।
প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, ভারত সরকারের একজন কর্মকর্তার নির্দেশেই নিখিল গুপ্ত এই ষড়যন্ত্রের ছক কষেছিলেন। তবে পান্নুনকে হত্যার এই পরিকল্পনার সাথে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে ভারত সরকার।
৫৪ বছর বয়সি নিখিল গুপ্ত গত শুক্রবার আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করেন। নিখিলের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি পান্নুনকে হত্যার জন্য একজন ভাড়াটে খুনির সঙ্গে যোগাযোগের করার চেষ্টা করেছিলেন। পান্নুন একাধারে মার্কিন ও কানাডার নাগরিক এবং একজন পরিচিত শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা।
পান্নুন বিবিসিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, 'নিখিল গুপ্তের অপরাধ স্বীকার করে নেওয়া এই বিচারিক প্রমাণ দেয় যে, ভারতের মোদি সরকারই আমেরিকার মাটিতে ভাড়ায় খুনি নিয়োগ করে সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড পরিচালনার চেষ্টা করেছিল।'
পান্নুন নিউইয়র্কভিত্তিক সংগঠন শিখস ফর জাস্টিস-এর সঙ্গে যুক্ত। এ সংগঠন ভারতের শিখ অধ্যুষিত রাজ্য পাঞ্জাবকে বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে প্রচারণা চালায়। তাদের এ কর্মসূচির নাম খালিস্তান আন্দোলন।
আদালতে নিখিল ম্যাজিস্ট্রেট জজ সারাহ নেটবার্নকে জানান, ২০২৩ সালে ভারতে অবস্থানকালে তিনি পান্নুনকে হত্যার জন্য একজন ব্যক্তিকে অনলাইনে ১৫ হাজার ডলার পাঠিয়েছিলেন।
তবে নিখিল যে ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, তিনি আসলে মার্কিন মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন-এর (ডিইএ) ছদ্মবেশী তথ্যদাতা ছিলেন।
এফবিআইয়ের সহকারী পরিচালক রোমান রোজাভস্কি বলেন, পান্নুন মূলত তার 'বাকস্বাধীনতা চর্চা করার কারণেই আন্তঃরাষ্ট্রীয় দমনের তারগেতে পরিণত হয়েছিলেন'।
২০২৩ সালের জুনে চেক প্রজাতন্ত্রের প্রাগ বিমানবন্দর থেকে নিখিল গুপ্তকে আটক করা হয়। পরে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করা হয়।
নিউইয়র্কের সাদার্ন ডিস্ট্রিক্টের মার্কিন অ্যাটর্নি অফিস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, 'ভাড়াটে খুনি নিয়োগ, হত্যার ষড়যন্ত্র ও অর্থ পাচারের ষড়যন্ত্রের' অভিযোগে দোষ স্বীকার করেছেন নিখিল।
মার্কিন ফেডারেল গাইডলাইন অনুযায়ী, অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় গুপ্তের ২০ থেকে ২৪ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। একটি আইনি চুক্তির শর্তানুসারে, তাকে অন্তত দুই দশক কারাগারে কাটাতে হবে।
আগামী ২৯ মে তার চূড়ান্ত সাজা ঘোষণার দিন ধার্য করা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের টার্গেট পান্নুন ছিলেন শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে সক্রিয় থাকা হারদীপ সিং নিজ্জারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। গত জুনে কানাডায় মুখোশ পরা বন্দুকধারীর গুলিতে নিজ্জার নিহত হন।
প্রসিকিউটররা বলেন, নিজ্জার হত্যাকাণ্ডের পরপরই নিখিল গুপ্ত সেই ছদ্মবেশী খুনিকে বলেছিলেন, নিজ্জারও তাদের 'টার্গেট' ছিলেন।
পরে কানাডা সরকার নিজ্জার হত্যাকাণ্ড ও পান্নুনকে হত্যার ষড়যন্ত্র—উভয় ঘটনার সঙ্গেই ভারতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলে।
মার্কিন ও কানাডা কর্তৃপক্ষের দাবি, বিদেশে অবস্থানরত ভারতীয় ভিন্নমতাবলম্বীদের লক্ষ্য করে যে দমনমূলক অভিযান চালানো হচ্ছে, এই ষড়যন্ত্র তারই অংশ। এমন পাল্টাপাল্টি অভিযোগের ফলে বর্তমানে ওয়াশিংটন, অটোয়া ও নয়াদিল্লির মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কে ব্যাপক টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে।
'শিখ রাষ্ট্র খালিস্তান প্রতিষ্ঠাই আমার জীবনের লক্ষ্য'
এফবিআইয়ের নিউইয়র্ক অফিসের প্রধান জেমস সি বার্নাকল জুনিয়র বলেন, নিখিল গুপ্ত ভারত সরকারের একজন কর্মকর্তার সঙ্গে মিলে এই হত্যার পরিকল্পনা সাজিয়েছিলেন। ওই কর্মকর্তাই তাকে সব নির্দেশনা দিয়েছিলেন।
প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, ভারতের গোয়েন্দা কর্মকর্তা বিকাশ যাদব এই পুরো ষড়যন্ত্রের মূল হোতা ছিলেন। বর্তমানে পলাতক এই কর্মকর্তা ২০২৩ সালের মে মাসে নিখিল গুপ্তকে ভাড়াটে খুনি নিয়োগের দায়িত্ব দিয়েছিলেন।
তবে ভারত সরকার এই ঘটনায় কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার কথা সরাসরি অস্বীকার করেছে। ভারতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এ ধরনের কোনো অভিযান চালানো দেশটির সরকারি নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থি।
এ মামলা যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় বসবাসরত শিখ কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
শুক্রবারের শুনানিতে পান্নুনের প্রায় দুই ডজন সমর্থক আদালতে উপস্থিত ছিলেন। শুনানি শেষে তারা আদালত প্রাঙ্গণের বাইরে প্রার্থনা করেন এবং শিখদের পবিত্র স্লোগান দেন। এ সময় তাদের হাতে হলুদ রঙের 'খালিস্তান' পতাকা ছিল।
ভারত সরকার পান্নুনকে 'সন্ত্রাসবাদী' ঘোষণা করলেও শুনানির পর এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, 'বুলেটের মুখোমুখি হতে হলেও' তিনি এ আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। বার্তা সংস্থা এপিকে তিনি বলেন, 'আমি কোনো সন্ত্রাসী নই।'
পান্নুন নিজেকে একজন শিখ ও মানবাধিকার আইনজীবী হিসেবে পরিচয় দিয়ে বলেন, তিনি পাঞ্জাবকে এমন একটি অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার লড়াই করছেন যেখানে 'সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার থাকবে'।
নিখিল গুপ্তকে কেবল একজন 'আজ্ঞাবহ কর্মী' হিসেবে অভিহিত করে পান্নুন মার্কিন প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান, এই ষড়যন্ত্রের নেপথ্যের মূল কুশীলবদের যেন খুঁজে বের করা হয়।
তিনি অভিযোগ করেন, 'ভারত সরকার কেবল একজন সাধারণ কর্মীর আড়ালে নিজেদের দায় এড়াতে পারে না; কারণ এই পরিকল্পনার আদেশ, দিকনির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান—সবই এসেছে খোদ ভারত সরকারের পক্ষ থেকে।'
শিখরা ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠী। শিখরা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ২ শতাংশ। কিছু গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে শিখদের জন্য আলাদা রাষ্ট্রের দাবি জানিয়ে আসছে।
বর্তমানে ভারতে এ আন্দোলনের বিশেষ প্রভাব নেই। এমনকি শিখ সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য পাঞ্জাবসহ ভারতের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোও এই দাবির বিরোধী। তবে প্রবাসে বসবাসরত শিখদের একটি অংশ এখনো খলিস্তানের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।
