ভারত-যুক্তরাষ্ট্র অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তি: উত্তর মেলেনি যে চার প্রশ্নের
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। শুক্রবার চুক্তির বিষয়ে কিছু নতুন তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর ভারতের বিরোধী দল, কৃষক সংগঠন এবং বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এক যৌথ বিবৃতিতে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, ভারত আগামী পাঁচ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ৫০ হাজার কোটি (৫০০ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য কিনবে। কিন্তু রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা বন্ধের বিষয়ে দিল্লির কোনো প্রতিশ্রুতির উল্লেখ সেখানে নেই।
গত সপ্তাহের শুরুতে দুই দেশ বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা দেয়। এতে যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক বা ট্যারিফ ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করার কথা জানায়।
চূড়ান্ত দরকষাকষি এখনো চলছে। তবে অন্তর্বর্তী এই চুক্তি চারটি বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
১. পাওয়ার চেয়ে কি বেশি দিচ্ছে ভারত?
চুক্তি অনুযায়ী, ভারত সব ধরনের মার্কিন শিল্পপণ্য এবং বেশ কিছু কৃষি ও খাদ্যপণ্যের ওপর তাদের সাধারণ শুল্ক কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র কেবল ভারতের ৫৫ শতাংশ রপ্তানি পণ্যের ওপর 'পারস্পরিক শুল্ক' কমাবে। এটি ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশে আনা হবে।
দিল্লিভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক 'গ্লোবাল ট্রেড অ্যান্ড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ' (জিটিআরআই) বলছে, এটি একটি 'অসম বিনিময়' বা লেনদেন।
ভারতের সাবেক অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরমের মতো বিরোধী নেতারা বলছেন, এই কাঠামোটি 'যুক্তরাষ্ট্রের দিকে বেশি ঝুঁকে আছে এবং এর অসমতা স্পষ্ট'।
তবে ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল চুক্তির পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা ১৮ শতাংশ শুল্ক তাদের বাণিজ্যিক অংশীদারদের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। এতে ভারতের বস্ত্র, চামড়া ও রত্নপাথরের মতো শ্রমঘন খাতগুলো লাভবান হবে।
বেশির ভাগ শিল্প সংগঠনও চুক্তিটিকে স্বাগত জানিয়েছে।
২. দিল্লি কি রুশ তেল কেনা বন্ধ করবে?
দিল্লি রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কি না, তা এখনো অস্পষ্ট।
গত সপ্তাহে চুক্তির ঘোষণার সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ভারত এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু যৌথ বিবৃতিতে এর কোনো উল্লেখ নেই। আলাদা এক নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প বলেছেন, ভারত 'প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে' রুশ তেল কেনা শুরু করে কি না, তা যুক্তরাষ্ট্র নজরে রাখবে। এর ওপর ভিত্তি করেই ঠিক হবে ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক আবার চাপানো হবে কি না।
এদিকে বার্তা সংস্থা এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাণিজ্যমন্ত্রী গোয়াল বলেন, তেল কেনার সিদ্ধান্ত 'স্বতন্ত্র কোম্পানিগুলো' নেয়। বাণিজ্য চুক্তি ঠিক করে দেয় না 'কে কার কাছ থেকে কী কিনবে'।
রাশিয়াও জানিয়েছে, তেল সরবরাহ বন্ধের বিষয়ে দিল্লির কাছ থেকে তারা কোনো ইঙ্গিত পায়নি।
গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ভারতীয় রিফাইনারি বা শোধনাগারগুলো নতুন করে রুশ তেল কেনা এড়াচ্ছে, তবে কিছু পূর্বনির্ধারিত চালান এখনো আসার কথা রয়েছে।
ভারতের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো বিবৃতি না থাকায় বিরোধীরা দাবি করছেন, সংসদের স্বচ্ছতা ছাড়াই সরকার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।
কৌশলগত বিশ্লেষক ব্রহ্ম চেলানি এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, 'রাশিয়া থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আমদানি বন্ধের শর্তে ২৫ শতাংশ শুল্ক মওকুফ করে ওয়াশিংটন ভারতের পররাষ্ট্রনীতিকে বাগে আনতে বাণিজ্যকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।'
৩. চুক্তিতে কি কৃষকদের ক্ষতি হবে?
এই চুক্তিতে ভারতের কৃষক ইউনিয়নগুলো ক্ষুব্ধ। তারা সতর্ক করে বলেছে, মার্কিন কৃষি পণ্যের ওপর শুল্ক কমালে দেশীয় উৎপাদকরা বিপদে পড়বেন।
২০২০ ও ২০২১ সালে কৃষি আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া 'সংযুক্ত কিসান মোর্চা' জানিয়েছে, ড্রাইড ডিস্টিলার্স গ্রেইন, সয়াবিন তেল, লাল জোয়ার, বাদাম ও ফলের মতো পণ্য অবাধে আমদানির সুযোগ দিলে কৃষকদের আয় কমবে।
তারা বাণিজ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছে এবং আন্দোলন জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছে।
জিটিআরআই-এর মতে, চুক্তিতে শুল্ক কমানোর তালিকায় থাকা 'অতিরিক্ত কৃষি পণ্য' নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে।
ব্রোকারেজ হাউস 'সিস্টেমেটিক্স রিসার্চ' এক নোটে বলেছে, শুল্ক কমানোর তালিকায় কৃষি ও খাদ্যপণ্য রাখলে 'দেশীয় ক্ষোভ' তৈরি হতে পারে। কৃষক সংগঠনগুলো ভুট্টা, সয়াবিন, দুগ্ধজাত পণ্য ও বাদামের দাম পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে।
তবে গোয়াল বলেছেন, ভারত দুগ্ধজাত পণ্য, জিএম বা জীনগত পরিবর্তন করা পণ্য, মাংস বা পোলট্রির ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেয়নি। কৃষকদের সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
তার যুক্তি, এই চুক্তি শেষ পর্যন্ত রপ্তানির সুযোগ বাড়িয়ে কৃষকদেরই সাহায্য করবে।
৪. ৫০০ বিলিয়ন ডলারের কেনাকাটার প্রতিশ্রুতি কি বাস্তবসম্মত?
চুক্তির আওতায় ভারত আগামী পাঁচ বছরে ৫০ হাজার কোটি ডলারের মার্কিন পণ্য কেনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি, বিমান, প্রযুক্তিপণ্য এবং কোকিং কোল।
সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছেন, এটি আদৌ সম্ভব কি না।
জিটিআরআই-এর মতে, এর জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতের বার্ষিক আমদানি প্রতি বছর দ্বিগুণের বেশি হতে হবে। তাছাড়া এই ঘোষণাটি বেসরকারি খাতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল, যা সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই।
সিস্টেমেটিক্স রিসার্চ সতর্ক করে বলেছে, এই প্রতিশ্রুতি 'ভারতের আমদানি বিল বাড়িয়ে দিতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত কমিয়ে দিতে পারে'। এতে দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্যে চাপ পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তবে গোয়াল এই লক্ষ্যমাত্রাকে 'অত্যন্ত রক্ষণশীল' বা কম করে ধরা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বিমান, জ্বালানি এবং ডেটা সেন্টারের যন্ত্রপাতির ক্রমবর্ধমান চাহিদার কথা উল্লেখ করেন।
তিনি জানান, ভারতের হাতে ইতিমধ্যে হাজার কোটি ডলারের বিমানের অর্ডার রয়েছে। অর্থনীতি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমদানিও বাড়বে বলে তিনি আশা করেন।
এত সব প্রশ্নের পরও চুক্তির ঘোষণার পর ভারতের শেয়ার বাজার চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। শুল্ক হ্রাস, শক্তিশালী জ্বালানি সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক সহযোগিতা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে—এমনটাই আশা করা হচ্ছে।
