জাপানের সামুরাইদের অর্ধেকই ছিলেন নারী; ব্রিটিশ মিউজিয়ামের প্রদর্শনীতে উঠে এল অজানা ইতিহাস
জাপানের ইতিহাস মানেই সামুরাই যোদ্ধাদের বীরত্বের কথা। আমাদের চোখে সামুরাই মানেই তলোয়ার হাতে কোনো দুর্ধর্ষ পুরুষ যোদ্ধা। কিন্তু সেই ধারণা এবার পাল্টে দিতে যাচ্ছে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের নতুন এক প্রদর্শনী, যেখানে উঠে এসেছে এক চমকপ্রদ তথ্য—জাপানের সামুরাইদের অর্ধেকই ছিলেন নারী!
ব্রিটিশ মিউজিয়ামে আয়োজিত 'সামুরাই' নামের এই প্রদর্শনীতে জাপানের এই যোদ্ধা শ্রেণির অজানা ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। দেখানো হয়েছে কীভাবে যুগের পর যুগ ধরে সামুরাইদের নিয়ে প্রবাদ তৈরি হয়েছে, কীভাবে তাদের ভাবমূর্তি গড়ে তোলা হয়েছে।
প্রচলিত ধারণা ভেঙে সামুরাইদের প্রকৃত ইতিহাস মানুষের সামনে আনাই এই প্রদর্শনীর মূল লক্ষ্য।
প্রদর্শনীতে ২৮০টিরও বেশি ঐতিহাসিক নিদর্শন এবং ডিজিটাল মিডিয়া উপস্থাপন করা হয়েছে। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের নিজস্ব সংগ্রহের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি ২৯টি প্রতিষ্ঠান থেকে এসব দুর্লভ বস্তু সংগ্রহ করা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে সামুরাইদের ব্যবহৃত অস্ত্র, বর্ম, চিত্রকর্ম, কাঠের ব্লকের ছাপচিত্র, বই, পোশাক, সিরামিক এবং দুর্লভ আলোকচিত্র। এমনকি প্রথমবারের মতো একটি বিশেষ সামুরাই বর্মও প্রদর্শিত হচ্ছে।
জাপানে সামুরাইদের উত্থান ঘটেছিল মধ্যযুগের শুরুতে, অর্থাৎ ১১০০ থেকে ১৬০০ সালের মধ্যে। সে সময় ধনী পরিবারগুলো তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য এসব যোদ্ধাকে নিয়োগ দিত। কালক্রমে তারাই জাপানের ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী শ্রেণিতে পরিণত হয়।
ভাড়াটে যোদ্ধা হিসেবে শুরু হলেও ১৬১৫ সালের দিকে সামুরাইরা গ্রামীণ অভিজাত শ্রেণিতে পরিণত হয়। যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে তারা সরকার পরিচালনা, জ্ঞানচর্চা এবং শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষক হিসেবে আবির্ভূত হয়। ঠিক এই সময়েই সামুরাই সমাজের অর্ধেক অংশজুড়ে ছিল নারীদের অবস্থান।
তারা হয়তো সরাসরি তলোয়ার হাতে যুদ্ধ করতেন না, তবে অভিজাত সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্র এবং এর বাইরে—উভয় ক্ষেত্রেই ছিল তাদের জোরালো ভূমিকা।
'সামুরাই' শব্দের ভুল ব্যাখ্যার কারণেই এমন বিভ্রান্তি বলে মনে করেন ব্রিটিশ মিউজিয়ামের জাপানি সংগ্রহের কিউরেটর ড. রোজিনা বাকল্যান্ড। তিনি বলেন, 'সামুরাই মানেই যে যোদ্ধা—এই ধারণাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। শব্দটির সংকীর্ণ ব্যবহারের কারণেই আমরা অবাক হই যে নারীরাও সামুরাই ছিলেন।'
প্রদর্শনীতে তোমোয়ে গোজেন নামের এক বিখ্যাত নারী সামুরাইয়ের বীরত্বের কথা তুলে ধরা হয়েছে। ১২৪৭ সালে মারা যাওয়া এই নারীর সাহসিকতার গল্প 'দ্য টেল অব দ্য হেইকে'-তে বর্ণিত আছে। বলা হয়, উচিদা সাবুরো ইয়েয়োশি নামের এক সামুরাই তাকে বন্দি করে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করলে তোমোয়ে তার মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিলেন।
যুদ্ধ যখন কমে এল, তখন সামুরাই নারীদের পোশাকেও আভিজাত্যের ছাপ পড়তে শুরু করে। উচ্চপদস্থ নারীরা প্রকৃতির ছবি ও জাপানি সাহিত্যের ছোঁয়া থাকা লম্বা ঝুলের পোশাক পরতেন। অবিবাহিত সামুরাই নারীরা তাদের মর্যাদা বোঝাতে কিমোনোর হাতায় বিশেষ নকশা ব্যবহার করতেন।
প্রদর্শনীতে আরও জানা যায়, এই নারীদের মূলত সংসার পরিচালনা, সন্তান পালন এবং বিবাহিত জীবনের জন্য শিক্ষিত করে গড়ে তোলা হতো। সামাজিক শিষ্টাচার, সঠিক আচরণ এবং সাংস্কৃতিক শিক্ষা ছিল তাঁদের বেড়ে ওঠার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
শুধু ইতিহাস নয়, আধুনিক পপ কালচারেও সামুরাইদের প্রভাব কতটা গভীর, তা-ও উঠে এসেছে এই প্রদর্শনীতে। চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, মাঙ্গা (জাপানি কমিকস), ভিডিও গেম এবং সমসাময়িক শিল্পকলায় সামুরাইদের উপস্থিতি নিয়ে একটি বিশেষ অংশ রাখা হয়েছে। সেখানে স্থান পেয়েছে বিখ্যাত জাপানি শিল্পী নোগুচি তেৎসুয়ার বিশেষ শিল্পকর্মও।
ড. বাকল্যান্ড বলেন, 'ইতিহাসবিদেরা সব সময়ই জানতেন যে সাধারণ মানুষের ধারণা আর প্রকৃত ইতিহাসের মধ্যে বেশ ফারাক থাকে। বেশির ভাগ সংস্কৃতির ক্ষেত্রেই এটি সত্য।
'সময়ের ব্যবধানে ইতিহাস আর সাধারণ মানুষের ধারণার মধ্যে অনেক তফাত তৈরি হয়। হলিউডের সিনেমা বা পপ কালচারে আমরা সামুরাইদের যে রূপ দেখি, তা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে সত্যের ছিটেফোঁটা থাকলেও বেশির ভাগই অতিরঞ্জিত। ইতিহাসের গভীরে গেলে পাওয়া যায় ভিন্ন চিত্র,' বলেন তিনি।
প্রদর্শনীটি মূলত তিনটি ভাগে সাজানো হয়েছে: যোদ্ধা হিসেবে সামুরাই, আমলা ও সংস্কৃতিমনা শ্রেণি হিসেবে তাদের রূপান্তর এবং আধুনিক পপ কালচারে তাদের প্রভাব।
১৬১৫ সালের পর যুদ্ধ যখন থামল, তখন জাপানে টানা ২৫০ বছর শান্তি বিরাজ করছিল। ড. বাকল্যান্ড জানান, ওই সময়ে সামুরাইরা কার্যত 'নামমাত্র যোদ্ধা' হয়ে ওঠেন। তাদের আর যুদ্ধ করতে হতো না।তাঁরা অনেকটা এখনকার দিনের 'স্যুট-টাই পরা' সরকারি কর্মকর্তাদের মতো জীবন যাপন করতেন।
প্রদর্শনীর এই অংশে সামুরাইদের দৈনন্দিন জীবন তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, নারী সামুরাইরা কীভাবে সাজসজ্জা করতেন। তাদের ব্যবহৃত পোশাক, আয়না, চিরুনি সেট ও আদবকেতার বই রাখা হয়েছে প্রদর্শনীতে। বই লেখা বা শিল্পচর্চায় তাঁদের আগ্রহের নিদর্শনও মিলবে এখানে।
ব্রিটিশ মিউজিয়ামের এই আয়োজনে বেশ কিছু দুর্লভ নিদর্শন রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম ১৭০০ থেকে ১৮০০ সালের মধ্যে তৈরি একটি সামুরাই বর্ম ও সোনালি হেলমেট। আরও আছে সামুরাই নারীদের ব্যবহৃত লাল রঙের বিশেষ অগ্নিনির্বাপণ জ্যাকেট এবং ১৫৮২ সালে ভ্যাটিকানে যাওয়া ১৩ বছর বয়সী এক কিশোর সামুরাইয়ের প্রতিকৃতি।
প্রাচীন ইতিহাসের পাশাপাশি আধুনিকতাও স্থান পেয়েছে এখানে। বিখ্যাত ফ্যাশন ব্র্যান্ড লুই ভুইতোর তৈরি জাপানি বর্ম দ্বারা অনুপ্রাণিত পোশাক এবং 'অ্যাসাসিনস ক্রিড: শ্যাডোজ' (২০২৫) ও 'নিওহ ৩' (২০২৬)-এর মতো জনপ্রিয় ভিডিও গেমের রেফারেন্সও রাখা হয়েছে।
ড. বাকল্যান্ড বলেন, 'সামুরাই শব্দটি সবার পরিচিত। এই পরিচিত শব্দটিকে পুঁজি করেই আমরা জাপানের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও ইতিহাসের জটিল বাঁকগুলো মানুষের সামনে তুলে ধরছি।'
ব্রিটিশ মিউজিয়ামে এই প্রদর্শনী শুরু হবে ২০২৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি, চলবে ৪ মে পর্যন্ত।
