কেন ‘ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনী’ গড়তে চাইছে জার্মানি?
বছরের শুরুতেই জার্মানির ১৮ বছর বয়সী তরুণদের কাছে পৌঁছাতে শুরু করেছে এক বিশেষ প্রশ্নপত্র। গত মাসে পাস হওয়া এক আইনের অধীনে তাদের সেনাবাহিনীর জন্য শারীরিক সক্ষমতা যাচাই করা হচ্ছে।
সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়াটা আপাতত ঐচ্ছিক। তবে সরকার চাইলে লক্ষ্য পূরণে একে বাধ্যতামূলকও করতে পারে। আর সেই লক্ষ্যটি হলো—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো 'ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনী' গড়ে তোলা।
গত নভেম্বরেই নিয়মিত সৈন্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৪ হাজারে। মে মাস থেকে এই সংখ্যা বেড়েছে আড়াই হাজার। মে মাসে চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মার্জ পার্লামেন্টে স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, জার্মানির সেনাবাহিনী বা 'বুন্দেসভার'কে হতে হবে 'ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রচলিত বাহিনী'।
পটসডামের বুন্দেসভার সেন্টার অফ মিলিটারি হিস্ট্রি অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেসের গবেষক টিমো গ্রাফ আল জাজিরাকে বলেন, 'দীর্ঘ সময় পর বাহিনীর আকার এত বড় হয়েছে। ২০২১ সালের পর এটিই আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনী।'
সরকার ২৩ মাসের চুক্তিতে স্বেচ্ছাসেবী সেনা নিয়োগ দিচ্ছে। এতে রয়েছে মোটা অঙ্কের বেতন ও নানা সুযোগ-সুবিধা। চাইলে এই চুক্তি অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানো যায়।
গ্রাফ বলেন, 'বেতন ধরা হয়েছে ২ হাজার ৬০০ ইউরো (৩ হাজার ডলার)। থাকার খরচ ও চিকিৎসা বিমা ফ্রি হওয়ায় কর কাটার পরেও হাতে থাকে প্রায় ২ হাজার ৩০০ ইউরো (২ হাজার ৭০০ ডলার)। তরুণদের জন্য এটা অনেক টাকা।'
ন্যাটোর কাছে জার্মানি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে ২০৩৫ সালের মধ্যে তাদের নিয়মিত সৈন্যসংখ্যা ২ লাখ ৬০ হাজারে উন্নীত করবে। পাশাপাশি রিজার্ভ সৈন্যের সংখ্যা দ্বিগুণ করে ২ লাখে নেওয়া হবে। এটি হলে স্নায়ুযুদ্ধের শেষের দিকে তাদের যে ৫ লাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনী ছিল, জার্মানি আবারও সেই অবস্থানে পৌঁছাবে।
এই খবরে মস্কো বেশ অস্বস্তিতে পড়েছে। জার্মানিতে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত সের্গেই নেচায়েভ গত মাসে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, 'জার্মানির নতুন সরকার রাশিয়ার সঙ্গে পূর্ণমাত্রার সামরিক সংঘাতের প্রস্তুতি ত্বরান্বিত করছে।'
তবে জার্মানির দৃষ্টিকোণ ভিন্ন। ইউক্রেন থেকে সেনা প্রত্যাহারে রাশিয়ার অস্বীকৃতিই তাদের সামরিক শক্তি বাড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এই বছর সশস্ত্র বাহিনী পুনর্গঠনে ১০ হাজার ৮০০ কোটি ইউরো (১২৫ বিলিয়ন ডলার) ব্যয় করা হচ্ছে, যা জিডিপির ২.৫ শতাংশ। এটি ২০২১ সালের বাজেটের (৪৮ বিলিয়ন ইউরো) দ্বিগুণেরও বেশি।
গ্রাফ বলেন, 'মাত্র এক বছরে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর পক্ষে জনসমর্থন ৫৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।' ২০৩০ সালের মধ্যে জার্মানি প্রতিরক্ষায় জিডিপির ৩.৫ শতাংশ ব্যয় করবে।
ডিসেম্বরের এক জরিপে দেখা গেছে, ১০ জনের মধ্যে ৮ জন জার্মানই মনে করেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে শান্তি চুক্তির বিষয়ে আন্তরিক নন। গোয়েন্দাদের সতর্কবার্তাও অনেকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে, রাশিয়া শেষ পর্যন্ত ন্যাটো দেশগুলোতেও হামলা চালাবে।
গ্রাফ বলেন, 'রাশিয়া ২০২৯ সালে ন্যাটোতে হামলা করতে পারে—এমন একটি সময়সীমা মানুষের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। গত চার বছরের যুদ্ধ দেখে মনে হচ্ছে আমরা ঘুমের মধ্যে হাঁটছিলাম, পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝিনি। এখন ইউরোপের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে।'
ট্রাম্পের আমেরিকার ওপর আস্থা নেই জার্মানদের
রাশিয়ার হুমকি মুদ্রার এক পিঠ মাত্র। অন্য পিঠে রয়েছে গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর জার্মান সমাজের আস্থা হারানো।
২০২৫ সালের জুনে এক জরিপে প্রশ্ন করা হয়েছিল, 'যুক্তরাষ্ট্র কি ন্যাটোর অংশ হিসেবে ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে?' ৭৩ শতাংশ জার্মান বলেছিলেন, 'না'। ডিসেম্বরে এই সংখ্যা বেড়ে ৮৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
১০ জনের মধ্যে ৯ জন জার্মান এখন ইউরোপে মার্কিন রাজনৈতিক প্রভাবকে ক্ষতিকর মনে করেন। গত নভেম্বরে প্রকাশিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে ইউরোপের কড়া সমালোচনা করা হয়। এতে বলা হয়, ব্রাসেলসের অতিরিক্ত নিয়মকানুন এবং অভিবাসন নীতির কারণে ইউরোপের 'সভ্যতা মুছে যাওয়ার' ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ইউরোপে মার্কিন বাহিনীর সাবেক কমান্ডার জেনারেল বেন হজেস আল জাজিরাকে বলেন, 'তারা বুঝতে পেরেছে... জার্মানিকে সাহায্য করার কোনো আগ্রহই ট্রাম্পের নেই। ট্রাম্পের ওই জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল ছিল ইউরোপের প্রতি এক বড় অপমান।'
ওয়াশিংটনের ওপর জার্মানদের আস্থা এতটাই কমেছে যে, ১০ জনের মধ্যে ৬ জন এখন যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক সুরক্ষার ওপরও ভরসা রাখতে পারছেন না। তিন-চতুর্থাংশ মানুষ চান এর বদলে অ্যাংলো-ফ্রেঞ্চ (ব্রিটিশ-ফরাসি) ব্যবস্থা আসুক।
গ্রাফ বলেন, 'যারা ন্যাটোকে গুরুত্ব দেয় এবং যারা ইইউ-পন্থী, তারা সবাই এখন একটি ইউরোপীয় ন্যাটোর ধারণায় একমত। জার্মানরা এখনো ন্যাটোকে গুরুত্ব দেয়, কিন্তু তারা বিশ্বাস করে না যে আমেরিকানরা তাদের দায়িত্ব পালন করবে।'
বুন্দেসভারের জরিপে দেখা গেছে, ইউরোপীয় সেনাবাহিনীর প্রতি সমর্থন গত এক বছরে ১০ পয়েন্ট বেড়ে ৫৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
জার্মানি কি পারবে?
মার্জের এই প্রতিশ্রুতি নতুন কিছু নয়। তার পূর্বসূরি ওলাফ শোলজও ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণের পর একই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
শোলজ পার্লামেন্টে ১২০ বিলিয়ন ডলারের বাড়তি তহবিল অনুমোদন করিয়েছিলেন, কিন্তু সেই টাকা ২০২৪ সালের আগে কাজে আসেনি।
তখন আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে দায়ী করা হলেও অনেকে মনে করেন এর পেছনে সাংস্কৃতিক বাধাও ছিল।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মিনা অ্যালান্ডার বলেন, 'বুন্দেসভারকে ইতিবাচকভাবে দেখা হতো না। সুস্থ মস্তিষ্কের কেউ একে পেশা হিসেবে নিত না।'
জেনারেল হজেস বলেন, 'শিক্ষিত ও বয়স্ক জার্মানরা নাৎসি জার্মানির ভয়াবহতার গল্প শুনে বড় হয়েছেন। যুদ্ধের সময় যারা শিশু ছিলেন, তাদের কাছে রাশিয়া কিংবা আমেরিকা ছাড়া যুদ্ধের কথা ভাবাটাই ছিল সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন।'
তবে ২০২২ সালের পর থেকে ধারণা দ্রুত পাল্টেছে।
মার্জ ক্ষমতায় এসে মস্কো ও ওয়াশিংটন—উভয়েরই নিন্দা জানিয়েছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে 'স্বাধীনতা' দাবি করেছেন। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই পার্লামেন্ট সাংবিধানিক ঘাটতির সীমা স্থগিত করে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর অনুমতি দিয়েছে। গত মাসে অস্ত্র কেনার জন্য প্রায় ৬ হাজার কোটি ডলার (৬০ বিলিয়ন) অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
'আমরা ইউরোপীয় প্রক্রিয়ার ওপর ভরসা করি না'
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ক্রেমলিনপন্থী প্রচারণাকারীরা এখনো মানুষের মনে সন্দেহ ঢোকানোর চেষ্টা করবে।
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের হাইব্রিড যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ ভিক্টোরিয়া ভদোভিচেঙ্কো বলেন, 'বাধ্যতামূলক সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার বিষয়টিকে রাশিয়া তাদের প্রোপাগান্ডায় ব্যবহার করছে। তারা প্রচার করবে যে, জার্মানরা তাদের বাচ্চাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।'
অর্থ ও রাজনৈতিক ইচ্ছাকে শিল্প সক্ষমতা ও শক্তিতে রূপান্তর করতে কত সময় লাগবে, তা নিয়েও তিনি সন্দিহান। বেলারুশ ও কালিনিনগ্রাদের মাঝখানে অবস্থিত পোল্যান্ড-লিথুয়ানিয়া সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা 'সুওয়ালকি গ্যাপ' রক্ষায় শোলজ একটি ব্রিগেড তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তার নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ এখনো চলছে।
ইউক্রেনীয় বংশোদ্ভূত ভদোভিচেঙ্কো বলেন, 'আমরা বোকা নই। তাই আমরা ইউরোপীয় প্রক্রিয়ার ওপর বা কেউ দেবতা হয়ে আমাদের বাঁচাতে আসবে—এমন ধারণার ওপর ভরসা করি না। আমরা নিশ্চিতভাবেই বুঝি, আমাদের নিজেদের লোকরাই সব সময় লড়াইয়ের ময়দানে থাকবে।'
