জ্বালানি তেলের বাজার স্থিতিশীল ও পরিবহন পথ সুরক্ষিত করতে এগিয়ে আসছে ইউরোপ-জাপান
মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি কেন্দ্রগুলোতে পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ চরম আকার ধারণ করায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল করতে এবং কৌশলগত তেল পরিবহন পথ সচল রাখতে পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইউরোপের শীর্ষ দেশসমূহ ও জাপান। বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) এক যৌথ বিবৃতিতে দেশগুলো এই ঘোষণা দেয়।
সম্প্রতি ইসরায়েল কর্তৃক ইরানের একটি প্রধান গ্যাসক্ষেত্রে বোমা হামলার প্রতিবাদে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কাতারের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন 'কাতার এনার্জি'র 'রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি'তে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। রাস লাফান বিশ্বের মোট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ প্রক্রিয়াজাত করে। এছাড়া সৌদি আরবের লোহিত সাগরের প্রধান বন্দরেও হামলা হয়েছে, যা মূলত হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে তেল রপ্তানির বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস এবং জাপানের নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে তেল-গ্যাস স্থাপনা ও বেসামরিক অবকাঠামোতে অবিলম্বে হামলা বন্ধের জোর দাবি জানিয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "আমরা হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে যথাযথ প্রচেষ্টায় অবদান রাখতে আমাদের প্রস্তুতি প্রকাশ করছি। এছাড়া জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল করতে উৎপাদন বাড়াতে আমরা তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করব।"
যুদ্ধের প্রবাদে ইউরোপীয় বাজারে গ্যাসের দাম ২৫ শতাংশ এবং ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রায় ৬ শতাংশ বেড়ে ১১৩ ডলারে পৌঁছেছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইউরোপে গ্যাসের দাম বেড়েছে প্রায় ৬০ শতাংশের বেশি। এর ফলে মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কায় ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি) এবং ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড সুদের হার স্থিতিশীল রেখেছে। জাপানি এবং দক্ষিণ কোরীয় স্টক মার্কেটে ৩ শতাংশ এবং ইউরোপীয় সূচকে ২.৫ শতাংশ দরপতন হয়েছে।
বুধবার থেকে ইরানের বিমান হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের 'হাবশান' গ্যাস কেন্দ্র বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে এবং কুয়েতের দুটি প্রধান তেল শোধনাগারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা ইয়ানবু বন্দরের দিকে আসা একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে।
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাকারি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, "যদি ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় পুনরায় হামলা হয়, তবে আপনাদের এবং আপনাদের মিত্রদের জ্বালানি অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত আমাদের হামলা থামবে না। এটি যুদ্ধের একটি নতুন পর্যায়।"
অন্যদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য অপরিবর্তিত রয়েছে—যা হলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং নৌবাহিনী ধ্বংস করা এবং তাদের কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না দেওয়া।
ইরানের গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলি হামলার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, এই হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকে কিছু জানত না। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, "ইসরায়েল রাগের বশে ইরানের 'সাউথ পার্স গ্যাস ফিল্ড'-এ হামলা চালিয়েছে। এরপর ইরান কাতারের এলএনজি স্থাপনায় অন্যায্যভাবে আক্রমণ করেছে।" ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, ইরান যদি পুনরায় কাতারে হামলা চালায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সাহায্য ছাড়াই পুরো সাউথ পার্স গ্যাস ফিল্ড উড়িয়ে দেবে।
তবে তিনটি ইসরায়েলি সূত্র দাবি করেছে, ট্রাম্পের সম্মতিতেই ওই হামলা চালানো হয়েছিল। ইসরায়েল মনে করে, ইরানের ওপর অব্যাহত সামরিক চাপ এবং শীর্ষ নেতাদের হত্যা শেষ পর্যন্ত সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে পারে, যদিও তেহরানের পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণের কোনো শিথিলতা এখনো দেখা যায়নি।
রয়টার্স জানিয়েছে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে নিজ দেশে রাজনৈতিকভাবে চাপে থাকা ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে আরও হাজার হাজার মার্কিন সেনা পাঠানোর কথা বিবেচনা করছেন। এসব সেনা হরমুজ প্রণালী পুনরুদ্ধার বা এমনকি ইরানের উপকূল বা 'খাগ দ্বীপ' তেল হাবে নামানোর কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। ট্রাম্প মিত্রদের সহযোগিতা চাইলেও এখন পর্যন্ত তেমন সাড়া পাননি।
মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ-এর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানে ৩ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়েছেন। লেবাননে ৯০০ জন নিহত এবং ৮ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এছাড়া ইরান থেকে ছোঁড়া হামলায় ইরাক ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে বহু প্রাণহানি ঘটেছে এবং যুদ্ধে অন্তত ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন।
