কাতারের জ্বালানি স্থাপনায় ইরানের হামলা, গ্যাসের দামে ২৫% উল্লম্ফন
মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামোতে নতুন করে হামলার পর বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। কাতারের প্রধান গ্যাস স্থাপনা রাস লাফান-সহ বিভিন্ন স্থাপনায় ইরানের পাল্টা হামলার জেরে এই মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। খবর বিবিসির।
এতে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের পাইকারি বাজারে দিনের শুরুতে গ্যাসের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়, যদিও পরে কিছুটা কমে আসে।
বর্তমানে ইউরোপে গ্যাসের দাম ইরান যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
অন্যদিকে তেলের বাজারেও ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। ব্রেন্ট ক্রুড-এর দাম বৃহস্পতিবার সকালে ১০ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৯ ডলারে পৌঁছায়, যদিও দুপুরের পর তা কমে ১১২ ডলারে নেমে আসে।
যুক্তরাজ্যে বর্তমানে গ্যাসের দাম প্রতি থার্মাল ইউনিটে ১৬৫ পেন্স, যা ১৯ শতাংশ বেশি। যদিও দিনের শুরুতে তা প্রায় ১৮৩ পেন্সে পৌঁছেছিল।
এদিকে ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম তিন বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বুধবার সন্ধ্যায় ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলার পর এই দাম বৃদ্ধি ঘটে। এটি বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্রগুলোর একটি।
এর জবাবে ইরান কাতারের একটি বড় এলএনজি রপ্তানি স্থাপনায় হামলা চালায়, যা "ব্যাপক ক্ষতি" করেছে বলে জানা গেছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
রাস লাফান রপ্তানি অঞ্চলে ইরানের এ হামলার ঘটনা ঘটে, যা রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি নামে পরিচিত। এর আগে খবর পাওয়া যায়, ইসরায়েল ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রের পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে হামলা চালিয়েছে।
সর্বশেষ পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
জাপানের নিক্কেই-২২৫ সূচক ৩.৪ শতাংশ কমেছে, আর লন্ডনের এফটিএসই-১০০ সূচক দুপুরের দিকে ২.৫ শতাংশ নিচে ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি প্রধান সূচকও নিম্নমুখী অবস্থায় লেনদেন শুরু করে।
দ্য ইকোনমিস্ট-এর পণ্যবিষয়ক সম্পাদক, ম্যাথু ফাভাস বলেন, গ্যাসের দামের এই বৃদ্ধি "বিশাল"।
তিনি বলেন, "কাতারের গ্যাস স্থাপনায় হামলার কারণেই এটি ঘটেছে। এটি বন্ধ রাখা হয়েছিল, ধারণা ছিল কয়েক সপ্তাহের মধ্যে চালু হবে। কিন্তু এখন সরাসরি কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতের ফলে তা দ্রুত চালু হওয়া সম্ভব নয় বলে দেখা যাচ্ছে।
"এই ব্যাঘাত কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এই স্থাপনাগুলো বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহের প্রায় পাঁচভাগের একভাগ জোগান দেয়। তাই বাজারে এমন প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কা দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।"
তবে তিনি বলেন, রাশিয়ার ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর যে পর্যায়ে দাম উঠেছিল, এখনো তা সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
ইরানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলার জবাবে তারা "নির্ণায়ক পদক্ষেপ" নেবে।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের-ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম তাসনিমে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, "আমাদের দেশের জ্বালানি, গ্যাস ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর ওপর যদি আমেরিকান-জায়নিস্ট শত্রুরা হামলা চালায়, তাহলে আমরা শুধু শক্ত প্রতিরোধই নয়, বরং সেই হামলার উৎসেও কঠোর আঘাত হানব।"
"আমরা জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বৈধ মনে করি এবং যথাসময়ে কঠোর প্রতিশোধ নেব," বলেও সতর্ক করা হয়।
কাতার ইরানের সঙ্গে যৌথভাবে সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রের একটি অংশ পরিচালনা করে, যাকে তারা নর্থ ডোম বলে। তবে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলএনজি উৎপাদনকারী দেশটি যুদ্ধের কারণে চলতি মার্চের শুরুতেই উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছিল।
সাউথ পার্সে হামলার পর সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে রাশ লাফানের নাম উল্লেখ করেছিল ইরান।
বুধবার সন্ধ্যা ৭টার কিছু পর কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, রাশ লাফানে আগুন "প্রাথমিকভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে" এবং কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
জ্বালানি কোম্পানি বিপি-এর সাবেক প্রধান কৌশলবিদ নিক বাটলার বলেন, এই হামলা বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।
তিনি বলেন, "এই গ্যাসের ঘাটতি দ্রুত কোনো বিকল্প ব্যবস্থা দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়, বরং দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। ফলে দাম আরও বাড়বে।"
"আমার মনে হয় এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, বাজার মনে করছে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে। জ্বালানি ব্যবসায়ীদের দৃষ্টিতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প যেন এক ধরনের 'প্যান্ডোরার বাক্স' খুলে দিয়েছেন, এবং এখন অঞ্চলটিতে প্রতিদিন কী ঘটছে তার ওপর তিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন।"
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইরানের তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করার বিষয়টি বিবেচনা করছে ওয়াশিংটন।
তিনি বলেন, বর্তমানে সমুদ্রে থাকা প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ব্যারেল তেলের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।
এটি বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বাড়াতে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া অন্যান্য পদক্ষেপের অংশ, যার মধ্যে রয়েছে রাশিয়ার তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব বন্দরগুলোর মধ্যে তেল পরিবহনের নিয়ম শিথিল করা।
বর্তমানে বিশ্বে দৈনিক প্রায় ১০ কোটি ব্যারেল তেল ব্যবহার হয়।
