বৈশ্বিক খাদ্য সংকট এড়াতে সার সরবরাহ সচল করার তাগিদ ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর
বিপর্যয় এড়াতে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বিশ্বজুড়ে সারের সরবরাহ সচল করতে হবে, অন্যথায় ফসল উৎপাদন মারাত্মক ব্যাহত হবে এবং খাদ্যের দাম আরও বাড়বে বলে সতর্ক করেছেন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার।
ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সারের চালান পরিবহন স্থবির হয়ে পড়েছে। এর ফলে সৃষ্ট সরবরাহ ঘাটতি ইতোমধ্যেই যুক্তরাজ্য, ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিখাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তবে এর সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, যেখানে বাড়তি দাম দিয়ে সার কেনার সামর্থ্য সাধারণ কৃষকদের নেই।
ইভেট কুপার বলেন, "বিশ্ব এখন চোখ বুজে একটি বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। কেবল একটি দেশ আন্তর্জাতিক নৌপথকে জিম্মি করে রেখেছে বলে আমরা কোটি কোটি মানুষকে ক্ষুধার্ত রাখার ঝুঁকি নিতে পারি না।"
উত্তর গোলার্ধের দেশগুলোর জন্য বসন্তকাল হলো ফসল বোনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। কৃষকেরা যদি এই মুহূর্তে সার সরবরাহের নিশ্চয়তা না পান, তবে এর ক্ষতিকর প্রভাব আগামী বছরজুড়ে পোহাতে হবে। লন্ডনে বৈদেশিক সহায়তা ও উন্নয়ন বিষয়ক এক সরকারি সম্মেলনের আগে কুপার বলেন, "কৃষি ক্যালেন্ডারের সময় ফুরিয়ে আসছে, অথচ ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে রেখেছে। এই জলপথটি পুনরায় উন্মুক্ত করতে, সার ও জ্বালানি চলাচল সচল করতে এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ কমাতে এখন জরুরি বৈশ্বিক চাপের প্রয়োজন।"
তিনি আরও বলেন, "এই সংকট উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ এবং সরকারি ও বেসরকারি খাত—সব জায়গাতেই সমানভাবে আঘাত হানছে। এটি প্রমাণ করে যে, সংকট শুরু হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করতে এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে আমাদের বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। বিশ্ব যেভাবে দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা তার সাথে তাল মিলিয়ে সমর্থন দিতে পারছে না।"
ধনী দেশগুলোর সহায়তা হ্রাস এবং অংশীদারত্বের ভবিষ্যৎ
লন্ডনে আয়োজিত 'গ্লোবাল পার্টনারশিপস' সম্মেলনটি যৌথভাবে আয়োজন করেছে যুক্তরাজ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার, যেখানে সহযোগিতা করছে 'চিলড্রেনস ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড ফাউন্ডেশন'। সরকার, বেসরকারি বিনিয়োগকারী এবং সুশীল সমাজকে একসাথে কাজ করার নতুন পথ খুঁজতেই এই সম্মেলনের আয়োজন।
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং ঋণের পাহাড় তৈরি হওয়া সত্ত্বেও, অনেক ধনী দেশ তাদের বৈদেশিক সহায়তার পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে। যুক্তরাজ্যের পূর্ববর্তী সরকার তাদের বৈদেশিক সহায়তা জাতীয় আয়ের ০.৭% থেকে কমিয়ে ০.৫% করেছিল, যা বর্তমান লেবার সরকারের আমলে আরও কমে ০.৩%-এ নেমে এসেছে। অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা 'ইউএসএআইডি' কার্যত ভেঙে দিয়েছে।
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) অনুমান করছে যে, চলতি বছরের মধ্যভাগের মধ্যে যদি ইরান সংঘাতের অবসান না হয়, তবে আরও প্রায় সাড়ে ৪ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে পারে।
এমন প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন যে, বৈদেশিক সহায়তা প্রদান যুক্তরাজ্যের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থেরই অংশ। "বিদেশের অস্থিরতা আমাদের জ্বালানির দাম থেকে শুরু করে খাদ্য নিরাপত্তা পর্যন্ত সব কিছুতেই প্রভাব ফেলে। তাই বিদেশে সহনশীলতা তৈরি করা প্রকারান্তরে যুক্তরাজ্যকেই শক্তিশালী করে," বলেন তিনি।
যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রী জেনি চ্যাপম্যান দ্য গার্ডিয়ানকে জানিয়েছেন, বেসরকারি খাতের সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বিদ্যমান সহায়তার পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি করা সম্ভব। জলবায়ু অর্থায়নে আগামী তিন বছরে বার্ষিক ২ বিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ কমানো হলেও, চ্যাপম্যান বলেন, "আমরা আমাদের অবদান এবং দায়িত্ব থেকে একেবারেই পিছিয়ে যাচ্ছি না। কাজের ধরন পরিবর্তনের মাধ্যমে আমরা আরও বেশি জলবায়ু অর্থায়ন সংগ্রহ করতে পারি।"
এই সম্মেলনে ব্রিটিশ ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট (বিআইআই)—যা বেসরকারি খাতের সাথে সরকারি অর্থ বিনিয়োগের একটি সংস্থা—উদীয়মান বাজারগুলোতে জলবায়ু বিনিয়োগের জন্য ৪৬০ কোটি পাউন্ডের একটি তহবিল ঘোষণা করবে। এছাড়া আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের জন্য ২৫ কোটি ডলার এবং ইন্টার-আমেরিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে যুক্তরাজ্যের শেয়ারহোল্ডিং বাড়ানো হবে।
পাশাপাশি, কুপার গাজায় আহত শিশুদের সহায়তার জন্য একটি নতুন স্বাস্থ্য অংশীদারিত্ব, নতুন ওষুধ ও ভ্যাকসিন দ্রুত তৈরির জন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বাড়তি সহযোগিতা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে ২০ কোটি পাউন্ড বিনিয়োগের ঘোষণা দেবেন। উল্লেখ্য, উন্নত ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোর জোট জি-২০'র পরবর্তী সভাপতি হতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য।
অক্সফ্যাম গ্রেট ব্রিটেন-এর প্রধান নির্বাহী রিচার্ড হকস সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, "ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের অবৈধ হামলা এই অঞ্চলে বেসামরিক নাগরিকদের হতাহত ও বাস্তুচ্যুত করেছে। এর জবাবে ইরানের নেওয়া পাল্টা ব্যবস্থা, যার মধ্যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়াও রয়েছে—খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং লাখ লাখ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।"
তিনি আরও বলেন, "আমাদের জরুরি ভিত্তিতে একটি স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধবিরতি প্রয়োজন, যার মধ্যে এই অঞ্চলের সমস্ত বৈরীতার অবসান অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। চলতি বছর জি-৭ দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যের সহায়তা সবচেয়ে বেশি কমানো হয়েছে, যা বৈশ্বিক অস্থিরতা ও বৈষম্যকে আরও গভীর করার ঝুঁকি তৈরি করছে। সরকারের উচিত এই কাটছাঁট বাতিল করা এবং দারিদ্র্য ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অর্থ জোগাতে অতি-ধনী এবং শীর্ষ দূষণকারীদের ওপর কর আরোপ করা।"
