এবার হরমুজের তলদেশে নতুন শক্তির দিকে নজর ইরানের; অচল করে দিতে পারে বিশ্ব অর্থনীতির লুকানো 'ধমনি'
যুদ্ধ চলাকালে হরমুজ প্রণালিতে সফল নৌ-অবরোধ ইরানকে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। আর সেই আত্মবিশ্বাসের জোরেই বিশ্ব অর্থনীতির একটি লুকানো 'ধমনির' দিকে নজর দিয়েছে তেহরান। সেটি হলো এই প্রণালির নিচ দিয়ে যাওয়া কেবল, যা ইউরোপ, এশিয়া ও পারস্য উপসাগরের মধ্যে বিপুল পরিমাণ ইন্টারনেট ও আর্থিক লেনদেনের ডেটা আদান-প্রদান করে।
ইরান এখন চাচ্ছে, বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো হরমুজ প্রণালির নিচ দিয়ে যাওয়া এই ইন্টারনেট কেবল ব্যবহারের জন্য তাদের নির্দিষ্ট ফি বা অর্থ দিক।
সরকারপন্থী ইরানি গণমাধ্যমগুলো এরই মধ্যে প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েছে যে কোম্পানিগুলো এই অর্থ না দিলে ইন্টারনেট ট্রাফিক বা ডেটা প্রবাহ ব্যাহত হতে পারে। আরব দেশগুলোকে ইউরোপ ও এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা সাবমেরিন কেবলগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে গত সপ্তাহে তেহরানের আইনপ্রণেতারা একটি পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা করেছেন।
গত সপ্তাহে ইরানের সামরিক মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাঘারি সামাজিক মাধ্যম এক্সে ঘোষণা দেন, 'আমরা ইন্টারনেট কেবলের ওপর ফি বা মাশুল আরোপ করব।'
ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে যুক্ত একটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, এই প্রণালি থেকে রাজস্ব আদায়ের জন্য গুগল, মাইক্রোসফট, মেটা ও অ্যামাজনের মতো কোম্পানিগুলোকে ইরানের আইন মেনে চলতে হবে। সাবমেরিন কেবল কোম্পানিগুলোকে তার নেওয়ার জন্য লাইসেন্স ফি দিতে হবে এবং এসব তার মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের একচেটিয়া অধিকার শুধু ইরানি কোম্পানিগুলোকেই দিতে হবে।
তবে এই কোম্পানিগুলোর কয়েকটি হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগরের নিচ দিয়ে যাওয়া কেবলে বিনিয়োগ করলেও, সেগুলো ইরানের জলসীমা দিয়ে গেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
একই সঙ্গে, কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে এসব প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো কীভাবে ইরানকে অর্থ পরিশোধ করবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এই কারণে কোম্পানিগুলো হয়তো ইরানের এই হুমকিকে কোনো গুরুতর নীতির বদলে নিছকই ফাঁকা আওয়াজ হিসেবে দেখছে।
তা সত্ত্বেও, সরকারপন্থী ইরানি গণমাধ্যমগুলোর এই প্রচ্ছন্ন হুমকি বৈশ্বিক ডেটা প্রবাহ ও ইন্টারনেট সংযোগের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, যেখানে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের লেনদেন জড়িত।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে ইরানি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে সিএনএন।
অবরোধের বাইরেও নতুন হাতিয়ার
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীন সফর শেষে ফেরার পর যুদ্ধ আবার শুরু হতে পারে বলে আশঙ্কা বাড়ছে। এর মধ্যেই ইরান বুঝিয়ে দিচ্ছে যে সামরিক শক্তির বাইরেও তাদের হাতে শক্তিশালী হাতিয়ার রয়েছে।
দেশটির সাম্প্রতিক পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে কেবল জ্বালানি রপ্তানি নয়, বরং ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি অর্জনের চেষ্টা করছে তারা।
সাবমেরিন কেবল বিশ্বব্যাপী যোগাযোগের মেরুদণ্ড। বিশ্বের ইন্টারনেট ও ডেটা ট্রাফিকের বিশাল অংশ এর মাধ্যমেই পরিবাহিত হয়। এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু ইন্টারনেটের গতিই কমবে না, বরং ব্যাংকিং ব্যবস্থা, সামরিক যোগাযোগ, এআই ক্লাউড অবকাঠামো থেকে শুরু করে রিমোট ওয়ার্ক (বাসা থেকে কাজ), অনলাইন গেমিং ও স্ট্রিমিং পরিষেবা পর্যন্ত সবকিছুই হুমকির মুখে পড়বে।
ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রধান দিনা এসফান্দিয়ারি বলেন, ইরানের এই হুমকি মূলত হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রমাণ করার এবং নিজেদের শাসন টিকিয়ে রাখার একটি কৌশল। এই যুদ্ধে এটি তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
তিনি বলেন, 'এর উদ্দেশ্য হলো বিশ্ব অর্থনীতির ওপর এমন এক বিশাল খরচের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া, যাতে কেউ আর কখনো ইরানে আক্রমণ করার সাহস না পায়।'
'ডিজিটাল বিপর্যয়ের' শঙ্কা
বেশ কয়েকটি বড় আন্তমহাদেশীয় সাবমেরিন কেবল হরমুজ প্রণালির ভেতর দিয়ে গেছে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক হাবতুর রিসার্চ সেন্টারের জ্যেষ্ঠ গবেষক মোস্তফা আহমেদ জানান, নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে আন্তর্জাতিক অপারেটররা সচেতনভাবেই ইরানের জলসীমা এড়িয়ে চলে। এর বদলে তারা প্রণালির ওমান অংশের একটি সংকীর্ণ পথ দিয়ে বেশির ভাগ কেবল নিয়ে গেছে। মোস্তফা আহমেদ উপসাগরীয় অঞ্চলে সাবমেরিন যোগাযোগ অবকাঠামোতে বড় পরিসরে হামলার প্রভাব নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন।
টেলিকম গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেলিজিওগ্রাফির গবেষণা পরিচালক অ্যালান মলডিন জানান, এর মধ্যে অন্তত দুটি কেবল—ফ্যালকন এবং গালফ ব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল (জিবিআই)—ইরানের জলসীমার ভেতর দিয়ে গেছে।
ইরান সরাসরি কেবলগুলো নষ্ট করার কথা বলেনি, তবে সরকারি কর্মকর্তা, আইনপ্রণেতা এবং রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের দ্বারা বারবার এ অঞ্চলে ওয়াশিংটনের মিত্রদের শাস্তি দেওয়ার কথা জানিয়েছে। এটি প্রতিবেশীদের ওপর আক্রমণ করার জন্য ইরানের নেওয়া সর্বশেষ 'অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার' বা অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশল বলে মনে করা হচ্ছে।
গবেষক মোস্তফা আহমেদ বলেন, ডুবুরি, ছোট সাবমেরিন এবং আন্ডারওয়াটার ড্রোন দিয়ে সজ্জিত আইআরজিসি সমুদ্রের তলদেশের কেবলগুলোর জন্য একটি বড় ঝুঁকি। তিনি জানান, যেকোনো হামলায় একাধিক মহাদেশজুড়ে পরপর 'ডিজিটাল বিপর্যয়' শুরু হতে পারে।
এর ফলে পারস্য উপসাগরে ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলো মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। এর প্রভাব তাদের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস রপ্তানি এবং ব্যাংকিং খাতের ওপর পড়তে পারে।
আহমেদের মতে, এই অঞ্চলের বাইরে ভারতেও ইন্টারনেট ট্রাফিক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা দেশটির বিশাল আউটসোর্সিং শিল্পে শত শত কোটি ডলার ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করবে।
আহমেদ আরও বলেন, এই প্রণালি সিঙ্গাপুরের মতো এশীয় ডেটা হাব এবং ইউরোপের কিছু কেবল স্টেশনের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল করিডর বা পথ। এখানে কোনো ধরনের ব্যাঘাত ঘটলে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে আর্থিক লেনদেন এবং আন্তসীমান্ত বাণিজ্য ধীর হয়ে যেতে পারে। এমনকি পূর্ব আফ্রিকার কিছু অংশে ইন্টারনেট পুরোপুরি বন্ধ (ব্ল্যাকআউট) হয়ে যেতে পারে।
আর ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো যদি লোহিত সাগরেও একই কৌশল গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়, তবে ক্ষতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
হংকংভিত্তিক এইচজিসি গ্লোবাল কমিউনিকেশনসের মতে, ২০২৪ সালে ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুথি বিদ্রোহীদের হামলায় একটি জাহাজ ডুবে যাওয়ার সময় এর নোঙর সমুদ্রের তলদেশে ঘষটে যাওয়ায় তিনটি সাবমেরিন কেবল কাটা পড়েছিল। এতে ওই অঞ্চলের প্রায় ২৫ শতাংশ ইন্টারনেট ট্রাফিক ব্যাহত হয়েছিল।
অবশ্য মধ্যপ্রাচ্য এবং কিছু এশীয় দেশে কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রভাব বেশি হলেও টেলিজিওগ্রাফি জানিয়েছে, '২০২৫ সাল পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া কেবলগুলো বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ ব্যবহারের ১ শতাংশেরও কম।'
কেবলের লড়াই নতুন কিছু নয়
১৮৫৮ সালে সমুদ্রের তলদেশের একটি কেবলের মাধ্যমে প্রথম ট্রান্সআটলান্টিক টেলিগ্রাম পাঠানো হয়েছিল। ব্রিটিশ রানি ভিক্টোরিয়ার পক্ষ থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেমস বুকাননকে ৯৮ শব্দের একটি অভিনন্দনবার্তা পাঠাতে তখন ১৬ ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছিল। এরপর থেকে সমুদ্রের তলদেশের কেবলের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল কেবল প্রটেকশন কমিটির মতে, আধুনিক সাবমেরিন কেবলে থাকা একটি অপটিক্যাল ফাইবার দিয়ে আলোর গতিতে একই সঙ্গে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ফোনালাপের সমান ডেটা স্থানান্তর করা সম্ভব।
পানির নিচের কেবলে ব্যাঘাত ঘটানোর ইতিহাস প্রায় দুই শতাব্দী পুরোনো। ১৮৫০ সালে ইংলিশ চ্যানেলে প্রথম টেলিগ্রাফ কেবল বসানোর সময় থেকেই এর শুরু। পরবর্তীতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে ব্রিটেন জার্মানির প্রধান টেলিগ্রাফ কেবলগুলো কেটে দিয়ে তাদের বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।
আধুনিক যুগে কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে সাধারণত বড় ধরনের বিপর্যয় হয় না। কারণ অপারেটররা খুব দ্রুত ডেটা ট্রাফিকের পথ পরিবর্তন করতে পারে। তবে বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব ডেটা এই কেবলগুলোর ওপর নির্ভরশীল হওয়ায়, বড় পরিসরে কোনো ক্ষতি হলে তার পরিণতি টেলিগ্রাফ যুগের চেয়েও অনেক বেশি ভয়াবহ হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানে চলমান যুদ্ধের কারণে কেবল মেরামতের কাজও অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়তে পারে। কারণ কোনো ত্রুটি সারাতে রক্ষণাবেক্ষণকারী জাহাজগুলোকে দীর্ঘ সময় ধরে এক জায়গায় স্থির থাকতে হয়। অ্যালান মলডিন জানান, এই চ্যালেঞ্জের মাত্রা আরও বেড়েছে, কারণ এই অঞ্চলে সাধারণত পাঁচটি রক্ষণাবেক্ষণকারী জাহাজ কাজ করলেও বর্তমানে পারস্য উপসাগরের ভেতরে কেবল একটি জাহাজ আছে।
সুয়েজ খালের অনুকরণ?
ইরানের জলসীমা দিয়ে যাওয়া সাবমেরিন কেবলের জন্য মাশুল আদায়ের এই প্রস্তাবকে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বৈধ বলে দাবি করেছে ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো। তারা ১৯৮২ সালের জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশনের কথা উল্লেখ করেছে, যেখানে সাবমেরিন কেবল নিয়ন্ত্রণের বিধান রয়েছে।
যদিও ইরান এই কনভেনশনে সই করেছে, কিন্তু এখনো তা অনুসমর্থন (র্যাটিফাই) করেনি। এই কনভেনশনের ৭৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর নিজেদের ভূখণ্ড বা আঞ্চলিক সমুদ্রে কেবল বা পাইপলাইন প্রবেশের জন্য শর্ত নির্ধারণের অধিকার রয়েছে।
ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো উদাহরণ হিসেবে মিসরের কথা তুলে ধরেছে। কায়রো সুয়েজ খালের কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ইউরোপ ও এশিয়াকে যুক্ত করা অনেক সাবমেরিন কেবলকে জায়গা দিয়েছে। ট্রানজিট ও লাইসেন্স ফি হিসেবে তারা প্রতি বছর কয়েক শ মিলিয়ন ডলার আয় করে।
তবে একজন আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞের মতে, সুয়েজ খাল হলো মিসরীয় ভূখণ্ডের ভেতর দিয়ে খনন করা একটি কৃত্রিম জলপথ। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি একটি প্রাকৃতিক প্রণালি, যা ভিন্ন আইনি কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হয়।
লন্ডনের সোয়াস ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক ইরিনি পাপনিকোলোপুলু সিএনএনকে বলেন, 'অবশ্যই, বিদ্যমান কেবলের ক্ষেত্রে ইরানকে সেই চুক্তি মেনে চলতে হবে, যা কেবলটি বসানোর সময় করা হয়েছিল।'
তিনি আরও বলেন, 'তবে নতুন কেবলের ক্ষেত্রে ইরানসহ যেকোনো রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে তাদের আঞ্চলিক সমুদ্রে কেবল বসানো যাবে কি না এবং গেলে তা কী শর্তে হবে।'
ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের এসফান্দিয়ারি বলেন, ইরান 'তাত্ত্বিকভাবে জানত' যে প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। কিন্তু সেই হুমকি বাস্তবে রূপ দিলে তার প্রভাব কতটা গভীর হবে, তা নিয়ে তাদের সন্দেহ ছিল।
তিনি বলেন, এখন তেহরান 'সেই প্রভাবের মাত্রা ঠিকই বুঝে গেছে।'
