আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার উপক্রম, যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধের প্রস্তুতি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির হুঁশিয়ারি ইরানের
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হলে এবং গ্রহণযোগ্য কোনো ফল না এলে ফের সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়াতে প্রস্তুত রয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
আরাগচি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ ওই অঞ্চলের যেমন ক্ষতি করেছে, তেমনি সাধারণ আমেরিকান পরিবারগুলোর ওপরও এর বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম ও মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে, যে পথ দিয়ে সাধারণত বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হয়।
সামাজিক মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) আরাগচি লেখেন, 'আমেরিকানদের বলা হচ্ছে, ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই যুদ্ধের আকাশচুম্বী খরচ তাদেরই বহন করতে হবে।'
তিনি আরও লেখেন, 'গ্যাসের দাম বৃদ্ধি আর শেয়ারবাজারের অস্থিতিশীলতা তো বাদই দিলাম, আসল কষ্ট শুরু হবে যখন আমেরিকার ঋণ ও মর্টগেজের (বন্ধকি ঋণ) সুদের হার বাড়তে শুরু করবে।'
যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির শঙ্কা
আমেরিকানদের প্রতি আরাগচির বার্তার মূল কথা হলো—যুদ্ধে জড়ানোর হুমকি যত দিন থাকবে, যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতিও তত দিন অব্যাহত থাকবে। তিনি মনে করেন, এই চাপের কারণে শিগগিরই দেশটিতে ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে যাবে, যা শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক মন্দার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রথম দফার আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়া ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও এই যুদ্ধের কারণে আমেরিকানদের আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তবে তার সুর ছিল কিছুটা উপহাসের।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দিকে ইঙ্গিত করে বৃহস্পতিবার এক্সে গালিবাফ লেখেন, 'তাহলে আপনারা এক ব্যর্থ টিভি উপস্থাপককে (পিট হেগসেথ) ২০০৭ সালের পর নজিরবিহীন সুদে অর্থায়ন করছেন, শুধু এ জন্য যে সে আমাদের হরমুজ প্রণালিতে এসে যুদ্ধমন্ত্রীর মতো পোশাক পরে নাটক করতে পারে?'
তিনি আরও লেখেন, 'জানেন ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণের চেয়েও বেশি পাগলামি কী? একটি নাটকের অর্থায়ন করার জন্য আপনি প্রাক-বিশ্ব আর্থিক সংকটের মতো অতিরিক্ত মূল্য দিচ্ছেন, অথচ এর বিনিময়ে আপনি কেবল আরেকটি অর্থনৈতিক মন্দাই পাবেন।'
বুধবার মার্কিন সরকার পাঁচ শতাংশ সুদে ২৫ বিলিয়ন ডলারের ৩০ বছর মেয়াদি বন্ড বিক্রি করেছে। গত প্রায় দুই দশকের মধ্যে এত বেশি সুদে বন্ড বিক্রির ঘটনা এটাই প্রথম। এরপরই গালিবাফের এই মন্তব্য এল।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনায় সবচেয়ে বড় মতবিরোধের জায়গা হলো হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ। ইরানি কর্মকর্তারা অনড় যে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো চুক্তিতে এই জলপথের ওপর তেহরানকে সার্বভৌমত্ব দিতে হবে। তবে অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে প্রণালিটির আন্তর্জাতিক মর্যাদার ওপর জোর দিয়েছে।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি শনিবার বলেন, 'একটি নির্দিষ্ট রুটের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য তেহরান একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যা শিগগিরই প্রকাশ করা হবে।'
তিনি বলেন, 'এই প্রক্রিয়ায় কেবল বাণিজ্যিক জাহাজ এবং ইরানকে সহযোগিতা করা পক্ষগুলোই লাভবান হবে।' তিনি আরও জানান, জাহাজগুলোকে ফি দিতে হবে এবং ওয়াশিংটনের 'প্রজেক্ট ফ্রিডম'-এর সমর্থকদের এই পথ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে না।
চরম সংকটে ইরানের অর্থনীতি
তবে এই যুদ্ধের কারণে ইরানি পরিবারগুলোর জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ফারসি ক্যালেন্ডারের প্রথম মাসে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি ১১৫ শতাংশে পৌঁছেছে। গত এক বছরে রান্নার তেল, চাল ও মুরগির মতো অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম তিন গুণ বেড়েছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে খাবার, ওষুধ, ইলেকট্রনিকস, গাড়ি ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের দাম আকাশ ছুঁয়েছে।
শনিবার তেহরানের খোলাবাজারে এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের মান প্রায় ১৮ লাখে পৌঁছায়। এটি প্রমাণ করে যে ইরানের অর্থনীতিতে এই যুদ্ধের প্রভাব কতটা স্পষ্ট।
ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাসের অভাবই আলোচনায় কোনো দৃশ্যমান ফল অর্জনের ক্ষেত্রে বড় বাধা।
তবে শুক্রবার নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনে আরাগচি সাংবাদিকদের বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফর এবং শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার বৈঠকের প্রেক্ষাপটে, তেহরান এই সংকটে বেইজিংয়ের মধ্যস্থতাকে স্বাগত জানাবে।
টিভির পর্দা থেকে রাজপথ, সবখানেই অস্ত্র
ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চললেও, ইরানি কর্তৃপক্ষ তাদের সমর্থকদের প্রতি রাতেই রাস্তায় নেমে আসার আহ্বান জানিয়েছে। তারা বোঝাতে চাইছে যে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে 'বিজয়' নিশ্চিত করতে এই জমায়েত অত্যন্ত জরুরি।
শুক্রবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এই প্রচারণায় আরও জোর দেয়। একাধিক চ্যানেলে উপস্থাপকদের অ্যাসল্ট রাইফেল হাতে নিয়ে কথা বলতে দেখা যায়, যার ফলে যুদ্ধ আবার শুরু হতে পারে বলে গুঞ্জন ছড়ায়।
রাষ্ট্রীয় চ্যানেল ওফোগ-এ ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) একজন মুখোশ পরা কমান্ডার উপস্থিত হন। তিনি দর্শকদের একে-৪৭ রাইফেলের একটি সংস্করণে কীভাবে গুলি ভরতে হয়, তা শেখান। এ ছাড়া সরকারপন্থী সমাবেশের সময় স্থাপন করা বুথগুলোতে গিয়ে অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ নিতে তিনি দর্শকদের আমন্ত্রণ জানান।
অনুষ্ঠানের শেষ দিকে উপস্থাপক নিজেই ছাদের দিকে একটি গুলি ছোড়েন এবং এরপর সংযুক্ত আরব আমিরাতের পতাকার দিকে তাক করে গুলি চালান। উপসাগরীয় এই দেশটির সঙ্গে বর্তমানে ইরানের উত্তেজনা চরমে রয়েছে।
চ্যানেল ৩-এ উপস্থাপক মোবিনা নাসিরি হাতে একটি অ্যাসল্ট রাইফেল নিয়ে ভাষণ দেন। তিনি বলেন, তিনি ইরানের জন্য নিজের জীবন 'উৎসর্গ' করতে প্রস্তুত।
ইরানের শহরগুলোর বড় বড় চত্বর ও সড়ক এখনো সাঁজোয়া যান এবং মুখোশ পরা সশস্ত্র ব্যক্তিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত চেকপয়েন্টে ঘেরা রয়েছে।
গত জানুয়ারি মাসে দেশব্যাপী সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় হাজার হাজার প্রতিবাদকারীকে হত্যা করার পর এই কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। ওই বিক্ষোভকে কর্তৃপক্ষ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মদদে পরিচালিত একটি 'অভ্যুত্থানচেষ্টা' বলে আখ্যা দিয়েছিল।
ইরানি কর্তৃপক্ষ গত ৭৮ দিন ধরে ইন্টারনেট প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে রেখেছে এবং সীমিত পরিসরে রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট সেবা ব্যবহারের ব্যবস্থা করেছে। যুদ্ধ চলাকালে বিচার বিভাগ প্রায় প্রতিদিনই কথিত ভিন্নমতাবলম্বীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘোষণা দিচ্ছে, যার মাধ্যমে সব ইরানিকে এই বার্তা দেওয়া হচ্ছে যে সরকারের বিরোধিতা করার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
