ড্রোন ঠেকাতে লেজার অস্ত্রের তীব্র প্রতিযোগিতা: চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নজর মধ্যপ্রাচ্যে
গত সপ্তাহে অনলাইন উৎস থেকে অস্ত্র শণাক্তকারী একদল বিশেষজ্ঞ— সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই বিমানবন্দরে চীনের তৈরি একটি লেজার ব্যবস্থার উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। এই লেজার সিস্টেমটি মূলত ড্রোন ভূপাতিত করার জন্য তৈরি করা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আরব আমিরাতে ইতিমধ্যেই ইসরায়েলের তৈরি 'আয়রন বিম' নামের একটি লেজার ব্যবস্থা রয়েছে, যা ইসরায়েল সম্ভবত আমিরাতকে ধার হিসেবে দিয়েছে। অন্যান্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন মার্কিন নির্মিত একটি লেজার অস্ত্র কেনারও চেষ্টা করছে। এছাড়া নিজস্ব লেজার প্রযুক্তির অস্ত্র তৈরির জন্য দেশটি ইউরোপীয় ও মার্কিন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যৌথ চুক্তিও করেছে।
২০২৫ সালের শেষদিকে একটি পরিবহন কোম্পানি অসাবধানতাবশত তাদের পাঠানো সামরিক সরঞ্জামের ছবি পোস্ট করার পর ওমান যে চীন থেকে লেজার অস্ত্র কিনেছে তা ফাঁস হয়ে যায়। এছাড়া গত বছরের সেপ্টেম্বরে রাজধানী দোহায় ইসরায়েলি হামলার পর কাতার এখন তুরস্কের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা 'স্টিল ডোম'-এর কিছু অংশ কেনার কথা ভাবছে, যার মধ্যে লেজার অস্ত্রও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এদিকে সৌদি আরবের সামরিক বাহিনীও চীন নির্মিত লেজার অস্ত্র ব্যবস্থার পরীক্ষা চালাচ্ছে। কিছু পর্যবেক্ষকের মতে, সৌদি আরব ইতিমধ্যে চীনের তৈরি 'সাইলেন্ট হান্টার' ইউনিটের অন্তত আটটি সিস্টেম কিনেছে। রিয়াদ যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি লেজার অস্ত্র কেনার বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে।
মধ্যপ্রাচ্যে 'স্টার ওয়ার্স'?
লেজার অস্ত্রের কথা শুনলে সায়েন্স ফিকশন বা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর মতো মনে হতে পারে, তবে চলমান ইরান যুদ্ধ বাস্তব সংঘাতের ময়দানে এই প্রযুক্তির ব্যবহারকে সাধারণ বিষয়ে পরিণত করছে। এই প্রযুক্তির নানান দিক তুলে ধরা নিয়ে বিশেষভাবে কাজ করা নিউজলেটার 'লেজার ওয়ার্স'-এর পরিচালক এবং সাবেক প্রতিরক্ষা সাংবাদিক জ্যারেড কেলার এমনটাই মনে করেন। সম্প্রতি তিনি লিখেছেন, এপ্রিল ও মে মাসে বৈশ্বিক লেজার অস্ত্রের উন্নয়ন এমন এক নজিরবিহীন গতিতে এগিয়েছে, যা তিনি আগে কখনো দেখেননি।
তিনি আরও যোগ করেন, "সংযুক্ত আরব আমিরাত ধীরে ধীরে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত লেজার অস্ত্রের বাজারে পরিণত হচ্ছে।" তিনি উল্লেখ করেন যে, দেশটির কাছে এখন দুই ধরনের লেজার ব্যবস্থা রয়েছে এবং তারা তৃতীয় আরেকটি ব্যবস্থা কেনার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে।
কেলার জার্মান গণমাধ্যম ডয়েচে ভেলে-কে বলেন, "বর্তমানে আমরা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছি— যেখানে লেজার অস্ত্রকে জনপ্রিয় করার পেছনে কয়েকটি কারণ একসাথে কাজ করছে।"
কেলার ব্যাখ্যা করেন, এর প্রথম কারণ হলো 'প্রযুক্তিগত পরিপক্কতা'। যদিও মার্কিন সামরিক বাহিনী ১৯৭৩ সালে পরীক্ষামূলকভাবে লেজারের সাহায্যে প্রথম একটি ড্রোন ভূপাতিত করেছিল এবং তখন থেকেই এই প্রযুক্তির উন্নয়নে কাজ করছে, তবে বর্তমানের লেজার অস্ত্রগুলো আকারে অনেক ছোট এবং অনেক বেশি কার্যকর।
লেজার মূলত ডিরেক্ট এনার্জি ওয়েপনস বা 'ডিইডব্লিউ' নামের এক শ্রেণির অস্ত্র। এই গ্রুপে রয়েছে হাই-এনার্জি লেজার, যার শক্তিশালী রশ্মি লক্ষ্যবস্তুকে ধ্বংস করতে বা অন্ধ করে দিতে ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে হাই-পাওয়ার মাইক্রোওয়েভ অস্ত্রও অন্তর্ভুক্ত, যা শক্তিশালী মাইক্রোওয়েভ নির্গমনের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তুর অভ্যন্তরীণ কার্যক্ষমতা নষ্ট বা বিকল করে দেয়।
জ্যারেড কেলারের মতে, দ্বিতীয় কারণটি হলো যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের ব্যাপক বিস্তার। তিনি ব্যাখ্যা করেন, "চালকবিহীন ড্রোন যুদ্ধের এই উত্থান যুদ্ধের প্রচলিত অর্থনৈতিক সমীকরণকে জটিল করে তুলেছে।" এর অর্থ হলো, মাত্র কয়েকশ ডলার মূল্যের একটি সস্তা ড্রোনকে ভূপাতিত করতে লাখ লাখ বা মিলিয়ন ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা কোনোভাবেই সাশ্রয়ী নয়।
যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক এই লেজার অস্ত্র বিশেষজ্ঞ বলেন, "এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং টেকসই নয়। বিশেষ করে যখন এই ড্রোনগুলো খুব দ্রুত এবং বিপুল পরিমাণে উৎপাদন করা যায় এবং ততটাই দ্রুত সেগুলোকে মারণাস্ত্রে রূপ দেওয়া সম্ভব। অন্যদিকে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে দীর্ঘ সময় এবং প্রচুর সম্পদের প্রয়োজন হয়। ফলস্বরূপ, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের সরকার এখন কম খরচের বিকল্প প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে।"
উদাহরণস্বরূপ, উচ্চ-শক্তির লেজার অস্ত্র নির্মাতারা প্রায়শই দাবি করেন যে, এর প্রতিটি শটের পেছনে খরচ হয় মাত্র ৩ ডলার থেকে ৫ ডলার।
সবশেষে চলমান ইরান যুদ্ধ লেজার অস্ত্রের চাহিদাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। যদিও ইউক্রেনে রাশিয়ার ড্রোন হামলা মোকাবিলায় এই প্রযুক্তির উন্নয়ন করা হচ্ছে এবং রাশিয়ার কাছেও কিছু লেজার অস্ত্র রয়েছে, তবে ইরান যুদ্ধের মাধ্যমেই মার্কিন সামরিক বাহিনী, তাদের উপসাগরীয় মিত্র এবং ইসরায়েল প্রথমবারের মতো এত বড় পরিসরে ড্রোন হামলার মুখোমুখি হয়েছে।
কেলার বলেন, "ইরান যুদ্ধ মূলত ড্রোন যুদ্ধের প্রকৃত রূপটি সামনে এনেছে।" তিনি মনে করিয়ে দেন যে, গত মার্চ মাসে এক সম্মেলনে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেছিলেন, তারা আগামী তিন বছরের মধ্যে বড় পরিসরে লেজার অস্ত্র মোতায়েন শুরু করতে চান।
উপসাগরীয় দেশগুলোতে কেন লেজার অস্ত্রের বিস্তার ঘটছে তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কেলার বলেন, "আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক হুমকির মুখে থাকা যেকোনো দেশই লেজার সিস্টেমগুলোকে দ্রুত নিজেদের প্রতিরক্ষায় যুক্ত করতে চাইবে।"
লেজার কি আসলেই ড্রোনের বিরুদ্ধে কার্যকর?
তবে লেজার কোনো 'অব্যর্থ সমাধান' বা জাদুকরী অস্ত্র নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশ এগুলো কিনছে, তাদের জন্য এই অস্ত্রগুলো একটি বৃহত্তর ও বহুস্তর-ভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি কার্যকর হবে বলে কেলার মনে করেন।
এর কারণ হলো লেজার অস্ত্রের কিছু নিজস্ব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। লেজার রশ্মি সবসময় সরলরেখায় চলে এবং এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্তই ব্যবহার করা যায় যেমন ইসরায়েলের 'আয়রন বিম' ইউনিটগুলো একবারে মাত্র ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকায় কার্যকর। এছাড়া কার্যকরভাবে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে লেজার রশ্মিকে কিছু সময়ের জন্য সেটির ওপর স্থির রাখতে হয়। এই সময়কালকে 'ডুয়েল টাইম' বলা হয়, যা একটি দ্রুত ধাবমান ড্রোনের ওপর বজায় রাখা বেশ কঠিন হতে পারে।
এছাড়া আর্দ্রতা, বৃষ্টি, ধোঁয়াশা, কুয়াশা, তুষারপাত, বালুঝড়, ধুলাবালি কিংবা সমুদ্রের পানির ঝাপটার কারণে লেজার রশ্মি ছড়িয়ে পড়তে বা বিঘ্নিত হতে পারে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের তীব্র তাপমাত্রা লেজারের সংবেদনশীল যন্ত্রাংশগুলোর ক্ষতি করতে পারে এবং এর পরিচালনাকে কঠিন করে তোলে, কারণ সিস্টেমটিকে ঠান্ডা রাখতে তখন প্রচুর অতিরিক্ত বিদ্যুৎশক্তির প্রয়োজন হয়।
জানা গেছে, সৌদি আরব যখন তাদের চীনের তৈরি লেজার অস্ত্রের পরীক্ষা চালাচ্ছিল, তখন তারা এই ধরনের কিছু নিয়ে অভিযোগ করেছিল।
লেজার অস্ত্র এবং এর সক্ষমতা নিয়ে এর আগেও বাড়িয়ে বলা হয়েছে। চলমান ইরান যুদ্ধে ইসরায়েলের 'আয়রন বিম' লেজার এখনও পুরোপুরি ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। এর একটি সংস্করণ অবশ্য লেবানিজ গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ছোড়া ড্রোন ভূপাতিত করেছে, তবে জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী ইসরায়েলি বিমান বাহিনী জানিয়েছে যে, এই লেজার ব্যবস্থাকে পুরোপুরি কার্যকর করতে আরও অন্তত ১৪টি ব্যাটারির প্রয়োজন, যা বর্তমানে দেশটির কাছে নেই।
'লেজার ওয়ার্স'-এর প্রতিষ্ঠাতা কেলার উল্লেখ করেন, সে কারণেই সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১০০ কিলোওয়াটের 'আয়রন বিম' লেজার পাঠানো কোনো বাস্তবসম্মত সামরিক পদক্ষেপের চেয়ে তেল আবিবের একটি 'কূটনৈতিক চাল' হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
ভূ-রাজনীতি ও স্বনির্ভরতার তাগিদ
মধ্যপ্রাচ্যে কার হাতে লেজার অস্ত্র থাকছে, তার পেছনে স্পষ্টতই একটি ভূ-রাজনৈতিক দিক রয়েছে।
লন্ডনের কিংস কলেজের স্কুল অব সিকিউরিটি স্টাডিজের সিনিয়র লেকচারার অ্যান্ড্রেয়াস ক্রেইগ বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরব যেভাবে বিভিন্ন উৎস থেকে লেজার অস্ত্র কিনছে, তা মূলত উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বহুমুখী করার একটি উপায়মাত্র।
তিনি বলেন, "যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি। ফলে এসব দেশে একটি অনুধাবন তৈরি হয়েছে যে স্বল্পমেয়াদে এই নির্ভরতা হয়তো ভাঙা যাবে না, তবে মধ্যম থেকে দীর্ঘমেয়াদে উপসাগরীয় দেশগুলোকে তাদের আত্মনির্ভরতা বাড়ানোর পথ খুঁজে বের করতে হবে।"
সৌদি আরবের শীর্ষ কর্মকর্তারা চলতি সপ্তাহে বলেছেন, ইরানের পাশাপাশি ইসরায়েলের পক্ষ থেকে আসা হুমকিগুলো এই যুদ্ধ শেষ হলেও সহজে দূর হবে না।
ক্রেইগ যুক্তি দেন, "তাই এটি স্পষ্ট যে কূটনীতির পাশাপাশি ইরান যাতে বাণিজ্য ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করার সুযোগ না পায়, সেজন্য তাদের একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। আর তা করার একটি উপায় হলো আরও সুসংগঠিত ও আত্মনির্ভরশীল একটি আকাশ প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করা, যা সহজে সংগ্রহ করা কঠিন এমন মার্কিন ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর কম নির্ভরশীল হবে।"
