ভারতের একাদশ শতাব্দীর ভোজশালা-কামাল মওলা মসজিদকে মন্দির ঘোষণা
ভারতের ভোজশালা-কামাল মওলা মসজিদকে 'দেবী বাগদেবীর (সরস্বতী) মন্দির' হিসেবে ঘোষণা করেছেন দেশটির মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট। গতকাল শুক্রবার এই রায় দেওয়া হয়। এই রায়ের ফলে এখন থেকে হিন্দু সম্প্রদায় সেখানে উপাসনা করার অনুমতি পাবে। অন্যদিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের দাবি খারিজ করে দিয়েছেন আদালত।
একাদশ শতাব্দীর এই স্থাপনাটি ভারতের মধ্যপ্রদেশের ধার জেলায় অবস্থিত।
মধ্যপ্রদেশের ইন্দোর হাইকোর্টের বিচারপতি বিনয় কুমার শুক্লা এবং অলোক আওয়াস্থির সমন্বয়ে গঠিত একটি বেঞ্চ ২৪২ পৃষ্ঠার এই রায় দেন। সম্প্রতি দায়ের করা মুসলিম ও জৈন সম্প্রদায়ের পিটিশন খারিজ করে দিয়ে আদালত জানান, মুসলিম প্রতিনিধিরা চাইলে মধ্যপ্রদেশ সরকারের কাছে ধার জেলায় বিকল্প জমির জন্য আবেদন করতে পারেন।
আদালত ভারতের আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার (এএসআই) ২০০৩ সালের একটি আদেশও বাতিল করে দিয়েছেন। ওই আদেশে মুসলিম সম্প্রদায়কে শুক্রবার ওই স্থানে নামাজ পড়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি হিন্দুদের জন্য শুধু মঙ্গলবার এবং বসন্ত পঞ্চমীতে ভোজশালা কমপ্লেক্সে উপাসনার অধিকার রাখা হয়েছিল।
অযোধ্যার 'রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ' রায়ের ওপর ভিত্তি করেই এই রায় দিয়েছেন আদালত।
হিন্দু পক্ষ এই রায়কে 'ঐতিহাসিক' উল্লেখ করে স্বাগত জানিয়েছে। তবে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, তারা এই রায় পর্যালোচনা করবেন এবং সুপ্রিম কোর্টে এর বিরুদ্ধে আপিল করবেন।
এ ছাড়া ১৮০০ সালের শেষের দিকে যুক্তরাজ্যের লন্ডন মিউজিয়ামে নিয়ে যাওয়া দেবী সরস্বতীর একটি মূর্তি দেশে ফিরিয়ে এনে ভোজশালা কমপ্লেক্সে পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ নিতে কেন্দ্রীয় সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
শুনানিকালে মুসলিম পক্ষের যুক্তি ছিল, ১৯৩৫ সালের আগস্টে তৎকালীন ধার রাজ্যের একটি 'অ্যায়লান' বা সরকারি ঘোষণার মাধ্যমে এই স্থানটিকে 'ভারত সরকার আইন, ১৯৩৫'-এর অধীনে মসজিদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে আদালত এই যুক্তি খারিজ করে বলেন, ওই আইনটি ১৯৩৭ সালের এপ্রিলে কার্যকর হয়েছিল। তাই ওই সরকারি ঘোষণার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
আদালত রায়ে বলেন, 'মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অধিকার রক্ষা এবং উভয় পক্ষের মধ্যে সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে, যদি মুসলিম পক্ষ মসজিদ নির্মাণের জন্য ধার জেলার ভেতরে উপযুক্ত জমির জন্য আবেদন করে, তবে রাজ্য সরকার আইন অনুযায়ী তা বিবেচনা করতে পারে।'
ভোজশালার প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং সেখানে সংস্কৃত শিক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার ও এএসআই-কে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। তবে সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এএসআই-এর হাতেই রাখা হয়েছে।
শুনানিকালে মুসলিম পক্ষ অভিযোগ করেছিল যে এএসআই-এর জরিপ প্রতিবেদনটি 'পক্ষপাতদুষ্ট' এবং এটি হিন্দু পক্ষের দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই তৈরি করা হয়েছে। ঐতিহাসিক দলিল এবং এএসআই-এর নিজস্ব রেকর্ড অগ্রাহ্য করা হয়েছে দাবি করে তারা বলেন, এই জরিপের 'কোনো আইনি ভিত্তি নেই'।
এএসআই এই অভিযোগগুলোকে 'ভিত্তিহীন' বলে উড়িয়ে দেয়। আদালতও তাদের রায়ে উল্লেখ করেন, 'আমরা দেখেছি যে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করেই এই জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। ভিডিওগ্রাফিতে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি খুব স্পষ্টভাবে দেখা গেছে।'
এই স্থানটি দীর্ঘদিন ধরেই ওই অঞ্চলের হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিবাদের একটি বড় কারণ ছিল। চলতি বছরের মার্চে জৈন সম্প্রদায়ের একজন প্রতিনিধিও একটি পিটিশন দায়ের করেছিলেন।
আদালতে হিন্দু পক্ষের প্রতিনিধিত্ব করে 'হিন্দু ফ্রন্ট ফর জাস্টিস' এবং মুসলিম পক্ষের নেতৃত্বে ছিল ধারের 'মাওলানা কামালুদ্দিন ওয়েলফেয়ার সোসাইটি'।
