ট্রাম্পকে কেন চীনের গোপন বাগান ঘুরিয়ে দেখালেন শি?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেইজিংয়ে তার শেষ সকালটি কাটিয়েছেন 'ঝংনানহাই'-এ। এটি চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির অত্যন্ত গোপন ও কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত এক এলাকা।
ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ঝংনানহাইয়ের বাগানে হেঁটেছেন। ট্রাম্প সেখানে থাকা গোলাপের প্রশংসা করলে, শি তাকে কিছু গোলাপের বীজ পাঠানোর প্রস্তাবও দেন।
চীনের ক্ষমতার এই মূল কেন্দ্রটিকে অনেক সময় হোয়াইট হাউস বা ক্রেমলিনের সঙ্গে তুলনা করা হয়। রাজধানী বেইজিংয়ের বাকি অংশ থেকে এই এলাকাটিকে আলাদা করে রেখেছে শতাব্দীপ্রাচীন লালচে-গেরুয়া রঙের দেয়াল। এই দেয়াল পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছেন এমন মার্কিন নেতার সংখ্যা হাতে গোনা।
এই এলাকার নিরাপত্তা অত্যন্ত কঠোর। এর ভেতরে প্রবেশের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে একটি অভিজাত সামরিক ইউনিট, যারা মূলত দলের শীর্ষ নেতাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকে। ডিজিটাল ম্যাপিং প্ল্যাটফর্মগুলোতেও এই এলাকার ছবি কঠোরভাবে সেন্সর করা বা ঝাপসা করে রাখা হয়।
শুক্রবার শি জিনপিং নিজেই এই জায়গাটির গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২০১৭ সালে ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো রিসোর্টে ট্রাম্প তাকে যে আতিথেয়তা দিয়েছিলেন, তার প্রতিদান দিতেই তিনি এই জায়গাটি বেছে নিয়েছেন। ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ক্ষমতা নেওয়ার কয়েক মাস পর সেই প্রথমবার দুই নেতার দেখা হয়েছিল।
ঝংনানহাইয়ের সীমানার ভেতরে থাকা দুটি বড় হ্রদ থেকে এর নামকরণ করা হয়েছে। শুক্রবার শি ট্রাম্পকে বলেন, 'ঝংনানহাই হলো সেই জায়গা, যেখানে চীনের কেন্দ্রীয় সরকার এবং কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা কাজ করেন ও বসবাস করেন, যার মধ্যে আমিও রয়েছি।'
শি আরও বলেন, '১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর থেকে আমরা (কমিউনিস্ট পার্টি) এখানেই আছি। মাও সেতুং, চৌ এনলাই, দেং জিয়াওপিং, জিয়াং জেমিন, হু জিনতাও-এর মতো নেতারাও এখানে ছিলেন।'
সম্রাটদের পুরোনো বাগান
ঝংনানহাই একসময় ছিল রাজকীয় বাগান। বেইজিংয়ের ফরবিডেন সিটিতে (সম্রাটদের প্রাসাদ) কাজ না থাকলে বা সেখানে বসবাস না করলে সম্রাটরা অবসর কাটাতে ও বিনোদনের জন্য এই বাগান ব্যবহার করতেন।
শুক্রবার এই বাগানের শতাব্দী পুরোনো ইতিহাস নিয়ে বেশ গর্ববোধ করতে দেখা যায় শি জিনপিংকে। তিনি বাগানের বিভিন্ন গাছের বয়সের দিকে ট্রাম্পের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এর মধ্যে একটি বড় গাছ দেখিয়ে তিনি জানান, এটির বয়স প্রায় ৪৯০ বছর। শি ট্রাম্পকে বলেন, 'এই প্রাঙ্গণের অন্য জায়গাগুলোতে এমন গাছও আছে, যেগুলোর বয়স ১ হাজার বছরের বেশি।' একপর্যায়ে শি ট্রাম্পকে গাছগুলো ছুঁয়ে দেখার জন্য বলেন।
হাঁটার একপর্যায়ে ট্রাম্প শি-কে বলেন, 'দারুণ জায়গা। আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আমিও এ রকম জায়গায় অভ্যস্ত হয়ে যেতে পারতাম।'
১৯১২ সালে চীনের রাজকীয় যুগের অবসানের পর ঝংনানহাইকে রাষ্ট্রপতির বাসভবন হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়। কয়েক দশক পর চীনের গৃহযুদ্ধে কমিউনিস্টদের বিজয়ের পর চেয়ারম্যান মাও সেতুং এটিকে রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত করেন।
ওই সময় মাও ইচ্ছাকৃতভাবেই তার কার্যালয়ের জন্য ফরবিডেন সিটিকে বেছে নেননি। কারণ, তিনি নতুন চীনকে এর অতীতের ব্যর্থ সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন। তা ছাড়া, আগের সম্রাটের প্রাসাদে কাজ করা ও বসবাস করাটা কমিউনিস্ট পার্টির 'জনগণের সেবা করার' আদর্শের সঙ্গেও বেমানান ছিল।
এরপর থেকে ঝংনানহাইয়ের ব্যাপক সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে অফিস ভবন, সুইমিংপুল এবং অন্যান্য স্থাপনা যোগ করা হয়েছে। বর্তমানে ১ হাজার ৫০০ একরের এই বিশাল এলাকায় পুরোনো প্যাভিলিয়ন ও মন্দিরগুলোকে নতুন করে সাজানো হয়েছে, যা এখন দলের অভিজাত শ্রেণির সমার্থক হয়ে উঠেছে।
চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ভিডিওতে দেখা যায়, হাঁটার সময় শি ও ট্রাম্প এমন একটি ঘরের সামনে ছবি তুলেছেন, যা একসময় বলরুম নাচ এবং দেশি-বিদেশি সিনেমা দেখানোর জন্য ব্যবহৃত হতো। কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা যখন প্রথম এই এলাকায় এসেছিলেন, তখন এটি ব্যবহৃত হতো।
আর কোন মার্কিন প্রেসিডেন্ট এসেছিলেন?
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ১৯৭২ সালে তার যুগান্তকারী চীন সফরের সময় এই ঝংনানহাইয়ে মাও সেতুংয়ের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের সেটিই ছিল প্রথম চীন সফর।
এর ৩০ বছর পর প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশও চীনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াং জেমিনের সঙ্গে ঝংনানহাইয়ে প্রবেশ করেছিলেন। সবশেষ মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঝংনানহাইয়ে এসেছিলেন বারাক ওবামা। ২০১৪ সালে তিনি সেখানে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দেখা করেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ওই সময় দুই নেতা আধুনিক চীনের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেছিলেন।
ওই সময় ওবামাকে 'ইংতাই' নামের একটি কৃত্রিম দ্বীপ ঘুরিয়ে দেখানো হয়েছিল, যা সাধারণত কাউকে দেখানো হয় না। এটি ঝংনানহাইয়ের একটি হ্রদের মাঝখানে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। এই গোপন দ্বীপটির একটি বিশেষ ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। ছিং রাজবংশের শেষের দিকে এক ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর এক সম্রাটকে ক্ষমতাচ্যুত করে এই দ্বীপেই বন্দী করে রাখা হয়েছিল।
